মোদির নিরাপত্তায় দুর্ভেদ্য বেষ্টনী

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ০৩:৪৯ এএম

দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার ছকে সাজানো হচ্ছে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি ও সাতক্ষীরা শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী মন্দির পর্যন্ত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন সফর উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নেওয়া হচ্ছে নজিরবিহীন সব কৌশল। দুদিনের সফরে তিনি আসছেন ২৬ মার্চ। সফরের এখনো দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও এরই মধ্যে ঢাকা পরিদর্শন করে গেছে অগ্রবর্তী দল। ২৬ ও ২৭ মার্চ দুদিনের সফরে তিনি কোথায় কোথায় পরিদর্শন করবেন সে জায়গাগুলোর রেকি করা হয়ে গেছে। আজ শনিবার ভারতের আরেকটি অগ্রবর্তী নিরাপত্তা দলের ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের তান্ডবে নিরাপত্তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিও।

এদিকে মোদির সফরের দুদিন বিমানবন্দরসহ অন্যান্য এলাকায় তার সংস্পর্শে আসার আগে সবাইকে করোনার নেগেটিভ সনদকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ৪৮ ঘণ্টা আগের করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া কেউই প্রবেশ করতে পারবেন না মোদির অনুষ্ঠানে। ওড়াকান্দিতে মোদির আগমন সংবাদে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। আলোচনায় উঠে আসা ওই এলাকার সাংসদ ও আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি কর্নেল ফারুক খান বলেছেন, ‘অবশ্যই এটা আমাদের জন্য একটা আনন্দের ও গর্বের বিষয়। ওড়াকান্দি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন আমাকে জানিয়েছে, তারা মোদির সফর উপলক্ষে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে দেশে থাকবে কঠোর নিরাপত্তার বলয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রীসহ বিদেশি অতিথিদের যাতায়াত এবং যেসব হোটেলে তারা অবস্থান করবেন, সেগুলোর ভেতরে ও বাইরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা থাকবে। প্রতিটি অনুষ্ঠানে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে একটি কন্ট্রোল রুম থাকবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি থাকবে না।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, মুজিব জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৬ মার্চ দুদিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। সফরকালে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা জানাবেন। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও এর বাইরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এজন্য সম্ভাব্য ভেন্যুগুলোরও যাতায়াত, প্রটোকল ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয় খতিয়ে দেখেছে দুই দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। প্রধানমন্ত্রীর প্রাক আগমনী সফর করে গেছেন ওই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। উচ্চপর্যায়ের এ সফরের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব কৌশলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দি পর্যন্ত নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তোলা হচ্ছে।

জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএস তৌহিদুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানবন্দর এমনিতেই নিরাপদ। এখানে সার্বক্ষণিক নিিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান। তার ওপর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে তা আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিনই মনিটর করা হচ্ছে নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক। প্রকৃতপক্ষে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার প্রতিটি পয়েন্টেই পর্যালোচনা চলছে। বাড়ানো হয়েছে নজরদারি, তদারকি ও তল্লাশি। আগে যেখানে ৫ শতাংশ তল্লাশি করা হতো এখন সেটা করা হচ্ছে ১৫ শতাংশ। এটা চলবে একদম ভিভিআইপিদের বিদায়ের পর পর্যন্ত।’

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির বাসিন্দাদের চোখে পড়ছে বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের আনাগোনা। মোদির সফরে তাদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। সেখানকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রথীন্দ্রনাথ রায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ওড়াকান্দিতে মোদির সফরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুব্রত ঠাকুর নিজেও মতুয়া সম্প্রদায়েরই একজন এবং মতুয়াবাদের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের বংশধর। তিনি জানান, ওড়াকান্দিতে সরকারের নানা সংস্থার লোকজনকে আসা-যাওয়া করতে দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আসার খবরে তারা উচ্ছ্বসিত। কাশিয়ানী থানার একটি ইউনিয়ন হলো ওড়াকান্দি। যেখানে ১৮১২ সালে জন্মেছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর। মূলত তিনিই সূচনা করেন মতুয়াবাদের। যা পরে বিস্তৃত হয় তার ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে।

পুলিশ সূত্র জানায়, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে মোদির এ সফরকে স্মরণীয় করতে নেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি। ইতিমধ্যে সাজানো হয়েছে তার সফরসূচি। ২৬ মার্চ বেলা ১১টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে অভ্যর্থনা জানাবেন। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন মোদি। মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। সেখান থেকে সোনারগাঁও হোটেলে যাবেন। সফরকালে তিনি এ হোটেলেই অবস্থান করবেন। ওইদিন বিকেলে মোদি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে যাবেন। সেখানে শেখ হাসিনাসহ অতিথিদের সঙ্গে তিনি সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উপভোগ করবেন। পরে মোদি যাবেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। একই দিন দুদেশের মধ্যে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হবে। এ ট্রেন চলবে পশ্চিমবঙ্গের নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকা পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকা থেকে সেই ট্রেনের ভার্চুয়াল উদ্বোধন করবেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। পরে নৈশভোজে অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করবেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। পরদিন ২৭ মার্চ সকালে হেলিকপ্টারে সাতক্ষীরা শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী মন্দিরে যাবেন মোদি। সেখান থেকে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে যাবেন। এরপর যাবেন ওড়াকান্দিতে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৭ মার্চ থেকে ঢাকাসহ পুরো দেশই কঠোর নিরাপত্তার আওতায় চলে যাবে। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আরও নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে। সপ্তাহখানেক আগে ভারতের অগ্রবর্তী নিরাপত্তা দল ঢাকায় এসেছিল। যেসব স্থানে মোদি যাবেন সেখানে তারা রেকি করে গেছে। আজ শনিবার আরেকটি নিরাপত্তা দলের আসার কথা রয়েছে। মোদিসহ অন্যদের নিরাপত্তা নিয়ে গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়েছে।’

এছাড়া ২৭ মার্চ বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়েও যাবেন নরেন্দ্র মোদি। প্রথমে দুই নেতা একান্তে বৈঠক করবেন। ৪টার দিকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। ওই বৈঠক শেষে বেশকিছু প্রকল্পের উদ্বোধন ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন মোদি। সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় দেশে ফিরে যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত