দেশের উচ্চ করহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কথা হচ্ছে। উচ্চ করহারের কারণে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলেও জানিয়ে আসছেন উদ্যোক্তারা। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ইস্যুটি তুলে দেশের ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই) নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান করহার দেশের ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি করছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবনে আয়োজিত ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। প্রাক-বাজেট আলোচনায় এমসিসিআইয়ের সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবীর বলেন, করহার আমাদের ব্যবসাকে মারাতœকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত করছে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করহার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর ৩৫ শতাংশ থেকে আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে আলোচ্য হারে আনা হয়। এমসিসিআইয়ের সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলো দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দিয়ে থাকে। এমসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের আমদানিতে কর দিতে হয়, মধ্যবর্তী বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এবং উৎপাদিত পণ্যের ওপরও কর দিতে হয়। ফলে ক্ষেত্রবিশেষে করহার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ হয়ে যায়।
এর আগে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (ফিকি) পক্ষ থেকেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উচ্চ করহারের ইস্যুটি আলোচনায় আনা হয়। গতকাল এমসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভূমি নিবন্ধন ফি এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট করে দেওয়া রয়েছে। এটি প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম। ফলে এর মাধ্যমে বৈধ উপার্জনের একটি অংশ অবৈধ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে করহার কমিয়ে স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত পুরো অর্থকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমসিসিআই সভাপতি বলেন, এতে রাজস্ব আহরণে কোনো ঘাটতি হবে না। এছাড়া রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের প্রণোদনার ক্ষেত্রে রাশ টানার দাবি জানিয়ে বলা হয়, এ ব্যবস্থা থাকার কারণে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এমসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বিষয়ে মোট ১০৭টি প্রস্তুাব তুলে ধরা হয়। এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন এমসিসিআইয়ের ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন সাব-কমিটির চেয়ারম্যান আদিব এইচ খান। তিনি বলেন, সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৯ সাল থেকে যে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে, তার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ২০১২ সালের আইন নয়, বরং ১৯৯১ সালের আইনে ফিরে গেছে। নতুন আইনের মূল স্পিরিট ছিল মূল্য ঘোষণা থাকবে না। কিন্তু ইনপুট আউটপুট কো-ইফিশিয়েন্টের (উৎপাদন সহগ) মাধ্যমে আসলে পেছনের দরজা দিয়ে সেই মূল্য ঘোষণাতেই চলে যাওয়া হলো। এটি বাতিলের দাবি জানান তিনি। এছাড়া কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ব্যবস্থার অস্পষ্টতা দূর করা, আগাম করহার এক শতাংশ কমানো, রাজস্ব বিরোধে আইনি প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রিম করহার কমানো, সরবরাহ গ্রহীতার মিথ্যা ঘোষণার জন্য সরবরাহকারীকে শাস্তি প্রদানের বিধান বাতিল করাসহ বেশ কিছু প্রস্তাব করা হয়।
অন্যদিকে কোম্পানির পণ্য প্রচারের ক্ষেত্রে অনুমোদনযোগ্য ব্যয় বার্ষিক বিক্রির শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে এমসিসিআই। সভা শেষে এমসিসিআইয়ের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, পৃথিবীর আর কোথাও এ ধরনের ব্যয়ে সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। এর ফলে ব্যবসা নিরুৎসাহিত হবে। অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, এ ধরনের ব্যয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেঁধে দেওয়া মোটেই কম নয়। তিনি বলেন, আপনারা একটা কিনলে পাঁচটা ফ্রি’র নামে পচা জিনিস ধরিয়ে দেবেন, সেটা তো আমরা অনুমোদন দেব না। ভোক্তার অধিকার দেখতে হবে।
