ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর তখন একমাত্র ঠিকানা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২১, ০২:৪৮ এএম

একাত্তরের এই দিনে তখন জেগে উঠেছে বাঙালি। জাগরণের দুর্বার গতি গাইছে শেকল ছেঁড়ার গান। পূর্ব পাকিস্তান জ¦লছে বিক্ষোভের আগুনে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রূপ নিয়েছে মুক্তিপাগল মানুষের একমাত্র ঠিকানায়। মিছিল আসছে, মিছিল যাচ্ছে। সভা চলছে। স্লোগান, তর্কবিতর্কে উত্তুঙ্গ আন্দোলন। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে, কখনো নিচে নেমে কথা বলছেন, বক্তৃতা করছেন বঙ্গবন্ধু। দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। সকাল গড়িয়ে দুপুর, বিকেল থেকে রাত, নির্ঘুম বাড়িটি।

আজ ১২ মার্চ। একাত্তরের এদিন সকাল থেকে রাত অবধি ধানমণ্ডির বাসভবনে স্থানীয় ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু। বৈঠকের ফাঁকে দোতলার বারান্দায় এসে হাত নেড়ে সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানান বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মিছিলের উদ্দেশে। প্রত্যেককে আহ্বান জানান যার যার এলাকায় গিয়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারা দেশে এলাকা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলতে শুরু করে বাঙালি। বিভিন্ন সমাবেশে দৃপ্ত শপথ নেয় স্বাধীনতা আন্দোলনের।

এক জরুরি সভায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতীয় শ্রমিক লীগ। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় সব ইউনিট ও ইউনিয়নকে সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়। শিল্পী মুর্তজা বশীর ও কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত হয় চারুশিল্প সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন পূর্ব বাংলা রেলওয়ে কর্মচারীরাও।

শিল্পী কামরুল হাসানের আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে অনুষ্ঠিত চিত্রশিল্পীদের এক সভায় শাপলাকে জাতীয় ফুল করার সিদ্ধান্ত হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য গোটা পূর্ব পাকিস্তানের সব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসেন চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা।

বেতারে বঙ্গবন্ধুর খবর প্রচারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তান বর্জন করেন রেডিও পাকিস্তানের করাচি কেন্দ্রের খ্যাতনামা বাংলা খবর পাঠক সরকার কবীর উদ্দিন।

প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পাঠানো খাদ্যবোঝাই মার্কিন জাহাজের গতি বদল করে করাচি নেওয়ার ঘটনায় উৎণ্ঠা ও নিন্দা প্রকাশ করেন।

ময়মনসিংহে জনসভায় ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান কখনই জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। আপনারা শেখ মুজিবের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখুন।

লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে গণঐক্য আন্দোলনের প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান বলেন, পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য এখন একটাই পথ খোলা তা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে ১৩ মার্চের প্রথম ফ্লাইটে ঢাকায় এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বসার আহ্বান জানান।

লাহোরে ন্যাপের মহাসচিব সি আর আসলাম এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর চার দফা দাবি মেনে নেওয়ার দাবি জানান।

বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে অনুরূপ দাবি জানিয়ে এক যুক্ত বিবৃতি দেন লাহোরের স্থানীয় বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিক এবং ছাত্র, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। তবে লারকানা থেকে লাহোরে যাওয়ার পথে মুলতান বিমানবন্দরে পিপলস পার্টি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলি ভুট্টো পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জহির উদ্দিন পাকিস্তান সরকারের খেতাব বর্জন করেন।

রাওয়ালপিন্ডিতে এক সরকারি ঘোষণায় আগামী ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের নির্ধারিত সম্মিলিত সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ, খেতাব বিতরণ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত জাতিসংঘের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সদর দপ্তরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন জাতিসংঘের তদানীন্তন মহাসচিব উ থান্ট। এতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষও এ পৃথিবীর বাসিন্দা। তাদের প্রতিও জাতিসংঘের দায়িত্ব রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত