যৌতুক না পাওয়ার জের

স্বামীর নির্যাতনে দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন তরুণী

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২১, ০১:৫২ এএম

শরীয়তপুরে যৌতুক না পেয়ে ঠুনকো অভিযোগে এক তরুণীকে নির্যাতনের পর মাথার চুল কেটে দিয়েছেন তার স্বামী। নির্যাতনের শিকার আনিকা আক্তার (১৯) এখন দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন বলে জানিয়েছেন তার স্বজনেরা। মাথা ও চোখের তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের শয্যায় কাতরাচ্ছেন তিনি। এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হুগলি গ্রামে স্বামী সাদ্দাম হোসেনের বাড়িতে আনিকার ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

আনিকা শরীয়তপুর পৌরসভার স্বর্ণঘোষ গ্রামের আবু তালেব খানের মেয়ে। নির্যাতনের ঘটনায় আবু তালেব খান বাদী হয়ে সদরের পালং মডেল থানায় গত শুক্রবার রাতে একটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এতে সাদ্দাম হোসেন, তার বাবা আলী আহাম্মদ মোল্লা ও মা রোকেয়া বেগমকে আসামি করা হয়েছে।

থানায় করা অভিযোগ এবং আনিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হুগলি গ্রামের আলী আহাম্মদ মোল্লার ছেলে সাদ্দাম হোসেন মোল্লার (৩০) সঙ্গে আনিকা আক্তারের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর। সাদ্দাম ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অফিস সহায়ক হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে (মাস্টার রোল) চাকরি করছেন। বিয়ের পর থেকে চাহিদা অনুযায়ী যৌতুক না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে আনিকাকে মারধর করে আসছেন সাদ্দাম হোসেন, শ^শুর আলী আহাম্মদ (৬০) ও শাশুড়ি রোকেয়া বেগম (৫০)। সর্বশেষ গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সাদ্দামের চাকরি নিয়মিত ও বাড়ি করবেন বলে আনিকাকে বাবার বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা আনতে বলেন স্বামী, শ^শুর ও শাশুড়ি। আনিকা টাকা আনতে অস্বীকার করলে তাকে লাঠি দিয়ে বেদম পেটান তারা। একপর্যায়ে সাদ্দাম  আনিকার চুলের মুঠি ধরে ঘরের দেয়ালের সঙ্গে মাথা ঠুকতে থাকেন। একপর্যায়ে আনিকা চেতনা হারিয়ে ফেলেন। পরে চেতনা ফিরলে মাথার যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন তিনি। এরপর কাঁচি দিয়ে আনিকার মাথার চুল কেটে দেন সাদ্দাম। তাকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসাও করানো হয়। আনিকা ভয়ে সেদিনের নির্যাতনের কথা বাবা-মাকে বলেননি। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছিল চোখে ঝাপসা দেখার পাশাপাশি আনিকার মাথার যন্ত্রণা বাড়তে শুরু করে। এ তথ্য জানতে পেরে আনিকাকে তার বাবা আবু তালেব খান শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার করেন। পরে আনিকাকে ৩ মার্চ গোপালগঞ্জ শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আই হসপিটাল অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসক তাকে ঢাকার শের-ই-বাংলা নগর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসকরা আনিকার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলেন। সেসব পরীক্ষা করে পরদিন আনিকাকে শরীয়তপুরের বাড়িতে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু গত শুক্রবার (৫ মার্চ) আনিকার শারীরিক অবস্থার ফের অবনতি হলে রাতে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আবার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। এখন দুই চোখে কিছুই দেখতে পারছেন না আনিকা। তিনি ব্যথায় কাতরাচ্ছেন।

আনিকার মা ফাহিমা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাদ্দাম ও তার মা-বাবা মিলে আমার মেয়েকে নির্যাতন করেছে। মেয়ের মাথা ওয়ালের (দেয়াল) সঙ্গে টাক (ধাক্কা) দিছে। আমার মেয়ে এখন চোখে দেখে না। মেয়ের মাথার চুল কেটে দিছে। শরীর ও মাথার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মেয়েটি। মেয়ের অবস্থা খুবই খারাপ। ওরা আমার মেয়ের অবস্থা এ রকম করছে। মেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। আমি এর বিচার চাই।’

আনিকার বাবা আবু তালেব খান বলেন, ‘চাকরি ও বাড়ি করবে বলে সাদ্দাম ও তার পরিবার আমার মেয়ের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা চায়। মেয়ে বলছে, বাবা গরিব, সামান্য একটি দোকান করে। এত টাকা পাবে কোথায়? বলার সঙ্গে সঙ্গে সাদ্দাম, শ্বশুর আলী আহাম্মদ ও শাশুড়ি রোকেয়া আনিকাকে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে সাদ্দাম আনিকার চুলের মুঠি ধরে ওয়ালের সঙ্গে মাথা টাকাতে (ধাক্কা) থাকে। মেয়ে ভয়ে আমাদের কিছু বলেনি। মেয়ের মাথার সুন্দর চুলগুলোও কেটে ফেলেছে। জানতে পেরে উদ্ধার করে চিকিৎসা করাচ্ছি। ওরা দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে নির্যাতন করে আসছে।’

তবে নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে সাদ্দাম মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কেন আমার স্ত্রীকে মারধর করব? কেনইবা চুল কাটব! আমি শুনেছি আমার স্ত্রী অসুস্থ। তাই শ্বশুরের মোবাইলে বারবার ফোন দিচ্ছি, তিনি ধরছেন না।’

আনিকার বাবার করা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পালং মডেল থানার ওসি মো. আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘গৃহবধূ নির্যাতনের ঘটনায় শুক্রবার রাতে একটি অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত