দাউদকান্দিতে বাসে আগুন

বাসের দুটি সিলিন্ডারই অক্ষত ছিল

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২১, ০৬:০৯ এএম

কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আগুন লাগা যাত্রীবাহী বাসটির দুটি গ্যাস সিলিন্ডারই অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দাউদকান্দি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার মো. ফয়েজ আহমেদ। তিনি বলেন, বাসের ব্যাটারির শর্টসার্কিট কিংবা ইঞ্জিন থেকে বাসটিতে আগুন ধরতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ফয়েজ আহমেদ বলেন, গ্যাসের দুটি সিলিন্ডারই অক্ষত ছিল। তাই প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাটারির শর্ট সার্কিট কিংবা বাসের ইঞ্জিন বেশি গরম হওয়ার কারণে আগুন ধরে যেতে পারে।

এদিকে, ঘটনায় দগ্ধ গোলাম হোসেনের (৭৫) অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার শরীরের ৩১ শতাংশ পুড়ে গেছে, ক্ষতি হয়েছে শ^াসনালির। ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে রেখে তার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ইনস্টিটিউটির মেডিকেল অফিসার মো. নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি আরও জানান, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার এ ঘটনায় দগ্ধদের মধ্যে বর্তমানে তিনজন এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের মধ্যে শামসুন্নাহারের (৬৫) শরীরের ১০ ও রওশন আরার (৪৫) ১২ শতাংশ পুড়ে গেছে। তবে এই দুজনের চেয়ে গোলাম হোসেন বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পার্থ শঙ্কর পাল জানান, দগ্ধ ১৮ জন হাসপাতালে আসেন। চিকিৎসা শেষে ১৫ জন হাসপাতাল ছেড়েছেন। তারা পরে বহির্বিভাগে দেখাবেন।

এদিকে এ ঘটনায় হাসপাতালে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন আহতদের স্বজনরা। তারা বলছেন, একে তো বাসের ফিটনেস ছিল না। তার ওপর যাত্রী ভেতরে রেখে বাসে গ্যাস নেওয়ার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা থেকে চাঁদপুরের মতলবগামী ‘মতলব এক্সপ্রেসের’ একটি চলন্ত বাসে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুন ধরে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।

গতকাল সরেজমিনে বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, আহতদের স্বজনরা উৎকণ্ঠায় সময় পার করছেন। ৯ নম্বর বেডে ভর্তি তাহিয়া আহমেদ (১০)। একটু দূরে দাঁড়ানো তার মা মোহসিনা বেগম নিঃশব্দে চোখ মুছছেন। তার হাতেও ব্যান্ডেজ। ৯, ১২ ও ১৩ নম্বর বেডে একটু পরপর ছোটাছুটি করছেন তিনি। কারণ ১২ নম্বর বেডে মোহসিনার আরেক মেয়ে তাসনিয়া আহমেদ (৬) ভর্তি, তার হাত ও মুখের অনেকটা পুড়ে গেছে। আর ১৩ নম্বর বেডে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন মোহসিনার শাশুড়ি শামসুন্নাহার বেগম (৬৫)। তার মুখমণ্ডল পুড়ে গেছে এবং মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তার শরীরের ১০ শতাংশ পুড়লেও শঙ্কামুক্ত নন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

এই পরিবারের মোট আট সদস্য বাসটিতে ছিলেন, যাদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলেই পুড়ে মারা যান। ঘটনার বর্ণনায় তাহিয়ার বাবা ব্যাংক কর্মকর্তা মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘বাসে আগুন লাগার পর কী করব বুঝতে পারছিলাম না। জানালা ভেঙে আমি লাফ দিলাম। পরে স্ত্রী-সন্তানদের বের করি। বাবা-মা এবং শ^শুর-শাশুড়িকে আনতে কিছুটা দেরি হয়, এর মধ্যেই তারা দগ্ধ হন।’ তিনি বলেন, ‘আমার বড় মেয়েটা বলছিল, বাবা, আমাকে বাঁচাও। ওদিকে আগুন এত বেড়ে গেল! আমার বাবা পুড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। মেয়েকে জানালা দিয়ে নামালাম ঠিকই; বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘বাসটির ফিটনেস ছিল বলে মনে হয় না। ওই অবস্থায় বাসে যাত্রী রেখে চালক গ্যাস নেন। রাস্তায় আমাদের কারও জীবন নিরাপদ নয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি অবাধে চলছে, যাত্রী নিয়েই অহরহ গ্যাস ভরছে। একটি দুর্ঘটনায় মানুষ মরলেই কেবল দু-এক দিন কথা হয়। তারপর যা তা-ই।’

বাসের আরেক যাত্রী গোলাম হোসেনের সঙ্গে তার মেয়ে শাহীনুর আক্তার (৩২) এবং নাতনি সানজানা (১৩) দগ্ধ হয়। শাহীনুর আক্তার বলেন, ‘অসুস্থ বাবাকে ঢাকায় ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। দাউদকান্দি পৌঁছে বাসটি গ্যাস নিয়ে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ও আগুন ধরে যায়। মেয়ে কোলে জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে বেঁচেছি। বাবা বৃদ্ধ মানুষ, দ্রুত বের হতে না পারায় পুড়ে গেছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত