৫০ বছরেও নির্বাচন কমিশন নিয়োগের আইন হয়নি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ০২:১২ এএম

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে এসেও দেশের জনগণের ভোটাধিকার যারা নিশ্চিত করবেন সেই ভোটকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আইন হয়নি। সাংবিধানিক বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগে এখনো নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। আরেকটি নতুন ইসি গঠনের এক বছরেরও কম সময় হাতে আছে। এর মধ্যে আইন প্রণয়ণের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এবারও সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নতুন কমিশন গঠন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এ পর্যন্ত ১২টি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল ১৯৭২ সালের জুলাইতে। সবশেষ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত কমিশন এখন দায়িত্ব পালন করছে।

নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনের বাধ্যবাধকতা থাকলে সরকার খেয়াল খুশিমতো পছন্দের লোক নিয়োগ দিতে পারে না। শুধু এ সরকারই নয়; এর আগের সরকার এবং দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার অভাবেই এ আইন হচ্ছে না। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট আইন না থাকার কারণে সিইসি ও ইসি নিয়োগে কিসের ভিত্তিতে তাদের যোগ্য বা অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে সেটির কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। কোনো নির্দিষ্ট আইন না থাকায় সিইসি ও ইসিদের নিয়োগের জন্য ২০১২ সালে একটি ও ২০১৭ সালে আরেকটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি।

সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের (৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো নির্বাচন কমিশনারের পদের মেয়াদ তার কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর হবে। বর্তমান কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শপথগ্রহণ করে দায়িত্ব পালন শুরু করে। সে হিসেবে ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের মেয়াদ রয়েছে। এরপরই নতুন কমিশন দায়িত্ব নেবে। এ ক্ষেত্রে চলতি বছরের শেষভাগেই ইসি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।

নতুন কমিশন গঠন বিষয়ে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের (১) ধারায় বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সাংবিধানিক পদগুলোতে নির্বাচন কমিশন বিচারপতি ইত্যাদি নিয়োগের ব্যাপারে আইন করার কথা তো সংবিধানে বলা ছিল। অনেক সরকার এসেছে গেছে, কেউই এ আইন করেনি। কারণটা স্পষ্ট, সেটা হলো আইনের বাধ্যবাধকতা থাকলে; সম্পূর্ণ সরকারের ইচ্ছা এবং খেয়াল খুশিমতো নিয়োগ কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়। এ বাধাটা যাতে না আসে সেজন্যই এ আইন করা হচ্ছে না। সব সরকারই নিজের স্বার্থে কাজ করে। দেশের স্বার্থটা মুখ্য হলে এ আইনগুলো হয়ে যেত। আমাদের আশপাশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশে এ আইন আছে।’

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোনে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা নির্বাচন কমিশনের বিষয় নয়; আইন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিষয়। একটা ড্রাফট আমরা করে দিতে পারি। তবে অফিশিয়ালি আমাদের এ আইনের বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই।’

এ নিয়ে শামসুল হুদা কমিশন একটা ড্রাফট করেছিল জানিয়ে এ কমিশনার বলেন, ‘অফিশিয়ালি এটা আমাদের দায়িত্ব নয়। এটা করবে সরকার। নির্বাচন কমিশন একটা খসড়া দিতে পারে। আমাদের কোনো সুযোগ নেই।’

এবারও কি তাহলে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ হবে এ প্রশ্নের জবাবে ইসি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা মহামান্য রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার কী ধরনের নির্দেশনা দেবেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ড্রাফট করেছিলাম। সাজেশন, আমরা তো আর আইন বানাই না। নির্বাচন কমিশন তো আইন বানায় না। আমরা সাজেসটিভ একটা আউটলাইন দিয়েছিলাম। এটা ২০০৯ সালে সরকার গঠিত হলে তার বেশ কিছুদিন পরে। এটা আইন মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছিল। সেটার তো আর কোনো হদিস পেলাম না। কোনো কিছুই হয়নি। এখন আবার নাগরিক সমাজে এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) একটা ড্রাফট বানিয়েছিল। কালেভদ্রে কথাগুলো পত্র-পত্রিকায় আসলেও খুব একটা কার্যকর পদক্ষেপ কেউই নেয়নি। গভর্নমেন্টও নেয়নি; এর আগের সরকারও কখনো নেয়নি। বড় বড় পার্টির মুখ থেকেও শোনা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের আইন মন্ত্রণালয় আইন তৈরি করে তারপর পার্লামেন্টে যায়। পার্লামেন্টে পাস হয়। সিটিং গভর্নমেন্ট যদি চায় তারা আইন পাস করতে পারে যেকোনো সিটিংয়ে। সরকার যদি চায় আইন মন্ত্রণালয় তো ড্রাফট করতেই পারে। কিন্তু হচ্ছে না। এখন যা হচ্ছে অ্যাডহক অ্যারেজমেন্টে হচ্ছে। তো অ্যাডহক হওয়াতে কী হয়, কেউ বলে এটা হইছে কেউ বলে ওইটা হইছে। প্রথম থেকেই ইলেকশন কমিশন নিয়ে শুরু হয়ে যায়; অমুক-ওমুকের লোক, তমুক তমুকের লোক। ফলে ইলেকশন কমিশন শুরু থেকেই একটা প্রশ্নের মুখে পড়ে।’

বর্তমান নির্বাচন কমিশন গত বছর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২ সংশোধন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদ-পদবির নাম বাংলায় করার উদ্যোগও নিয়েছিল তারা। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরুর পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) কবিতা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ আইন নির্বাচন কমিশন করে না এটা সরকারের বিষয়; কমিশন কোনো আইন করে না।’ হুদা কমিশন একটা ড্রাফট পাঠিয়েছিল, আপনারা কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হুদা কমিশন পাঠিয়েছিল সেটা তাদের বিষয়।’

এবারও কি তাহলে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে শাহদীন মালিক বলেন, ‘সার্চ কমিটি তো আইনে নেই। সরকার একটা লোক দেখানো বাছাই কমিটি করে। তারা কীভাবে বাছাই করে তার পদ্ধতিও জানা নেই। এজন্য পুরো জিনিসটাই হলো সরকার নিজের ক্ষমতার স্বার্থ ক্ষুন্ন হোক এ ধরনের কোনো আইন সরকার করতে রাজি না। এ সরকার না, শুধু কোনো সরকারই না। এটা করে না কারণ করলে নিজের স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। অযোগ্য লোককে নির্বাচিত করলে অযোগ্য লোককে বাছাই করলে অবশ্যই তাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। আইন তো করবে পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট ব্যবসায়ীদের পার্লামেন্ট, যেখানে ৬০ পার্সেন্টের বেশি ব্যবসায়ী। তাদের মূল লক্ষ্য হলো তাদের অর্থ আয় বৃদ্ধি করা। অতএব ওই পার্লামেন্টে আমি এগুলো আশা করি না। পার্লামেন্ট তো আরেকটা এফবিসিসিআই। এটা আরেকটা এফবিসিসিআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত