কোম্পানীগঞ্জে যুবলীগকর্মী খুন, গুলিবিদ্ধ আরও ১৩

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২১, ০২:২৭ এএম

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটে ফের সংঘর্ষে জড়িয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিবদমান দুটি পক্ষ। এতে এক যুবলীগ কর্মী নিহত এবং ১৩ জন গুলিবিদ্ধসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে অর্ধশত নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এছাড়াও সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে কোম্পনীগঞ্জ থানার ওসিসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ও রাতে দুই দফায় বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের স্থগিত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর কোম্পানিগঞ্জে যুবলীগকর্মী খুন, গুলিবিদ্ধ আরও ১৩ রহমান বাদল সমর্থকদের মধ্যে ওই সংঘর্ষ হয়। এ সময় মুহুর্মুহু গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

এদিকে সংঘর্ষের পর বসুরহাট পৌর এলাকাসহ কোম্পানীগঞ্জ জুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আজ বুধবার সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুরো বসুরহাট পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন।

কাদের মির্জা ও বাদল সমর্থকদের সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির নিহত হওয়ার তিন সপ্তাহ পার না হতেই গতকাল ওই দুই পক্ষের সংঘর্ষে নতুন করে আরেকজন প্রাণ হারালেন। আর গতকালের সংঘর্ষের সূত্রপাতের জন্য আগেরবারের মতোই উভয়পক্ষ একে অপরকে দায়ী করেছে।

গতকালের সংঘর্ষে নিহত আলাউদ্দিন (৩২) যুবলীগ কর্মী বলে জানা গেছে। তিনি চর ফকিরা ইউনিয়নের চর কালী গ্রামের মমিনুল হকের ছেলে। আলাউদ্দিনকে নিজের অনুসারী বলে দাবি করেছেন মিজানুর রহমান বাদল।

সংঘর্ষে গুরুত্বর আহতদের মধ্যে কাদের মির্জার অনুসারী পৌরসভা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গুলিবিদ্ধ জাকির হোসেন হৃদয়কে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

গুলিবিদ্ধ বাকি ১২ জনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত অন্যদের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাদের মির্জা ও বাদল অনুসারীদের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রথম দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে রাত ১০টার দিকে ফের দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে বসুরহাট পৌরসভার রূপালী চত্বর এলাকায়। এরপর ওই সংঘর্ষের জেরে রাতে আবার সংঘর্ষে জড়ায় উভয়পক্ষ। রাতের সংঘর্ষে আহতদের নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুবলীগ কর্মী আলাউদ্দিন মারা যান।

নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে আসা আহতদের মধ্যে ১৩ জন গুলিবিদ্ধ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজনকে (ছাত্রলীগ নেতা হৃদয়) উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত সোমবার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানকে আবদুল কাদের মির্জা ও তার লোকজনের মারধরের প্রতিবাদে গতকাল বিকেল ৪টা থেকে বসুরহাটের রূপালী চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু করে উপজেলা আওয়ামী লীগ। সমাবেশ চলাকালে সন্ধ্যা ৬টার দিকে হঠাৎ করে আবদুল কাদের মির্জার সমর্থকরা পৌরসভা ভবন থেকে বের হয়ে ওই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের ধাওয়া দেয়। এ সময় মাকসুদা গার্লস হাইস্কুল এলাকায় উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এরপর দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে। উভয়পক্ষের লোকজনই ককটেল ফাটিয়ে দোকানপাট ও অটোরিকশা ভাঙচুর করে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বসুরহাট পৌর এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশ দু’পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। প্রথম দফার এই সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। একই সঙ্গে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক রনিসহ চার পুলিশ সদস্য আহত হন।

গতকালের সংঘর্ষের সূত্রপাতের জন্য বরাবরের মতোই উভয়পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে। কাদের মির্জা সমর্থকরা বলছেন, বাদল সমর্থকরা প্রথমে তাদের ওপর হামলা চালায়। আর বাদল সমর্থকদের দাবি, মির্জার অনুসারীরাই তাদের ওপর বিনা উসকানিতে আগ বাড়িয়ে হামলা চালালে তারা তা প্রতিরোধ করেন। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে প্রথম দফা ও দ্বিতীয় দফা সংঘর্ষের পর আবদুল কাদের মির্জার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। তবে তিনি কোম্পানীগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘গতকাল (গত সোমবার) যারা মুজিব শতবর্ষ উদযাপনের মঞ্চ ভাঙচুর করেছে জনগণ আজকে (গতকাল মঙ্গলবার) তাদের প্রতিহত করেছে।’

অন্যদিকে মিজানুর রহমান বাদল গতকাল রাতের সংঘর্ষে নিহত আলাউদ্দিনকে নিজের সমর্থক দাবি করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলাউদিন যুবলীগকর্মী। আমার বাড়ির পাশেই তার বাড়ি।’ একই সঙ্গে আলাউদ্দিন হত্যার ঘটনায় কাদের মির্জাকে দায়ী করেন তিনি।

কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষ-পরবর্তী পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন গতকাল রাত সোয়া ১২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোম্পানীগঞ্জের পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’

অন্যদিকে বসুরহাট পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল রাত পৌনে ১টায় কোম্পানীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউল হক মীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আগামীকাল (আজ বুধবার) সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুরো বসুরহাট পৌরসভা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি থাকবে।’

খিজির হায়াতের হামলার ঘটনা সাজানো দাবি কাদের মির্জার : সংঘর্ষের আগে গতকাল বেলা ১১টায় বসুরহাট পৌরসভা চত্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে কাদের মির্জা দাবি করেন, খিজির হায়াত খানকে তিনি লাঞ্ছিত করেননি। বরং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন গত সোমবার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত