ঢাকাগামী ফ্লাইটে ‘এয়ার মার্শালের’ প্রস্তাব দিল্লির

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:৫৫ এএম

বাংলাদেশ ও ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা প্রাধান্য পেয়েছে। দুদেশই নিজ ভূখণ্ড পরস্পর স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার না করার বিষয়ে একমত। বৈঠকে মাদক ও সীমান্ত হত্যা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। দুদেশের উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবের কিছু গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ভারত যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঢাকাগামী সব ফ্লাইটে ‘এয়ার মার্শাল’ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করেছে বলে জানা গেছে।

গতকাল শনিবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুদেশের ১৯তম স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ বৈঠক হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে নেতৃত্বে ছিলেন স্বরাষ্ট্র সচিব অজয় কুমার ভাল্লা।

বৈঠকের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, বৈঠকে ভারতের প্রতিনিধিরা বলেন তাদের দেশে ফেনসিডিল কাশির সিরাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি মাদক। ফলে ফেনসিডিল নিয়ে ভারতের কিছু করার নেই বলে জানানো হয়। যেসব সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে দ্রুত বেড়া দিতে ভারত বাংলাদেশকে অনুরোধ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈঠকে উভয় সচিব সীমান্তে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে দুদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুত দেন। উভয়পক্ষ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি অনুযায়ী সীমান্তে অসম্পন্ন বেড়া তৈরির কাজ শেষ করার বিষয়ে আলোচনা করে। সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার ঝুঁকি মোকাবিলায় উভয় পক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়। উভয় পক্ষই নকল ভারতীয় মুদ্রা পাচার রোধে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন বলেন, ‘ভবিষতে যাতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরও উন্নত হয় তা নিয়ে বৈঠকে কথা বলেছি। ভারতের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন ভবিষতে সম্পর্কের উন্নতি হবে। বিশেষ করে করোনার ভ্যাকসিন দিতে সহায়তা করেছেন তা নিয়ে আলোচনা হয়। টিকার কিছু তারা উপহার হিসেবে দিয়েছে। আবার কিছু আমরা কিনে এনেছি। এজন্য আমরা ভারত সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা নিয়ে আমাদের সব সময়ই আলোচনা হয়। তারা বলেছে যে গুলিতে মানুষ মারা যায় না, তা ব্যবহার করবে। সীমান্ত হত্যা কীভাবে শূন্যে নিয়ে আসা যায় তা নিয়ে তারা কাজ করছে।’

বৈঠকে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা, মাদক, জাল নোট ও ভারত থেকে বাংলাদেশগামী উড়োজাহাজে এয়ার মার্শাল মোতায়েনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করার ওপর উভয়পক্ষ জোর দেয়। বিএসএফের সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ তুলে ধরলে ভারতের প্রতিনিধিরা বলেছে মানুষ যাতে মারা না যায়, সেজন্য নন-নিথ্যাল গুলি চালানো হবে। ইচ্ছা করে কোনো বাংলাদেশিকে হত্যা করা হচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের জন্য ফেনীর মুহুরীর চরে দুই দেশ সমীক্ষা চালাবে।’ তারা আরও বলেন, ‘মাদক, অস্ত্রসহ বিভিন্ন চোরাচালান, মানব পাচারসহ অন্য সব বিষয় কীভাবে রোধ করা যায় সে বিষয়েও তারা আলোচনা করেন। সন্ত্রাসবাদ, জাল অর্থ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, ভিসাসহ আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে আলোচনায়।’  

জানা গেছে, উভয় স্বরাষ্ট্র সচিব দুই দেশের পরস্পর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সতর্ক ও সংযত মনোভাব প্রদর্শন করেন। বিশেষ করে ঝুলে থাকা সীমান্ত বেড়া ইস্যুতেও কার্যকর আলোচনা করেন তারা। উভয়পক্ষই সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ নির্মূলে নেওয়া দুদেশের পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। এ সময় গত জানুয়ারি মাসে দুদেশের পুলিশপ্রধানদের শীর্ষ বৈঠকে আলোচিত ইস্যু নিয়েও অগ্রগতির তথ্য বিনিময় করা হয়। একইভাবে ভারত থেকে আসা জাল মুদ্রার বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপ আরও কার্যকর করার আশ্বাস দেওয়া হয় ভারতের পক্ষ থেকে। উভয়পক্ষই নিরাপত্তা ও সীমান্তসংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টি পর্যালোচনা করে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন প্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে জানান, ভারত থেকে আসা মাদক বর্তমানে রুট পরিবর্তন করে আসাম সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। জবাবে ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব জানান, মাদক ঠেকানো ইস্যুতে ভারত সবসময়ই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে মাদকসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত বাংলাদেশকে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ফেনসিডিল বা কডিন নামে সিরাপটি ভারতে নিষিদ্ধ নয়। এটা বৈধ। এটি কাশির সিরাপ হিসেবে ব্যবহার হয়। তাছাড়া ভারতে কখনো ইয়াবা তৈরি হয় না। মিয়ানমারে ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি, চোরাচালান যাতে বন্ধ হয়। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারত একযোগে কাজ করবে।  

এ বৈঠকে অংশ নেওয়া বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারত বরাবরই প্রস্তাব দিয়ে আসছে যাতে সে দেশ থেকে আগত উড়োজাহাজগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়ে এয়ার মার্শাল মোতায়েন করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ প্রস্তাবে তেমন যৌক্তিকতা নেই উল্লেখ করে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছেভারত ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশের ফ্লাইট এখানে আসছে। কোনো দেশই তাদের ফ্লাইটে এয়ার মার্শাল মোতায়েন করে না। এটা যদি ভারতের নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইস্যুতে দরকার হয়, তাহলে আমাদের দেশের ফ্লাইটগুলোতেও ভারতে যাওয়ার সময় এয়ার মার্শাল মোতায়েনের সমান সুযোগ দিতে হবে। একতরফা শুধু ভারত থেকে আসা ফ্লাইটগুলোতেই এয়ার মার্শাল মোতায়েনের যৌক্তিকতা নেই।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাস, কোস্ট গার্ড, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পাসপোর্ট ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ভূমি, পররাষ্ট্র ও সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ভারতের রাষ্ট্রদূতসহ অন্য কর্মকর্তারা।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশ-ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হওয়ায় বৈঠকটি স্থগিত করা হয়। মুজিববর্ষ উপলক্ষে দুদেশের এই সচিব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার ও কার্যকরে উভয়পক্ষ অঙ্গীকার করে। মধ্যাহ্নভোজের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান উপস্থিত হয়ে ভারতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের ধন্যবাদ জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত