রমজান সামনে রেখে উত্তপ্ত হচ্ছে পণ্যবাজার

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ০১:৫৯ এএম

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে আসছে রমজানে কীভাবে খরচ সামাল  দেবেন তা নিয়ে ছক কষছেন সাধারণ ক্রেতারা। অন্যদিকে রমজানকে সামনে রেখে আরও অস্থিতিশীল হতে শুরু করেছে পণ্যবাজার। ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ ছিল আমদানি শুল্ক কমিয়ে ভোজ্যতেলের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একদফা ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদেরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে আবারও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। ১০ দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা, ছোলার দাম যে যেমন পারছে তেমন রাখছে। চালের বাজারের অস্থিরতাও চলমান।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে দেশে পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ আছে। নৈরাজ্য ঠেকাতে সবগুলো পণ্যের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। ২০টি পর্যবেক্ষক টিম ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর নিয়মিত বাজার তদারকি করবে। কেউ নির্ধারিত দাম না মানলে নেওয়া হবে ব্যবস্থা। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি গত বছরের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ পণ্য নিয়ে বাজারে থাকবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে সরকারের কোনো হাত নেই। আগামী রবিবার ভোজ্যতেলের নতুন দামের ঘোষণা আসতে পারে। যেহেতু নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেশি, তাই নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে এবার টিসিবির মাধ্যমে অধিক পরিমাণে পণ্য বিক্রি করব। এবার প্রাক-রমজান ও রমজান দুই ভাগে আমরা টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করব। বাজার যাতে স্থিতিশীল থাকে সেই বিষয়ে আমারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব।’

ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আমদানি শুল্ক এক স্তরে এনে দাম কমানোর বিষয়টি কেন আমলে নেওয়া হলো না জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘শুল্ক বিষয়টি দেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তারা রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি, আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, অতি শিগগিরই আপনারা একটা সংবাদ পাবেন।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতি অর্থবছরে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২১ লাখ টন, যার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে রমজানে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ খোলা তেল বলে জানিয়েছেন ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সয়াবিন তেলের এক যুগের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওইদিন লিটারপ্রতি খোলা সয়াবিন তেলের মিলগেটে ১০৭ টাকা, পরিবেশক পর্যায়ে ১১০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ১১৫ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। বোতলজাত সয়াবিনের মিলগেট মূল্য ১২৩, পরিবেশক মূল্য ১২৭ এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন মিলগেট মূল্য ৫৯০ টাকা, পরিবেশক মূল্য ৬১০ এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য ৬৩০ টাকা। প্রতি লিটার পাম সুপার (খোলা) তেলের মিলগেট মূল্য ৯৫, পরিবেশক মূল্য ৯৮ এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য ১০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দাম যখন নির্ধারণ করা হয়েছিল তখন আন্তর্জাতিক বাজারে টনপ্রতি সয়াবিন তেলের গড় দাম ছিল ১১৫০ ডলার। বর্তমানে টনপ্রতি সয়াবিন তেলের গড় দাম ১২৭০ ডলার। তাই আমদানিকারকরা নতুন করে পণ্যটির দাম বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছে। গতকাল বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দাম বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চূড়ান্ত পর্যালোচনা করে আগামী রবিবার সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল ওয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি মানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও টি কে গ্রুপের গ্রুপ ডিরেক্টর মোহাম্মদ হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সব সময় চেষ্টা করি রমজানে ভোজ্যতেলসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এজন্য দামও কিছুটা কমিয়ে দেই। রমজানে ভোজ্যতেলের দাম কোন অবস্থায় থাকবে তা এখন আন্দাজ করা কঠিন। তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার যেদিকে যাচ্ছে তাতে মনে হয় রমজানে দাম আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের একটা আলোচনা চলছে। আগামী সপ্তাহে হয়তো একটা সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় আমাদের দিতে পারবে।’

দেশে বার্ষিক ১৮ লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন হয় ২ লাখ টনের মতো। বাকিটা আমদানিনির্ভর। রমজানে ৩ লাখ টনের বেশি চিনির প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম বাড়ায় ইতিমধ্যে স্থানীয় বাজারে পণ্যটির দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম স্থিতিশীল আছে।

দেশের অন্যতম বড় চিনি আমদানিকারক দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিনি মজুদ রয়েছে। আশা করছি রমজানে সরবরাহে ঘাটতি পড়বে না। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে যে দাম রয়েছে তাতে রমজানেও বাড়ার কথা নয়। তবে রমজানে আন্তর্জাতিক বাজারে যদি দামে বড় পরিবর্তন হয় তখন তো আর কিছু করার থাকবে না।’

রমজানের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য ছোলা-ডাল। বছরে প্রায় ৮০ হাজার টন ছোলার বিপরীতে রমজানেই প্রায় ৭০ হাজার টন ছোলা ব্যবহার হয়। এতদিন বাজারে পণ্যটি কেজিপ্রতি ৬৫-৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই পণ্যটির দাম নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, এক দোকানের সঙ্গে অন্য দোকানের দামের কোনো মিল নেই। কেউ কেজিপ্রতি দাম নিচ্ছেন ৬৫ টাকা, আবার কেউ নিচ্ছেন ১০০ টাকা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আমদানি ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার আমদানিকারকদের ঋণপত্র (এলসি) পরীক্ষা করে ছোলার সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেবে। এই দামের ভেতরেই সবাইকে বিক্রি করতে হবে। বাড়তি দামে বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর টিসিবির ছোলার দাম কিছুটা কম থাকবে। যেকেউ সেখান থেকেও কিনতে পারবে। এবার তো আমাদের ট্রাকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকবে। তাই চাপও কিছুটা কম থাকবে।’

১০ দিন আগেও বাজারে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৩০-৩৫ টাকা। গত দুই-তিন দিন ধরে হঠাৎ করেই অদৃশ্য কারণে পাইকারি থেকে খুচরা সর্বত্র পেঁয়াজের দাম বাড়ে। অথচ মার্চেই নতুন মৌসুমি পেঁয়াজের মূল মৌসুম শুরু। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কেজিপ্রতি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৮-৫০ টাকা দরে।

শ্যামবাজার বণিক সমিতির সহ-সভাপতি আবদুল মাজেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতেছে। তবে দামও কয়েক দিন ধরে বাড়তি। আজ (গতকাল) পাইকারিতে ৩৭-৩৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রমজানেও মনে হয় দাম এমনই থাকবে। তবে আবার এটা বাড়তেও পারে, এমনকি কমতেও পারে। বলা যাচ্ছে না।’

পেঁয়াজের দামের বিষয়ে সফিকুজ্জামান বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ার বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। ২০ মার্চ থেকে নতুন মৌসুমি পেঁয়াজ উঠতে শুরু করে। আমরা কিছুদিন অপেক্ষা করি। যদি দেখি দাম কমছে না তখন ভারত থেকে আমদানি করব। এর আগে করলে বাজারে দাম কমে যেতে পারে। তখন কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

ডিসেম্বর থেকে বাজারে চালের দামে অস্থিরতা চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানির সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে দেশে প্রায় সরকারি পর্যায়ে ১ লাখ ২১ হাজার টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৩ লাখ ১২ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। সরকারিভাবে এতদিন বলা হয়েছিল, আমদানি বাড়লে দাম কমবে। প্রথমদিকে চালের দাম কিছুটা কমলেও এখন আবার বেড়েছে। গতকাল বাজারে চিকন চালের কেজি ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৪৮-৫৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেশিরভাগ চিকন চাল মূলত বোরো মৌসুমে সংগ্রহ করা হয়। তাই নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চিকন চালের দামে প্রভাব পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সারা দেশেই তারা ডিলারদের মাধ্যমে খোলা বাজারে (ওএমএস) চাল বিক্রি করবেন। এ ছাড়া আমদানি বাড়ায় মোটা চালের দামও কিছুটা কমবে বলে মনে করেন তিনি।

জোর প্রস্তুতিতে টিসিবি : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে করোনার শুরু থেকেই মাঠে আছে সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। বর্তমানে সারা দেশে তিন শতাধিক ট্রাকে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল বিক্রি করে আসছে তারা। আগামী ১৭ মার্চ থেকে পাঁচ শতাধিক ট্রাকে দেশব্যাপী চলমান চারটি পণ্যের সঙ্গে ছোলা ও খেজুর যুক্ত করে প্রাক-রমজান বিপণন কার্যক্রমে নামবে সংস্থাটি।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী সপ্তহেই আমরা প্রাক-রমজান পণ্য নিয়ে বাজারে আসব। আমাদের লক্ষ্য হলো, নিম্ন আয়ের মানুষ যাতে সুলভে নিত্যপণ্য পায়। পেঁয়াজের দাম যতদিন বেশি আছে ততদিন পেঁয়াজ চলবে। এ ছাড়া আমরা সারা বছরই মাঠে থাকতে চাই। ইতিমধ্যে আমাদের ক্রয় প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। আশা করছি, টিসিবির মাধ্যমে এবার আগের বছরের তুলনায় অধিকসংখ্যক জনগণ উপকৃত হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত