আজ এনইসি সভায় উঠছে আইএমইডি প্রতিবেদন

কাজ শেষ না করেই ৯২ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২১, ০৪:৩৮ এএম

অসম্পূর্ণ রেখেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিভুক্ত (এডিপি) ৯২ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ রেখে প্রকল্প সমাপ্ত করাতে প্রকল্প গ্রহণের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছে সরকারের প্রকল্প তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। ২০১৯-২০ অর্থবছরের এক বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছর ১৪৯টি প্রকল্পে গত অর্থবছরের অগ্রগতি ছিল শূন্য। উন্নয়ন কর্মকান্ডে ছিল কভিড-১৯-এর মারাত্মক প্রভাব। আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হচ্ছে। সভায় প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। তিনি ভার্চুয়ালি এ সভায় অংশ নেবেন।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, আজকের সভায় মোট চারটি এজেন্ডা রয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি চূড়ান্তকরণ, ২০১৯-২০ অর্থবছরের আরএডিপি বাস্তবায়ন ও চলতি অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত আইএমইডির দুটি আলাদা প্রতিবেদন এবং পরিকল্পনা কমিশনে কার্যক্রম বিভাগের এডিপির খাত পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত আরেকটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আজকের সভায় প্রধানমন্ত্রী এডিপির কাজে গতি বাড়াতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের এডিবি বাস্তবায়নে সমস্যা এবং আগামীতে এসব চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ উপস্থাপন করবে আইএমইডি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এডিপি বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে, তা অনেক পুরনো। এগুলো বছরের বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হলেও আশু কোনো সমাধান হয়নি। এখন এটিকে আবারও প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করার মাধ্যমে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বাস্তবিক পক্ষে এডিপির কার্যক্রমে গতি আনতে হলে আইএমইডি সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠে থাকতে হবে। আমি নিজে কিছু প্রকল্প পরিদর্শন করার ফলে দ্রুত ফল মিলেছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ না করেই সমাপ্তি ঘোষণা কাম্য নয়। এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হয় না। ফলে সরকারের অর্থ অপচয় হয়, জনগণ ফল পায় না।

আইএমইডির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপিতে ২ লাখ ১ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ১ হাজার ৮৯৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুকূলে এ বরাদ্দ দেওয়া হয়। পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১ হাজার ৮৯৯টি প্রকল্পের মধ্যে ৩০৫টি প্রকল্প সমাপ্তির জন্য নির্ধারণ করা ছিল। এগুলোর মধ্যে ১৪১টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়। অন্যদিকে আলোচ্য বছরে সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ছিল না, এমন ৪১৭টি প্রকল্প মন্ত্রণালয় থেকে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে সমাপ্ত প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮২টি, যার মধ্যে ৯০টি প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে অর্থাৎ বাকি ৯২টি প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

১৪৯ প্রকল্পের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি : প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মোট বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে গত অর্থবছরে ১৪৯টি প্রকল্পের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি, বাস্তবায়নের হার ছিল শূন্য। ৩৮৭টি প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৫০-৭৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছিল, ৭৬-৮৯ শতাংশ অগ্রগতি ছিল ২১২টির, ৯০-৯৯ শতাংশ অগ্রগতি ছিল ১২৬টির এবং ১০০ ভাগ কাজ অর্থ ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১৬টি প্রকল্পের।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ইতিহাসে ২০১৯-২০ অর্থবছর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারী বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার ফলে দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। ৮ মার্চ ২০২০ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ৬৬ দিন দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাপকভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছে। ওই বছর মোট বরাদ্দে মাত্র ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছিল, যা স্মরণকালের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

১৮ চ্যালেঞ্জ : আইএমইডির প্রতিবেদনে এডিপি বাস্তবায়নে ১৮টি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রণয়ন ও অনুমোদন পর্যায়ে ৭টি, বাস্তবায়ন পর্যায়ে ৭টি ও বাস্তবায়ন উত্তরণ পর্যায়ে ৪টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রকল্প প্রণয়ন ও অনুমোদন পর্যায়ে : প্রকল্প প্রণয়ন অনুমোদনের সময়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে প্রকল্প গ্রহণে সুবিধাভোগীদের চাহিদার কথা বিবেচনা না করা, সার্বিক কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ না করা, সমীক্ষা যথাযথভাবে না করেই প্রকল্প গ্রহণ, বেইলাইন ডেটা সংরক্ষিত না থাকা, প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগেই ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভূমি চিহ্নিতকরণ এবং ওই জেলা প্রশাসকের প্রাথমিক সম্মতি গ্রহণ না করা। মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর (এমটিবিএফ) সিলিং অনুসরণ না করা এবং প্রকল্পের এক্সিট প্ল্যান যথাযথভাবে প্রণয়ন না করা।

বাস্তবায়ন পর্যায় : উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লিখিত কর্মপরিকল্পনা এবং ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন না করা। প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, মাঠপর্যায়ে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। নিয়মিত পিইসি ও স্টিয়ারিং কমিটির সভা না হওয়া, একই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত কাজ দেওয়া, একই ব্যক্তিকে একাধিক প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ ও ঘন ঘন পরিবর্তন ইত্যাদি।

বাস্তবায়নের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ : প্রকল্প সমাপ্তির তিন মাসের মধ্যে সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) আইএমইডিতে পাঠানোর নির্দেশ মানা হচ্ছে না। প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত কার্যক্রম প্রকল্প শেষে পরিচালনার জন্য রাজস্ব বাজেটের অপ্রতুলতা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমাপ্ত প্রকল্পের আওতায় সৃষ্ট অবকাঠামো এবং সংগৃহীত যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। বাস্তবায়নের পরবর্তী সময়ে দক্ষ জনবল না থাকায় প্রকল্প শেষ হওয়ার পর প্রায়ই বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তি করতে হয়, যা সরকারি অর্থের অপচয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত