স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাসপোর্ট আইনের খসড়া

অর্থ ও মানব পাচারকারীরা পাসপোর্ট পাবেন না

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২১, ০২:৩৮ এএম

বাংলাদেশের পাসপোর্ট ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট-সংক্রান্ত আইন যুগোপযোগী করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইন, ২০১৯’ নামে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এতে অর্থ, মানব, মুদ্রা, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র পাচার এবং উগ্রবাদে জড়িতদের নামে পাসপোর্ট ইস্যু নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাংকের ঋণখেলাপি, নিষিদ্ধ সংগঠন ও আইনত নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িতদের বিদেশ গমনে বাধা দেওয়া এবং ফৌজদারি মামলায় উপস্থিতি বা দণ্ড এড়াতে কেউ দেশ ত্যাগ করতে চাইলে, তার অনুমতি বাতিলের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আমাদের সরকার তৎপর রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর এ-সংক্রান্ত একটি আইনের খসড়া তৈরি করে আমাদের কাছে পাঠিয়েছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করছি, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা অনেক সময় নানা কৌশলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি করছে। টের পাওয়ামাত্র আমরা এগুলো বাতিল করছি। এখনো যেগুলো বাতিল করা হয়নি, সেগুলো বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

একই বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘প্রস্তাবিত বা খসড়া যেভাবেই বলা হোক, এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে (আইন মন্ত্রণালয়) এ-সংক্রান্ত কিছু আসেনি। এলে আমরা সেটি দেখব।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনের আওতায় পাসপোর্ট করতে গেলে আবেদনকারীকে অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হবে। খসড়া আইনে রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত, জঙ্গিবাদে জড়িত, অর্থ পাচারকারী, অস্ত্র ও মাদক কারবারিরা পাসপোর্ট পাবেন না। এমনকি ঋণখেলাপিরা বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি পাবেন না। এতে অর্থ পাচার নিরুৎসাহিত হবে এবং আইনটি দেশের জন্য কল্যাণকর হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পাসপোর্ট ও ভ্রমণবিষয়ক আইন যুগোপযোগীর খড়সা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বেশ কয়েকটি পর্যালোচনা সভা করেছি। আশা করছি, শিগগিরই আইনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে বিধি মোতাবেক জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আইনটির খসড়া প্রস্তুতের আগে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩, বাংলাদেশ পাসপোর্ট নীতিমালা ১৯৭৪, ভিসা নীতিমালাসহ বিভিন্ন আইন ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করেছেন তারা। বিগত আইন ও বিধির দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেটি আরও কার্যকর এবং খসড়া আইনে আধুনিক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশি নাগরিক ও অন্যান্য ব্যক্তির বহির্গমন নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে পাসপোর্ট ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করা হয়। ফলে এর সহায়ক অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে নতুন বিধান প্রণয়ন এবং প্রচলিত আইনগুলো সুসংহত ও যুগোপযোগী করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এরই আলোকে পুলিশ সদর দপ্তর বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইন, ২০১৯ এর খসড়া তৈরি করে। প্রস্তাবিত আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেকোনো স্থানে তল্লাশি চালিয়ে যে কারও পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট জব্দ করতে পারবেন; যদি ওই ব্যক্তি এ আইনের অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ করেছেন বলে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ হয়। বহির্গমন-সংক্রান্ত অন্যান্য প্রচলিত আইন ও বিধান লঙ্ঘন করে কেউ দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের উপপরিদর্শকের (এসআই) নিচে নয় এমন কর্মকর্তা তাকে নৌ, জাহাজ, বিমান কিংবা অন্য যেকোনো যানবাহন থেকে নামিয়ে এনে তার পাসপোর্ট জব্দ করার অধিকার রাখবেন।

বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ইস্যুর বিষয়ে খসড়া আইনে হয়েছে, এ আইনে যাই থাকুক না কেন, সরকার জনস্বার্থে সমীচীন মনে করলে কিংবা অন্য কোনো প্রচলিত আইনের বিধান বাস্তবায়নের প্রয়োজন হলে, কোনো বিদেশি নাগরিক বা রাষ্ট্রবিহীন ব্যক্তিকে এ আইনের অধীনে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্টস দিতে পারবে।

বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সম্পর্কে বলা হয়েছে, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর নামে একটি অধিদপ্তর থাকবে, অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক হবেন এবং সরকার যেভাবে নির্ধারণ করবে, সেভাবে অন্যান্য কর্মকর্তা সমন্বয় এবং তারা আইনে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করবেন।

খসড়া আইনে ক্ষমতা অর্পণ ও অব্যাহতি বিষয়ে বলা হয়েছে, এ আইনের অধীনে প্রণীত বিধি মোতাবেক কোনো ক্ষমতা বা কার্য উক্ত বিধিতে নির্দিষ্ট করা, প্রয়োগ পদ্ধতি ও পালনের জন্য যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস নেই, সেসব দেশে সরকার নিযুক্ত কোনো বিদেশি অনারারি কনস্যুলার বা প্রতিনিধিকে অর্পণ করতে পারবে; সরকার এ আইনের অধীনে ইস্যু করা পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্টস কোনো দেশ ভ্রমণ করার জন্য বা তার অভ্যন্তর দিয়ে অন্য কোনো দেশে গমন করার জন্য বৈধ থাকবে মর্মে গেটেজের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন বা নোটিস জারি করতে পারবে যদি ওই বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বা বহিঃআক্রমণে লিপ্ত না হয় অথবা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বা বহিঃআক্রমণ করছে এমন কোনো দেশকে সহায়তা না করে থাকে বা সশস্ত্র সংঘাত বা গৃহযুদ্ধের সম্মুখীন না হয় কিংবা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংগঠনকে সহায়তা না করে থাকে।

পাসপোর্ট ডকুমেন্ট দিতে অস্বীকৃতির বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে, যদি ওই ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হন, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার যুক্তিযুক্ত প্রমাণ থাকে, আবেদনকারী যদি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭২ অথবা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে দণ্ডপ্রাপ্ত হন, তার বিরুদ্ধে করা কোনো ফৌজদারি মামলায় হাজিরা এড়াতে বা তার কোনো অপরাধের বিচার বা দণ্ড এড়াতে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে চান, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে যদি কোনো আদালত দেশ ত্যাগ না করার অথবা আবেদনকারী শিশু হলে তাকে দেশের বাইরে না যাওয়ার আদেশ দিয়ে থাকে, আবেদনকারী যদি মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার), মানব পাচার, মুদ্রা পাচার, মাদকদ্রব্য বা অস্ত্র পাচার, উগ্রপন্থি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে, নিষিদ্ধ সংগঠন অথবা অন্য কোনো আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন বলে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ থাকে, আবেদনকারী যদি মানসিক ও শারীরিকভাবে অক্ষম হন কিংবা যদি আইনগত অভিভাবক বা অনুমোদিত ব্যক্তি বা সহযোগী না হন, আবেদনকারী তথ্য গোপন বা অসত্য তথ্য দিয়ে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্টের জন্য আবেদন করেন, তবে তাকে পাসপোর্ট ডকুমেন্ট দেওয়া যাবে না।

এছাড়া আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু না করার বিধান রাখা হয়েছে, এগুলো হলো আবেদনকারী বাংলাদেশের নাগরিক না হলে, পাসপোর্ট কর্র্তৃপক্ষ বা সরকারের কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, আবেদনকারী বিদেশ গিয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে কিংবা তার এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বা বাংলাদেশ থেকে তার বহির্গমন অন্য কোনোভাবে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রে আবেদনকারী কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংগঠন কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাকেও পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে না বলে খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত