মহামারী করোনার কারণে রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এবার রেকর্ড পরিমাণ অর্থ ছেঁটে প্রস্তাবিত ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সংশোধিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে আকার কমছে ২৯ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। শতকরা হারে যা প্রায় ৫ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ৬৬ দিন দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সাধারণ ছুটি শেষ হলেও উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে করোনার মারাত্মক প্রভাব ছিল। এজন্য রাজস্ব আদায়েও চরম ব্যাঘাত ঘটে। তাই সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩১ কোটি টাকা। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রা কমছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এটি কমিয়ে করা হচ্ছে ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা আসবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে চলতি বাজেট সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয়। বিস্তারিত পর্যালোচনার পর ওই বৈঠকে এটি চূড়ান্ত করা হয়।
যদিও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেট করোনার অভিঘাত মোকাবিলার বাজেট। আগের বছরের করোনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তা থেকে উত্তরণে পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি এ অর্থবছরে ছিল না। অর্থনীতিতে করোনার মারাত্মক প্রভাব পড়বে এটা জেনেই এ বিশাল বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাঙ্গা করতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে অতিদরিদ্রদের সরাসরি নগদ সহায়তা, খাদ্য সহায়তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ। কিন্তু নানা কারণে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এজন্য বছরের মাঝপথে এসে বড় আকারের কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার আড়াই হাজার টাকা করে দিয়েছিল দরিদ্রদের। কিন্তু অর্থ ছাড় করার পরও ১০১ কোটি টাকা ফেরত এসেছে। ওএমএস কার্ডে ৭০ লাখ ছিল ভুয়া। এভাবে অনেক ভালো উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। এর পেছনে সরকারের দক্ষতার অভাব, পরিকল্পনার দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সামগ্রিকভাবে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেন তিনি।
সংশোধিত বাজেট প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে। এর মূল কারণ কভিড-১৯। ফলে সংশোধিত বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। তবে সরকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্বাভাবিক রাখতে ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রাখতে বদ্ধপরিকর। অর্থ সংকটে কোনো কাজ বন্ধ হবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বাজেটে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে করা হচ্ছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে আয় ও ব্যয়ের এ বিশাল ফারাকে দেশের ইতিহাসে প্রথম মোট বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগের বছরগুলোতে সাধারণত জিডিপির ৫ শতাংশ হারে ঘাটতি ধরে বাজেট প্রণয়ন করা হতো। সংশোধনীর ফলে মোট বাজেট ঘাটতি জিডিপির হার সামান্য কমে আসছে।
এর আগে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও (এডিপি) চূড়ান্ত করা হয়। উন্নয়ন বাজেটের বৈদেশিক অংশে ৭ হাজার ৫০১ কোটি টাকা কমানো হয়। ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ কমিয়ে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়ন করা হবে ৬৩ হাজার কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিশ্রুতি বেশি থাকলে বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যয়ের সক্ষমতা কম থাকায় সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে।
