ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে টাকা আত্মসাৎ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) কর্মচারী শেরেজামান সম্রাটকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তার প্রতারণা চক্রের সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও চাকরিচ্যুত করেছে বেরোবি প্রশাসন। তারা হলেন- কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান পলাশ ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী গুলশান আহমেদ শাওন। গত রবিবার অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭তম সিন্ডিকেট সভায় তাদের চাকরিচ্যুতির এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে গত ৩ মার্চ ‘চাকরি প্রতারক শেরেজামান’ শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তাতে শেরেজামান সম্রাট ও তার চক্রের সদস্যদের প্রতারণার বিস্তর তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হলে বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে তোলপাড় হয়। এরপরই শেরেজামানসহ তার দুই সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত এলো।
বরখাস্ত তিনজনের মধ্যে শেরেজামান সম্রাট বেরোবির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের কম্পিউটার অপারেটর। আর অন্য দুজনের মধ্যে মনিরুজ্জামান পলাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সেকশন অফিসার এবং গুলশান আহমেদ শাওন অস্থায়ী ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী (মাস্টাররোল)।
তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্তের বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন বেরোবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমার প্রশাসন সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। আর এরই অংশ হিসেবে ওই তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’ একইসঙ্গে তিনি শেরেজামান সম্রাটের প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদ প্রকাশ করায় দেশ রূপান্তর এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটির প্রতিবেদককে ধন্যবাদ জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. আর এম হাফিজুর রহমান সেলিম জানান, অভিযোগকারীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে মনিরুজ্জামান পলাশ ও শেরেজামান সম্রাটকে সাময়িক এবং চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী গুলশান আহমেদ শাওনকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে। সাময়িক বহিষ্কৃত দুজনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হবে। তাদের জবাব পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট তাবিউর রহমান প্রধান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী গুলশান আহমেদ শাওনকে স্থায়ী বহিষ্কার এবং অন্য দুজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কখনো ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে টাকা আত্মসাৎ, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন শেরেজামান সম্রাট। তবে চাকরিপ্রার্থীদের কপালে সেই চাকরি আর জুটত না। ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের এলাকাজুড়ে প্রতারণার জাল বিস্তার করা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বরখাস্ত কর্মচারী ‘চাকরি সম্রাট’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। আর শেরেজামান সম্রাটের প্রতারণার কাজে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন মনিরুজ্জামান পলাশ ও গুলশান আহমেদ শাওন। তাদের প্রতারণার প্রমাণ সংক্রান্ত বিভিন্ন অডিও ও ভিডিও রেকর্ড এবং মোবাইল ফোনে পাঠানো খুদে বার্তা দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে।
শেরেজামান সম্রাটসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন কৌশলে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরাসরি বা ফোনে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলতেন। তারা কখনো নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আবার কখনো-বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের আস্থা অর্জন করে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। একপর্যায়ে চাকরিপ্রার্থীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে টাকা ফেরত চাইলে নিজেরাই মীমাংসার নামে কথিত সালিশ বসাতেন।
