সরব প্রতিবাদ ও নীরব কান্না

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ০১:৫৬ এএম

সরকার যারা চালাচ্ছেন তাদের কথা শুনলে মনে হয় বাংলাদেশ সব দিয়েছির দেশ, কিন্তু জনগণের কাছে আবার এই দেশ সব পেয়েছির দেশ নয়। তাই মাঝেমধ্যেই রাজপথে নামতে হয় তাদের। কদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের রাজপথ মুখর হয়ে আছে স্লোগানে। এই স্লোগান দিচ্ছে যারা তারা রাষ্ট্রের কাছে কোনো আর্থিক সুবিধা চাইছে না। রাস্তায় নেমেছে যারা তারা তরুণ যুবক। তারা চায় তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হোক, তাদের ঘোষিত পরীক্ষাগুলো সময়মতোই নেওয়া হোক। রাষ্ট্রও তাদের পরীক্ষা নিতে চাইছে তবে পরীক্ষার হলে নয়, রাস্তায়। জলকামান, লাঠি, টিয়ার শেল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে মুখোমুখি। ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব কটিতেই ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ করছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজের ছাত্রছাত্রী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের ছাত্রছাত্রীরা প্রায় সব শহরে এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। তাদের একটা যুক্তি কোনোভাবেই এড়ানো যাচ্ছে না সব চালু এবং চলছে তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ কেন? রাস্তায় যারা প্রতিবাদ করছে তাদের সংখ্যা কয়েক হাজার কিন্তু এদের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কম নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ১০৬টি প্রাইভেট বা বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজসমূহের ৩১ লাখ ছাত্রছাত্রীর প্রায় সবাই এই দাবির সঙ্গে একমত বলে মনে করা হচ্ছে। 

বাংলাদেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন আছে বলে দাবি করা হয়। সেখানে কর্র্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে শিক্ষাকার্যক্রমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বাস্তবে তারা অধীন থাকতে যে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তার প্রমাণ অতীতে অনেকবার দিয়েছেন। অতীতের অনেক ঘটনার মতো এবারও তারা কিন্তু তাদের নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্ত পাল্টাতে মুহূর্ত দেরি করলেন না। সোমবার অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, রোজার ঈদের পর আগামী ২৪ মে থেকে দেশের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে। তার আগে ১৭ মে আবাসিক হলগুলো খুলবে। খোলার আগে কোনো পরীক্ষা হবে না। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা ও হল খোলার ঘোষণা দিয়েছিল, সেই সিদ্ধান্তও বাতিল হবে। তিনি অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, অনলাইনে ক্লাস চলবে। শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেছিলেন, হলে ওঠার আগেই আবাসিক শিক্ষার্থীদের করোনাভাইরাসের টিকা নিতে হবে। হল খোলার আগেই আবাসিক শিক্ষার্থী, আবাসিক হলের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টিকার ব্যবস্থা করা হবে। তবে কারও যদি স্বাস্থ্যগত (মেডিকেল কারণে) কারণে টিকা না নেওয়ার মতো অবস্থা থাকে, তাহলে তারা হলে থাকতে পারবে। অন্যদিকে ২৪ মের আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কোনো পরীক্ষা হবে না। তবে অনলাইনে ক্লাস চলবে। এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মিল রেখে বিসিএস পরীক্ষার আবেদন ও পরীক্ষার তারিখ পেছানো হবে। করোনার কারণে বয়স অতিক্রম হয়ে যাওয়া কোনো পরীক্ষার্থী যেন এ ব্যাপারে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবাক করা ব্যাপার হলো এই যে, শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা দিতে যতটা সময় লেগেছে তার চেয়েও কম সময়ে পরীক্ষা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ব্যাস! ক্লাস, পরীক্ষা নেওয়ার সব আয়োজন শেষ!

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েছিল ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এই কলেজগুলোয় মোট শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ। এই কলেজগুলোর সেশন জ্যাম চরম। করোনা পরিস্থিতিতে তাই ছাত্রছাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে, কী হবে তাদের এই কথা ভেবে।

কর্র্তৃপক্ষ তাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিল এবং পরীক্ষা চলছিল কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণায় তা বন্ধ করে দেওয়া হলো। এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত সাত কলেজের পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা হয়। প্রতিবাদে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসে। টানা তিন দিন আন্দোলনের পর সাত কলেজের অধ্যক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে অনলাইন বৈঠক করেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় (ঢাবি) অধিভুক্ত সাত কলেজের চলমান এবং ঘোষিত পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে। সাতটি বড় সরকারি কলেজের দুটি পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তন করা হয়। চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা আগামী ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। আর তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৩ মার্চ। এই সিদ্ধান্ত পাল্টানোয় প্রমাণ হয় যে ছাত্রদের দাবির যৌক্তিকতা ছিল। তাহলে আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলা কি ভুল নয়!

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। শিক্ষামন্ত্রীকে পাঠানো ই-মেইলে তারা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্নমধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান। করোনা মহামারীর কারণে অনেক অভিভাবক আর্থিক সংকটে আছেন। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর সুস্পষ্ট। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষাগুলো নেওয়ার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুসারে চলমান পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ও চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিজ খরচে ধারদেনা করে ঘরভাড়া নিয়েছে। এখন পরীক্ষাগুলো স্থগিত করায় শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।’ তারা আরও বলেন, ‘এখন মহামারী চলছে। অনেক কিছুই আমাদের ছাড় দিতে হবে। পুরো পৃথিবীতেই খারাপ সময় যাচ্ছে। শিক্ষা থেকে অর্থনীতি, রাজনীতি থেকে শিল্পচর্চা সব জায়গা স্থবির হয়ে আছে। শিক্ষার্থীরাও দীর্ঘদিন ধরে ঘরে বসে আছে। এর মধ্যে হল বন্ধ রেখে পরীক্ষার আয়োজন করা হলে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে রাজি হয়। এখন কারও দুটি, কারও তিনটি, আবার কারও চারটি পরীক্ষা বাকি আছে। এ অবস্থায় পরীক্ষা স্থগিত করে দিলে শিক্ষার্থীরা আরও হতাশ হয়ে পড়বে।’

হতাশ শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, তাদের বাবা-মায়েরাও হয়ে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের সরব প্রতিবাদ তো চোখে দেখা যায়, অভিভাবকদের নীরব কান্না ও হাহাকার কেউ কি দেখেন? ছাত্র পড়িয়ে যে ছাত্রছাত্রীরা তাদের পড়াশোনার খরচ বহন করে, এই করোনাকালে তাদের দুর্দশার কোনো সীমা ছিল না। গ্রাম ছেড়ে এসে ঝুঁকি নিয়েই তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে থাকতে চেয়েছে এবং থেকেছে। করোনা মহামারী বিশ্বব্যাপী তার ছোবল হেনেছে এটা তো সবাই স্বীকার করে। ফলে শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না এ কথা সরকারি মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু কথা ও কাজে মিল না থাকলে মানুষ কি সে কথায় আস্থা রাখে? অফিস-আদালত, কল-কারখানা সব চলছে,

ট্রেন-বাস চলছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে উপচে পড়া মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে, শ্রমিকরা বস্তিতে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবাস করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের মেসগুলোয় এক রুমে পাঁচ-ছয়জন করে ছাত্ররা থাকছে, ২০ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসায় ২৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাস অব্যাহত রেখেছে, সব ধরনের নির্বাচন হচ্ছে, এমনকি সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন বন্ধ থাকবে? করোনার টিকা নেওয়ার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে যদি বলা হয় তাহলেও একটা প্রশ্ন এসে যায়। ৪০ বছর বয়সের নিচের কাউকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা কি ৪০ বছরের বেশি বয়সী? তারা টিকা না পেলে হলে উঠবেন কীভাবে? পাঁচ লাখ শিক্ষক না হয় টিকা পাবেন, চার কোটি শিক্ষার্থীকে মে মাসের মধ্যে টিকা দেওয়া কি সম্ভব?  

অনেকে বলছেন, শিক্ষা ও পরীক্ষা নিয়ে এসব তুঘলকি সিদ্ধান্ত কর্র্তৃপক্ষ কীভাবে নিতে পারে? দিল্লির সুলতান মুহাম্মাদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) ছিলেন বৈচিত্র্যেপূর্ণ একজন শাসক। যা মনে চাইত তেমন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন না, সমালোচনা সহ্য করতেন না। প্রতিপক্ষ দমনে ভীষণ নির্দয় আবার কারও কারও প্রতি ছিলেন খুবই সদয়। দিল্লি থেকে রাজধানী সরিয়ে দৌলত নগরে নিতে ৭০০ মাইল রাস্তা, সরাইখানা নির্মাণ, গাছ লাগানো এসব উন্নয়ন যেমন করেছেন, খাজনা আদায়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তার নিষ্ঠুরতাও ছিল সীমাহীন। তার মৃত্যুতে ঐতিহাসিকরা বলেছেন, প্রজারা যেমন বেঁচে গেলেন, তুঘলকও তেমনি নিষ্কৃতি পেলেন। কিন্তু সে তো ইতিহাস! বর্তমানের সঙ্গে কি তাকে আর মেলানো যাবে!  

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কী চায়? শিক্ষা জীবন সময়মতো শেষ করতে আর কর্মজীবনে প্রবেশ করে জীবনটাকে একটু সাজাতে নিজের মতো করে। কিন্তু কি পায় বা পাবে তারা? অল্প কয়েকটি চাকরির জন্য নিজেদের মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রের কাছ থেকে নানা রকম প্রতিশ্রুতি আর প্রতারণা এবং শেষে পরিণত হয় স্বল্প বেতনে কাজ করা শ্রমিক অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার অসহায় শিকারে। এদের কেউ কেউ আবার দেশে কোনো ভবিষ্যৎ না দেখে ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় বিদেশে। ফলে কয়টা টাকার জন্য দেশ হারায় সম্ভাবনাময় যৌবনের শক্তি। এই শিক্ষার্থীরা এখন প্রায় অস্থির হয়ে উঠেছে। একটা বছর চলে গেল, করোনা সংক্রমণ এখন সর্বনিম্ন, সরকার করোনা নিয়ন্ত্রণে তার সাফল্যের কথা প্রচার করছে এবং বিশ্ববাসীও নাকি অবাক বিস্ময়ে তা দেখছে। তাই এ সময়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনায় রেখেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা। সব দিক বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষায় সরকারের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ প্রত্যাশা করে জনগণ। রাজপথের সরব প্রতিবাদের পাশাপাশি মানুষের নীরব কান্নার শব্দটাও যেন তারা শোনে।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত