আমি তখন চট্টগ্রাম সেক্টরস হেড কোয়ার্টার্সের তৎকালীন অ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন। আমাদের চোখে স্বপ্ন। দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন। আবার এ স্বপ্ন ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। বলা যায় আমি তখন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাশাপাশি ভাবছি অন্য সৈন্যরা যোগ দেবে? ঢাকার দিকে নজর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী বলেন। তিনি কি ঢাকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন? নিজের কথাও ভাবি। আমি কি কোনোদিন মুক্ত মানুষ হয়ে ফিরে আসতে পারব? বাঙালি জাতি কি স্বাধীন হতে পারবে? আবার মনোবল চাঙ্গা হয়। নিশ্চয়ই পারব। আমরা সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করব। এ জাতিকে স্বাধীন দেখার সৌভাগ্য কি আমার হবেএই রকম নানা প্রশ্নের মধ্যেই প্রস্তুতি নিতে থাকি।
২৫ মার্চ রাতে পদক্ষেপ গ্রহণের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিইএই পদক্ষেপ হয় স্বাধীনতা এনে দেবে নতুবা দাঁড় করাবে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। আওয়ামী লীগ নেতা ডা. জাফরকে জানাই, জনগণের মুক্তির জন্য ইপিআর সৈন্যদের নিয়ে আমি পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। ষোলশহর এবং ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈন্যদের বলুন, তারা যেন আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেয়। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সারসন রোডের বাসভবন ছেড়ে রেলওয়ে পাহাড়ে যুদ্ধের হেড কোয়ার্টারে আসি।
সেই সময়টা ছিল ভয়াবহ। গোলাগুলির আওয়াজ হলেই পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে এই আশঙ্কায় পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্ক্রিয় করার কাজটি করতে হয়েছে অত্যন্ত কৌশলে ও নিঃশব্দে। অন্যদিকে পাকিস্তানি কর্র্তৃপক্ষ টের পেলে সঙ্গে সঙ্গেই চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বা নেভাল বেইজ থেকে আমাদের ওপর আক্রমণ চালানো হতো। আর আমাদের অবস্থান সুসংহত হওয়ার আগেই আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম। রাত সাড়ে ১১টার মধ্যেই রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্র-জনতার সম্মিলিত সহায়তায় চট্টগ্রাম শহর দখলে আসে।
এর আগে একাত্তরের ২৪ মার্চের রাত ৯টা। চট্টগ্রামের হালিশহরে ইপিআর হেড কোয়ার্টারে পরপর দুটি মেসেজ পাঠাই ‘আমার জন্য কিছু কাঠের ব্যবস্থা কর’ এবং দ্বিতীয়টি ছিল ‘আমার জন্য কিছু কাঠ নিয়ে আস’। ইপিআর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে উত্তরে শুভপুর এবং দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত সব ইপিআর পোস্টেই সংকেতটি পাঠিয়ে দিই। মেসেজ পাঠানোর একটু পরেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী এবং মেজর জিয়াউর রহমান আমার কাছে আসেন। এই মুহূর্তে এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেন। তাদের পরামর্শে দ্বিতীয় মেসেজটি সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। যদিও এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরীকে বন্দি করে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং অবাঙালি অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়ার নির্দেশে মেজর জিয়া যাচ্ছিলেন সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে।
দ্বিতীয় সাংকেতিক বার্তায় (আমার জন্য কিছু কাঠ নিয়ে আস) সৈন্যদের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল, শত্রুপক্ষের সব সৈন্যকে বন্দি এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করে তারা যেন শহরে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে যুদ্ধাবস্থান নেয়। দ্বিতীয় মেসেজটি পাওয়ার পর কিছু কিছু সীমান্ত ফাঁড়িতে বাঙালি সৈন্যরা পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরস্ত্র করে ফেলেছিল। এসব কারণে ২৪ মার্চ রাত থেকেই আমি উদ্বিগ্ন ও অস্থির ছিলাম। কারণ মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা যদি আরও বেশিদিন চলতে থাকে তাহলে বিদ্রোহের বিষয়টি গোপন থাকবে না এবং ফায়ারিং স্কোয়াড থেকে আমাদের বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না। শুধু তাই নয়, আমাদের এই পদক্ষেপের কথা জানাজানি হয়ে গেলে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের জন্য বিপদ ডেকে আনবে এবং ভবিষ্যতে বাঙালিদের সুযোগের বিষয়টিও হাতছাড়া হয়ে যাবে।
এর পরদিনই এলো বাঙালির বিভীষিকাময় রাত ২৫ মার্চ। ওই রাতে ১০টা ৪৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা চট্টগ্রাম ও হালিশহরের ইপিআরের প্রায় ৫শ অবাঙালি কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলি। আমার নির্দেশে রাতেই রামগড়ের বাঙালি সৈন্যরা শুভপুর ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়। পরদিন ২৬ মার্চ কুমিরায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালি সৈন্যদের সফল অ্যামবুশ ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ওই অ্যামবুশে ৭০ জন পাকিস্তানি নিহত হয়।
দীর্ঘ ৯ মাসের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কোনো সামরিক অভিযান ছিল না। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় সম্ভব নয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের লাখো কোটি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন, অবিস্মরণীয় ত্যাগ তিতিক্ষার বিষয়টি বুঝতে হবে।
আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করা। এদেশের জনগণ রক্ত দিয়ে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করেছে। আমরা স্বাধীন হয়েছি। দ্বিতীয়ত, আমরা সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যুদ্ধ করেছি। এখানেও আমরা অনেকটা সফল। একাত্তরে এদেশের ৫৫ শতাংশ মানুষ ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। আজকে আমরা তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে।
একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে। তারা সুযোগ পেলেই ছোবল মারে। রাজনৈতিকভাবে আমাদের যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধীরা একাত্তরের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যেন পরাজিত শক্তি আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করতে না পারে এবং ধর্মকে পুঁজি করে কেউ রাজনীতি না করতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। কিন্তু তাদের শাখা প্রশাখা এখনো সোচ্চার।
বিশ্বায়নের এই যুগে শুধু একাত্তরের স্বপ্ন দিয়ে সব উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমরা একক বিশ্বের অধিকারী। একাত্তরের চেতনাকে ধারণ করে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে আজকের প্রজন্মের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের কাজ করতে হবে।
পরিচিতি : ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ বিদ্রোহ শুরু করেন মেজর রফিকুল ইসলাম। তখনই বুঝে গিয়েছিলেন দেশকে বাঁচাতে চাইলে যুদ্ধের বিকল্প নেই। তাই আগেভাগেই চট্টগ্রামের সীমান্ত এলাকার দখল নিতে শুরু করে তার সেনারা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেক্টর ১-এর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম। চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গড়া এই সেক্টরে সাহসিকতার সঙ্গে লড়েছেন এই সেনা। পেয়েছেন ‘বীরউত্তম’ খেতাব।
