অস্ট্রেলিয়ান তরুণ আলেসান্দ্রো আলবের্তির ছেলেবেলা পুরোটাই কেটেছিল বিষণœতায়। বাবার আত্মহত্যা তাকে আরও বিমর্ষ করে তোলে। আলেসান্দ্রো ও তার বন্ধুরা অবসাদগ্রস্তদের সহায়তায় গড়ে তোলেন ‘ব্ল্যাক ডগ অন আ লিড’। আলেসান্দ্রোর ছেলেবেলা ও তার প্রতিষ্ঠান নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
ব্ল্যাক ডগ অন আ লিড
২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে একদল বন্ধু ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়। ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে বন্ধুরা তখন ছেলেবেলার স্মৃতিচারণে ব্যস্ত। দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল সদস্য আলেসান্দ্রো আলবের্তি। হাসি-গান-আড্ডায় বন্ধুদের মাতিয়ে রাখতে তার জুড়ি নেই। এত হাসিখুশি ছেলেটার মনের কোণে কোথাও যে চাপা বিষাদ লুকানো থাকতে পারে তা নিয়ে ভাবেনি বন্ধুদের কেউ। কারণ আলেসান্দ্রো যে কখনো তাদের সেই সুযোগটাই দেয়নি। গল্পের ফাঁকে বন্ধুরা জানল আলেসান্দ্রোর জীবনের অন্ধকার এক সময়ের কথা। বিষণœতায় আক্রান্ত হয়ে কীভাবে তার বাবা আত্মহত্যা করেন, নিজে বিষণœ থাকায় পুরো হাইস্কুল জীবন কতটা মন খারাপ নিয়ে কাটাতে হয়েছে। এত কাছের বন্ধুর জীবনের দুঃখের এই মুহূর্ত ভাবিয়ে তুলল বন্ধুদের। বন্ধুর জন্য তো বটেই, বিষণœতায় আক্রান্ত আরও মানুষের জন্য কিছু করার আগ্রহ জন্ম নিল। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হলো ‘ব্ল্যাক ডগ অন আ লিড’।
আলেসান্দ্রোর জীবন কাহিনী থেকে উদ্বুদ্ধ হলেও প্রতিষ্ঠানটি গড়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল মাসিমো লিউস্তিনির। ‘ব্ল্যাক ডগ অন আ লিড’ মূলত মানসিক অসুস্থতা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা ও আলোচনার জন্য সচেতনতামূলক একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সবাই অস্ট্রেলিয়ান তরুণ। মাসিমো ও আলেসান্দ্রো ছাড়াও এই দলে আরও আছে জ্যাজমিন গ্রেসি, মারিয়া মারিয়ানো, মার্কাস লিউস্তিনি, স্টেফানো লিউস্তিনি, জন আলবের্তি, ডিনো মারিয়ানো, টেইলর দোনাতি, রব আজ্জোলিনি, নিইম ম্যাঙ্গান, এলিয়ট লিউস্তিনি। অস্ট্রেলিয়াতে মানসিক সমস্যা নিয়ে প্রচলিত ট্যাবু দূর করার চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। ব্ল্যাক ডগ বলতে বোঝানো হয়েছে বিষণœতার অন্ধকার ছায়াকে। অন্ধকার ছায়াকেও যে পরিচর্যার মাধ্যমে সুশৃঙ্খলিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব সেই বার্তাই দিতে চায় ব্ল্যাক ডগ।
বিষণœতা কোনো ব্যক্তির একার যুদ্ধ নয় বলে মানে মাসিমোর দল। সম্মিলিত সহমর্মিতার জন্য ব্ল্যাক ডগ বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করে তাদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছে। এক একটি ক্যাম্পেইনে মানসিক অসুস্থতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে তারা। এর মাধ্যমে বিষণœতা, উদ্বেগ ও মানসিক অসুস্থতার নানা বিষয় নিয়ে সচেতনতা ছড়ানো সম্ভব হচ্ছে বেশি মানুষের মধ্যে। ব্ল্যাক ডগের উল্লেখযোগ্য একটি ক্যাম্পেইন ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিব্রা লেকের কাছে। সেখানে জড়ো হয়েছিল প্রায় দুই হাজার মানুষ। এই ক্যাম্পেইন থেকে ব্ল্যাক ডগ পঞ্চাশ হাজার ডলারের একটি ফান্ড তৈরি করে। ধীরে ধীরে তাদের কাজের পরিধি আরও বাড়ছে। মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে ব্ল্যাক ডগ।
আলেসান্দ্রোর ছোটবেলা
আলেসান্দ্রোর ছোটবেলা অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক ছিল না। স্কুলে যখন অন্য শিশুরা মন খুলে খেলাধুলা করত সে সময় সে নিজেও তাদের সঙ্গে খেলত, কিন্তু তার মনে থাকত উদ্বেগ। সহজে নিজের মনের কথা কাউকে শেয়ার করার সাহসও হতো না তার। কোনো কারণ ছাড়াই হুটহাট ঘাবড়ে যেত। তাকে যারা চেনে তারা এক কথায় বলবে ছোট থেকেই সে বেশ আত্মবিশ্বাসী। আসলে আত্মবিশ্বাসী ছদ্মবেশের আড়ালে সে লুকিয়ে রাখত তার ভালো না লাগা মুহূর্তগুলোকে। সেই মুহূর্তগুলো রোজ আসত এমন নয়, কিছুদিন পরপর ঘুরে-ফিরে আসত।
আলেসান্দ্রো জানায়, ‘হাইস্কুলের শেষ দুই বছরকে আমি ভীষণ মিস করি। এই বছরগুলোতে আমি নিজের প্রিয় কাজগুলো থেকে দূরে সরে যাই, কোনো কাজ করতে যাওয়ার সময় ভুল করার ভয় পাই, বন্ধুদের আড্ডায় বোকার মতো কথা বলে ফেলার ভয়ে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যেতে থাকি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমি বেশ ভালো গিটারিস্ট ছিলাম। ক্লাস এইটে উঠে গিটার বাজানো ছেড়ে দিলাম। আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসতাম। ফুটবল খেলতে গেলে আঘাত লাগাটাই স্বাভাবিক। নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলাম বলে তখন না খেলার কেবল অজুহাত খুঁজতাম। বন্ধুরা ফুটবল খেলার কথা তুলতেই আমি আমার আঘাতের কথা বলে এড়িয়ে যেতাম। আঘাতের আড়ালে আসলে আমার উদ্বিগ্নতা আর হতাশার কথা লুকিয়ে ফেলতাম। সবকিছু থেকে দূরে সরে যাওয়ায় একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। আমার চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী ও কর্মঠ মানুষদের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করলেও এই খারাপ সময়ে তাদের ব্যক্তিত্ব দেখে আমি কেমন যেন হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেছিলাম।’
কথায় বলে, সব দিন সমান যায় না। আলেসান্দ্রোও চেষ্টা করেছে খারাপ সময়কে কাটিয়ে বের হয়ে আসতে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য তার মানসিক জোরটাই ছিল শক্তি। নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবে আলেসান্দ্রো। সে বুঝতে পারছিল এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে হবে। ‘হাইস্কুলে ওঠার কয়েক বছর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির ভারে আমি একরকম চাপা পড়ে যাচ্ছিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম নতুন করে শুরু করব সবকিছু। পারফরমেন্স নিয়ে উদ্বিগ্নতা কাটাতে সাঁতার ও অ্যাথলেট কার্নিভালে যোগ দিলাম। এরই মধ্যে দ্বাদশ শ্রেণির পাট চুকিয়ে টার্শিয়ারি এন্ট্রান্স পরীক্ষাও (আমাদের দেশের এইচএসসি সমমানের পরীক্ষা) শেষ হয়ে গেছে। খেয়াল করলাম আমি ভালো থাকা শুরু করেছি। স্কুল শেষ করে ফেলার বিষয়টা তখন আনন্দ দিত, আর কখনো স্কুলে যেতে হবে না এই ভাবনায় দিন আনন্দেই কাটছিল। তখন আমার বয়স প্রায় আঠারো। ভর্তি হলাম ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের একটি বিষয়ে। অপেক্ষা করছি ক্লাস শুরু হওয়ার। এরপরেই আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টি এলো।’
বাবার মৃত্যু
যে কোনো সন্তানের জন্যই বাবার আকস্মিক মৃত্যু কষ্টের। কোনো দুর্ঘটনায় অথবা শারীরিক সমস্যায় মৃত্যু হলে সেটি হয়তো কিছুদিন পর মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু একজন স্বাভাবিক মানুষ যখন আত্মহত্যা করেন তখন সেটি তরুণ বয়সের আলেসান্দ্রোকে কোনোরকম সান্ত¡নারই জোগান দিতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান শুরুর পর নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় আলেসান্দ্রো জানিয়েছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু করার জন্য আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ক্লাস শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের অভিভাবককে সঙ্গে নিয়ে কথা বলার তারিখ ছিল ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। ক্লাস শুরুর তখনো তিন সপ্তাহ বাকি। সন্ধ্যায় মা-বাবার সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমি। সেদিন আমি একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেছিলাম। বাবাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি তিনি সোফার ওপরে ঘুমিয়ে আছেন। ছুটির দিনে বাবা সাধারণত সোফাতেই ঘুমাতেন। তাছাড়া প্রায় এক বছর ধরে বাবা গুরুতরভাবে ইনসোমনিয়ায় ভুগছিলেন। তার ঘুম কম হতো, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম হতো না। বাবা ঘুম থেকে উঠলেন, আমার সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বললেন। বাবা উঠে গেলে আমি সোফার ওপরে বসে রইলাম। কী মনে হতেই তিনি আমার দিকে ঘুরে বললেন আমাকে নিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে যেতে চান। আমি যদি জানতাম বাবার সঙ্গে ওটুকুই আমার শেষ কথা হবে তাহলে হয়তো তার সঙ্গে আরও নমনীয় আচরণ করতাম, আরও কিছুটা সময় গল্প করতাম। আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তা খুনসুটিগুলো অন্যরকম হতো। টিভি দেখার সময় আমি তার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতাম। তার মন খারাপের সময় পাশে বসে থাকতাম। শেষ কথা বলছি কারণ কথা শেষে সেদিন দুপুরেই বাবা আত্মহত্যা করেন। আমি এখনো জানি না তিনি কেন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমরা জানতাম তার মানসিক অবস্থা ভালো নেই, কিন্তু এতটা খারাপ তা বুঝে উঠতে পারিনি। আমি জানতাম তার ঘুমের সমস্যা হচ্ছে কিন্তু বিস্তারিত কিছুই জানতাম না। বছরজুড়ে ঘুমের সমস্যা যে খারাপ মানসিক অবস্থার নির্দেশক তা আমার জানা ছিল না। আমার বাবা দারুণ মানুষ ছিলেন। আমি তাকে আজও ভীষণ ভালোবাসি। তাকে খুব মিস করি। প্রতিদিন তাকে আমার মনে পড়ে। চার বছর ধরে আমি আমার বাবার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারিনি। দিনের পর দিন আমি এই বিষয়টিকে নিজের কাছেই এড়িয়ে গিয়েছি। বাবার মৃত্যুজনিত শোক আমার ভেতরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে। আমি সেটাকে বাক্সবন্দি করে মনের কোটরে ফেলে রাখি। যাকে প্রতিদিন মিস করি কিন্তু সে জীবিত নেই এই বিষয়টা খুব কষ্টকর।’
পুনরায় অসুস্থতা
ইউরোপ ভ্রমণে বন্ধুদের সঙ্গে এ বিষয়গুলো নিয়ে যখন আলেসান্দ্রো কথা বলছিল তখন সে আবারও বিষণœতায় পড়ে যায়। মানসিক অসুস্থতা নিয়ে তার মনে নতুন নতুন চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে। ‘বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণ আমার সেই গুটিয়ে যাওয়া সময়কে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সেই জমে থাকা সময়ের ঘা ধীরে ধীরে দশগুণ হয়েছে আমার অগোচরে। বন্ধুদের সেগুলো জানানোর কারণ হচ্ছে আমি আর জমানো ব্যথাগুলো নিজের ভেতর রাখতে পারছিলাম না। আমি খুবই ভাগ্যবান যে বন্ধুরা আমার প্রতি সহমর্মী হয়েছিল। ছুটির দিনগুলোতে আমি যেন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারি সে ব্যাপারে তারা নিয়মিত খেয়াল রাখত। আমি কেমন আছি জানতে চাইত। কিন্তু ভ্রমণ শেষে বাসায় ফিরে আবারও সেই পুরনো রুটিনে ফিরে গেলাম আমি। মনের মধ্যে কথাগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। চিন্তাগুলো ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছিল। পুরনো ঘাবড়ে যাওয়া সমস্যাটা আবারও ফিরে এলো। কোনো কারণ ছাড়াই ঘটনাগুলো ঘটত। প্রচণ্ড বুক ধড়ফড় করত। মনে হতো প্রতি মুহূর্তে ১০০ মাইল হারে স্পন্দিত হচ্ছে হৃদয়। খুব প্রিয় ফুটবল দলের খেলা দেখার সময় মানুষের ভেতরে যেমন টানটান উত্তেজনা থাকে অথবা একবার সাইরেন বেজে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এড্রেনালিনের প্রবাহ যেভাবে মানুষকে উদ্দীপ্ত করে তোলে সেই অনুভূতি ছিল আমার প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। এই অনুভূতি টানা ছয় মাস বলবৎ ছিল। এই বীভৎস সময়ে আমি প্রতিটি মুহূর্তকে বিশ্লেষণ করতাম। আমি বুঝে উঠতে পারতাম না আমার কী হয়েছে। নিজের কাছে নিজে বন্দি হয়ে থাকতাম সেই সময়ে। মানুষ যখন নিজের কাছেই বন্দি হয়ে থাকে তখন তার পালানোর কোনো উপায় থাকে না।
সুস্থ হয়ে ওঠা
নিজের ভেতর অজস্র মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকা আলেসান্দ্রো সিদ্ধান্ত নেয় বেঁচে থাকার। নিজেকে নিজে সাহস জুগিয়ে প্রতিটি কঠিন মুহূর্ত পার করে সে। ‘বিশ্লেষণের ফলাফল আমাকে বলে দিল, আমাকে জানাল প্রতি মুহূর্তের অস্বস্তি থেকে বেঁচে থাকতে গিয়ে আমার এই বিষষণœতা দানা বেঁধেছে মনে। একই সঙ্গে এই ঘটনা বাস্তবতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে আমাকে। যারা এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন কেবল তারাই অনুভব করতে পারবেন বিষণœতা কত ধরনের উদ্বেগের জন্ম দেয়। মানুষ নিজে বুঝে ওঠার আগেই এই মানসিক সমস্যায় পড়ে নিজের কাছে অচেনা হয়ে যেতে থাকে। এইসব দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার লক্ষণ নিয়ে বেঁচে থাকা ভীষণ কঠিন কিন্তু এসব থেকে দূরে থাকতে আত্মহত্যাকে আমি বেছে নিইনি। নিজেকে শেষ করে দিয়ে সমস্যার প্রতিকার চাওয়ার ভেতরে আমি কিছু খুঁজে পাইনি। বরং এসব নিয়ে মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছি। যারা এসব সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন তাদের নিয়ে সমস্যার প্রতিকার খুঁজতে এগিয়ে যেতে চেয়েছি।
ডাক্তার আমাকে ওষুধ দিয়েছেন। টানা দশ সপ্তাহ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সপ্তাহে একবার করে বসতে হয়েছে। নিজের এই মানসিক অসুস্থতা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলাই আমার কাছে প্রধান কার্যকরী সমাধান বলে মনে হয়েছে। সঙ্গে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটাও খুব জরুরি। আমি আমার পরিবারের লোকজন ও বন্ধুদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। নিজের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আমার অনুভূতিগুলোকে আমি মেনে নিতে শিখেছি। আর শিখেছি কীভাবে উদ্বিগ্নতাকে ভয় না পেয়ে এর প্রতিকার খোঁজা যায়। যখন আমি আমার খারাপ থাকার অনুভূতিকে, প্রতিটি মুহূর্তকে বিশ্লেষণ করতাম আমার মনে হতো আমি আগুন নিয়ে খেলছি, আমার উদ্বেগ আমাকে আরও চিন্তিত করে তুলত। সেই বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে আমি সিদ্ধান্ত নিই আমি এই নিয়ে কথা বলব, কাজ করব। আমি নিজের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ করতে পারব না। বিষণœতা ও উদ্বেগকে একপাশে সরিয়ে আমি আমার হাসিখুশি আনন্দের জীবন যাপনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করব। আমার ভালো থাকার সঙ্গে ব্ল্যাক ডগের সম্পর্ক অনেক গভীর। আমার একজনের জন্য যখন অসংখ্য মানুষ বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাচ্ছে সেটাও আমার জন্য আনন্দের।
খারাপ থাকার চক্র থেকে বের হয়ে এসে আমি আর খারাপ থাকার অনুভূতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে যাই না। আমি জানি ভালো থাকার মতো খারাপ থাকাও জীবনে আসবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পরে আবার তা চলেও যাবে। চিকিৎসা নেওয়ার সময়ে আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে আমি জানতাম আমি কিছুক্ষণ পরেই শান্ত হয়ে যাব। এসব নিয়ে ভাবনার সময়কে কমিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে আমার অবস্থা ভালো হয়ে উঠছিল। সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিজের সঙ্গে এভাবে কাজ করার পরে আমি সুস্থ হয়ে উঠি। এখন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি আমি সত্যিই ভালো আছি। আমার উদ্বেগ আমি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছি।’
