সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি, টিকা আংশিক অকার্যকর হতে পারে

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২১, ০২:২৯ এএম

এ বছরের জানুয়ারি থেকেই যুক্তরাজ্যে পাওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্ট ‘এন৫০১ওয়াই’ বাংলাদেশে পাওয়া যাচ্ছে। এ পর্যন্ত ৮৯টি নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা। সব নমুনাই জানুয়ারি মাসের। সেখানে করোনার এ নতুন ধরন পেয়েছেন তারা। পরীক্ষায় গবেষকরা দেখেছেন, নতুন ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। এমনকি করোনার টিকা এ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণভাবে কাজ না-ও করতে পারে।

দেশে করোনার যুক্তরাজ্যের নতুন ধরনের তথ্য গত মঙ্গলবারই প্রথম সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে সেদিন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ প্রতিষ্ঠানের  এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের ধরন পাওয়া গেছে। সেটার সংখ্যা অনেক কম। জানুয়ারি থেকেই দু-চারটা করে পাওয়া যাচ্ছে। তবে আইইডিসিআর যুক্তরাজ্যের ধরন নিয়ে দেশে আসা করোনা রোগীদের চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং তাদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে, কোয়ারেন্টাইন করা হচ্ছে, তাদের সংস্পর্শে আসা লোকজনদেরও শনাক্ত করা হয়েছে।

গতকাল বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের এ ধরন পাওয়ার কথা জানান করোনা মোকাবিলায় গঠিত সরকারের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছয়জনের দেহে এ ধরন পাওয়া গেছে এবং তাদের মধ্যে বোধহয় একজন মারাও গেছেন।

তবে নতুন ভেরিয়েন্টে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। করোনাসংক্রান্ত বৈঠক থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের কোনো কর্মকর্তাই ফোন ধরেননি। তারা ‘জুম মিটিংয়ে’ লিখে খুদেবার্তা পাঠিয়েছেন।

অবশ্য গতকাল বুধবার আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বিবিসিকে নতুন ধরন পাওয়া যাওয়ার তথ্য জানান। তিনি বলেন, জানুয়ারির শুরুতেই যুক্তরাজ্যফেরত যাত্রীদের মধ্য থেকে প্রথম এ ধরন শনাক্ত হয়। প্রথম যে যাত্রীর শরীরে এ নতুন ধরন শনাক্ত হয়, তিনি যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে তার শরীর থেকে সংগ্রহকৃত নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে আইইডিসিআর করোনাভাইরাসের যুক্তরাজ্যের নতুন ধরন শনাক্ত করে। এরপর সিলেটে ওসমানী বিমানবন্দরে নামা যাত্রীদের মধ্য থেকেও ভাইরাসের নতুন ধরনবাহী ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মোট ছয়জন ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার আইইডিসিআরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যাদের শরীরে নতুন ধরন পাওয়া গেছে, সেগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা গেছে সেখান থেকে খুব বেশি সংক্রমণ হয়নি। যুক্তরাজ্যের করোনার নতুন ধরন নিয়ে বাংলাদেশেও কাজ হচ্ছে। ওই ধরন থেকে বাংলাদেশে খুব একটা ছড়াচ্ছে না। যুক্তরাজ্যের ধরনটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সংক্রমণ ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং একসঙ্গে অনেক ক্লাস্টার বা গুচ্ছভিত্তিক সংক্রমণ হয়। বাংলাদেশে সেরকম হচ্ছে না। একসঙ্গে বা এক বাড়িতে হলো, আশপাশে সবার হয়ে গেল, সেরকম হচ্ছে না।

এর আগে গত ডিসেম্বরেই করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্ট যাতে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য যত দ্রুত সম্ভব বেশকিছু ব্যবস্থা নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল কভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। কিন্তু তা সঠিকভাবে হয়নি বলে মনে করেন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যের নতুন ভেরিয়েন্ট নিয়ে বৈঠক করেছেন। সেখানে ধরনটি কীভাবে সার্ভিলেন্স করা হবে এবং যুক্তরাজ্যফেরতদের কীভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে, সে ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের নতুন ভেরিয়েন্ট শনাক্ত হওয়ায় সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই নতুন ভেরিয়েন্টের সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি। ছড়াতে পারবে খুব তাড়াতাড়ি, তবে শক্ত রোগ হবে না। অবশ্য একটা জিনিস হতে পারে, আমাদের যে ভ্যাকসিন সেটা আংশিক অকার্যকর হতে পারে। এটাই আমাদের সমস্যা।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের সতর্ক হওয়া উচিত। ছয়জনের দেহে পাওয়া গেছে। বোধহয় একজন মারাও গেছেন। অন্য দেশে এ ভেরিয়েন্ট অতটা মারাত্মক নয়। আমাদের দেশে কতটা মারাত্মক, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ করোনাভাইরাসটা আমাদের দেশে অন্য দেশের মতো আচরণ করছে না, অন্যরকম আচরণ করছে। অন্য দেশে যখন মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন আমাদের দেশে কমে গেছে। উল্টোপাল্টা কাজ হচ্ছে। যুক্তরাজ্য থেকে যেসব যাত্রী আসছে, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন করতে হবে এবং নেগেটিভ না হলে তাদের ছাড়া ঠিক হবে না।

এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাজ্যের করোনাভাইরাসের যে নতুন ধরন, সেটা করোনার নতুন ‘স্ট্রেইন’ না, ‘ভেরিয়েন্ট’। এটা একই ভাইরাস চেহারা ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করছে। এ ভাইরাস জানুয়ারি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। উদ্বিগ্ন তো বটেই। তবে ভাইরাসটা দেশে অতটা ছড়ায়নি। এখন যেটা ছড়াচ্ছে, সেটার জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে। গবেষণা শেষ হলে বোঝা যাবে নতুন ভেরিয়েন্টের কারণে ছড়াচ্ছে কি না। আগে যতগুলো ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে, সবগুলোর জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে যুক্তরাজ্যে যেভাবে ছড়িয়েছে, বাংলাদেশে এ ভেরিয়েন্ট সেভাবে ছড়ায়নি। জানুয়ারির প্রথম দিকে কিছু পাওয়া গেছে। পরে আর নতুন ভেরিয়েন্ট পাওয়া যায়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৩টি দেশে করোনার নতুন এ স্ট্রেইনের সংক্রমণ হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, যুক্তরাজ্যে পাওয়া করোনাভাইরাসের এ নতুন স্ট্রেইন আরও বেশি সংক্রামক। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন স্ট্রেইন বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন এ স্ট্রেইন আগের স্ট্রেইনের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রামক হতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে প্রথম শনাক্ত হওয়ার পর করোনার নতুন ধরনটি অত্যন্ত দ্রুত যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ সরকারের বিজ্ঞানীরা অন্য সব স্ট্রেইনের তুলনায় যুক্তরাজ্যের নতুন স্ট্রেইনটিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন। এতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের এই নতুন স্ট্রেইন হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য স্ট্রেইনের তুলনায় এই স্ট্রেইনটি ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি তাড়াতাড়ি সংক্রমিত করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত