বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২১, ০২:২৬ এএম

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (পূর্বপ্রচলিত নাম রেসকোর্স ময়দান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের এক জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে যে ভাষণ প্রদান করেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল মঞ্চের কাছ থেকে সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত বেঞ্চে বসে ঐ কালজয়ী ভাষণ শোনার। আমি তখন দি পিপল পত্রিকায় কাজ করি। ওই পত্রিকা ভবন থেকে তখন সবেমাত্র একটি বাংলা সাপ্তাহিক কাগজ বেরিয়েছে। নাম গণবাংলা। গণবাংলার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন সাংবাদিক ও ভাসানী ন্যাপের অন্যতম নেতা জনাব আনোয়ার জাহিদ।

আমি নবীন সাংবাদিক। পিপল-এর পাশাপাশি গণবাংলাতেও লিখি। সিদ্ধান্ত নিলাম, জাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কাভার করতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাব। ওই ভাষণটিই যে পরে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ হিসেবে গণ্য হবে তা কে জানত! তবে, বঙ্গবন্ধু যে ওইদিন একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন তা মানুষের মুখে মুখে এবং ঢাকার আকাশে-বাতাসেও ধ্বনিত হচ্ছিল।

আমাদের মালিক-সম্পাদক আবিদুর রহমান সাহেব পূর্বেই স্থির করে রেখেছিলেন, ওই ভাষণের পরপরই রেসকোর্সে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সারবস্তু নিয়ে গণবাংলা দ্রুতই একটি টেলিগ্রাম প্রকাশ করবে। ভাষণ শোনার পর আমিও ওই টেলিগ্রামে কিছু একটা লিখব। সেইমতো স্থির করেই আমরা তিল ঠাঁই নাই মাঠে উপস্থিত হই। মঞ্চের কাছে রাখা সাংবাদিকদের আসনে আরামে বসতে পেরে আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান বলে ভাবতে থাকি।

বঙ্গবন্ধুর সভায় আসতে বিলম্ব হচ্ছিল। তখন জাহিদ ভাই আ স ম আবদুর রবের সঙ্গে কিছু কথা বলেন। কথাগুলো ছিল এরকম : কী আপনার নেতা কি আজ স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন? তখন তরুণ বিপ্লবী নেতা রব পাঞ্জাবির আস্তিন গুটাতে গুটাতে বলেন, ‘উনি না করলে আজকে আমরাই স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেব।’ জাহিদ ভাই তখন রবকে বিদ্রুপ করে বলেন, ‘দেখা যাবে। নেতা আসলে তো আপনারা বিড়াল হয়ে যাবেন।’ আ স ম আবদুর রব জাহিদ ভাইয়ের ওই বিদ্রুপের কী জবাব দিয়েছিলেন আমার স্মৃতিতে নেই। খুব সম্ভবত তখনই উদ্যানের জনসমুদ্রের জয়ধ্বনিতে বঙ্গবন্ধুর আগমনবার্তা প্রচণ্ড ঢেউয়ের মতো রমনার সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে পড়েছিল।

অন্যদের মতো আমি নিজেও সেদিন বক্তব্য শোনার জন্য ব্যাপক আগ্রহী ছিলাম। সেদিনের ওই ভাষণই পরবর্তী সময়ে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একসময় মঞ্চে আসেন বঙ্গবন্ধু। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, পাজামা এবং হাতকাটা কালো কোট। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে মঞ্চে ওঠেন তিনি। ‘জয় বাংলা!’ উপস্থিত লাখো জনতাকে অভ্যর্থনা জানান। উত্তরে বিশাল জনতাও একসঙ্গে ‘জয় বাংলা’ বলে ওঠে। বঙ্গবন্ধু বলতে শুরু করলেন, ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়...’ আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো রুদ্ধশ্বাসে বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত কণ্ঠের বজ্রভাষণ শুনি। আমার আশপাশের রিপোর্টাররা তাঁর কথা কাগজে টুকে নিচ্ছিল। আমারও উচিত ছিল তাই করা। কিন্তু আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাই। একসময় তাঁর ভাষণ শেষ হয়। লাখো জনতার জয় বাংলা ধ্বনি শ্রবণ করতে করতে তিনি মঞ্চ ত্যাগ করে উদ্যানের মাটিতে পা রাখেন। আমরা টেলিগ্রাম প্রকাশের লক্ষ্য সামনে নিয়ে দ্রুত সভাস্থল ত্যাগ করে অফিসে ফিরে যাই। অফিসে ফিরে জাহিদ ভাই বলেন, যান একটা দ্রুত রিপোর্ট লিখে ফেলুন। কাগজ-কলম নিয়ে আমি লিখতে বসি। কিন্তু কিছুতেই স্মরণ করতে পারি না বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আসলে কী বলেছেন।

শুধু একটি বাক্যই ঘুরে ঘুরে আমার মনে পড়তে থাকে। পিন আটকে যাওয়া ভাঙা রেকর্ডের মতো ওই বাক্যটিই আমার মনের মধ্যে ধ্বনিত হতে থাকে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আমি ওই বাক্যটি দিয়েই একটি খবরের শিরোনাম তৈরি করি এবং পরে নিচে জনসভার একটি ছোট্ট বর্ণনা লিখি। জাহিদ ভাই আমার রিপোর্ট পড়ে হাসেন। বলেন, রিপোর্টিং কি এতই সোজা? বঙ্গবন্ধু যে ৪ দফা শর্ত দিয়েছেন তা বুঝতে পারেননি? আমি মাথা নেড়ে স্বীকার করে বলি, না। তিনি তখন হো হো করে হাসেন। বলেন, যান আপনার কবিতা নিয়ে অগত্যা আর কী করি। আমি একটি ছোট্ট কবিতা লিখে গণবাংলার টেলিগ্রামে দিই। আমার ওই রিপোর্টটি অসমাপ্তই থেকে যায়। রিপোর্টের বদলে গণবাংলার টেলিগ্রামে আমার একটি কবিতা ছাপা হয়। কিন্তু ওই রিপোর্টটি আমার মাথার ভেতরে থেকে যায়। সেই থেকে দশ বছর পর, এটি যে কোনো একসময় কবিতা হয়ে আমার মগজ থেকে মুক্তি লাভ করবে তা তখন আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টিকে নিয়ে জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি যখন ইতিহাস বিকৃত করার পথে পা রাখে তখন ১৯৮০-৮১ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময় ইতিহাস বিকৃতির বিপরীতে, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ৭ মার্চের ভাষণটিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আমি ওই ভাষণের পটভূমি বর্ণনা করে একটি কবিতা রচনা করি। রচনান্তে কবিতাটির নাম রাখি ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’।

আজ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পাশে যখন আমার এই কবিতাটিকে ক্রমশ স্থান করে নিতে দেখি তখন আমার খুবই আনন্দ হয়। আমি যখন ওই কবিতাটি লিখেছিলাম তখন আমার ধারণা ছিল, ইতিহাস বিকৃতির উত্তাল তরঙ্গে বাংলাদেশ থেকে একদিন হয়তো বা ওই ভাষণটি হারিয়ে যাবে। তখনো টিকে থাকবে আমার এই কবিতাটি। আর এই কবিতাটিই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠোচ্চারিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার অমর কাব্যবাণীকে বহন করে নিয়ে যাবে ভবিষ্যতের বাঙালির কাছে যুগ থেকে যুগান্তরে। কাল থেকে কালান্তরে। তা যে হয়নি, সে আমাদের সবারই সৌভাগ্য।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কোথাও লেখা ছিল না। তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। মনে হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধুর ভেতর থেকে কেউ একজন শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তাঁর কণ্ঠে পৌঁছে দিচ্ছেন। আর এ কারণেই কবিতায় আমি বঙ্গবন্ধুকে ‘কবি’ সম্বোধন করেছি। লিখেছি, “লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’ ”

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণের মাধ্যমেই অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। ‘৭ মার্চ নিয়ে আমার লেখা কবিতার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ যে চিরকাল মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আমার কাছে ভাষণটি অনেকটা রাজনৈতিক কবিতার মতো। স্বয়ংসম্পূর্ণ এই ভাষণ বাঙালি জাতির অমূল্য সম্পদ।’ অনেকেই এই ভাষণকে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেন। ‘আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে গেটিসবার্গের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমি অনেক রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য শুনেছি কিন্তু এটা আমাকে বলতেই হবে যে, বঙ্গবন্ধুর তুলনায় নিপুণ, সুন্দর ভাষণ আর কেউই দিতে পারেননি।’ সেটা ছিল শিহরন জাগানোর মতো ভাষণ। অন্যান্য ঐতিহাসিক ভাষণের সঙ্গে এর পার্থক্য হচ্ছে এটি কখনই পুরনো হবে না। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দিন যত যাচ্ছে এ ভাষণ আরও মহিমান্বিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত