সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর সরকারের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। আর প্রতি বছরই বেশিরভাগ মামলাতেই সরকারপক্ষ হারছে। মামলার পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে করা রিট পিটিশন ও তা থেকে উদ্ভূত লিভ টু আপিল, সিভিল আপিল ও রিভিউর সংখ্যাও বাড়ছে। অন্যদিকে সরকারপক্ষে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারায় সরকারের বিরুদ্ধে রায়, আদেশ বা রুল নিষ্পত্তি হচ্ছে। এমনকি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা মামলাও হচ্ছে। সরকার মামলায় হারার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মারাত্মকভাবে জনস্বার্থ বিঘিœত হয়। এভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায়। আবার মামলা পরিচালনা করতে গিয়েও সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে।
সোমবার দেশ রূপান্তরের ‘অসাধু আইন কর্মকর্তাদের জন্য মামলায় হারে সরকার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার দুর্বলতাসহ এই সংকটের নানা দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উইংসংশ্লিষ্ট রিট মামলা চলমান আছে ২৩৮টি। আর লিভ টু আপিলসহ অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থার রিট, কনটেম্পট মামলাসহ মোট মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৪৩৫টি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ৯৫ হাজার ৮৪৫টি। স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের নামে যে ১০ হাজার মামলা হয়েছে সেগুলোর পুরোটাই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে। তবে এ তালিকায় অধীনস্থ দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থাগুলোর মামলা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এভাবে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধেই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু মামলার সংখ্যা বাড়লেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ নিয়ে সরকারের উদ্বেগও বাড়ছে।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের আইনপরিপন্থী ও বিনা নোটিসে কার্যক্রম, পক্ষপাতদুষ্টতা, অনিয়ম, দুর্নীতি, কার্যক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি, উদাসীনতা, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী প্যানেলকে সহযোগিতা না করা সরকারের মামলা হারার কারণ। আর সবচেয়ে বড় কথা মামলা হওয়ার কারণ কমছে না বলেই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, সরকারি মামলা পরিচালনা হয় খুবই দায়সারাভাবে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি কৌঁসুলি ও কর্মকর্তারা নামমাত্র মামলা পরিচালনা করেন। আরও অভিযোগ আছে যে, সরকারি কৌঁসুলিরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেন। আইন ও জনপ্রশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের মামলায় হেরে যাওয়ার অন্যতম কারণ আইন কর্মকর্তা নিয়োগ প্রক্রিয়া যোগ্যতা অনুসারে হয় না। এটি হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। ফলে অযোগ্য ও অদক্ষ লোকও নিয়োগ পায়। আর সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তারও বদল ঘটে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গত বছর ৩০ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সব মন্ত্রণালয়কে চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা আমলে নেয়নি বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়। এ অবস্থায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত সোমবার এসব নির্দেশনা মানার জন্য আবারও চিঠি দেয় সব মন্ত্রণালয়ের সচিবকে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মনে করে, ক্রমবর্ধমান কর্মপরিধি বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার সাংগঠনিক কাঠামো পর্যালোচনা করা এবং মামলা পরিচালনায় সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করা দরকার। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা জরুরি যে, শুধু সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলাই নয়, সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। এছাড়া বিভাগীয় এসব মামলা নিষ্পত্তি না করে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখায় প্রশাসনে নানা ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। ২০০০ সালে এটিএম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বিভাগীয় মামলার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছিল।
সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে মামলার মূল কারণ প্রশাসনিক ভুল সিদ্ধান্ত ও অদক্ষতা। এছাড়া উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সম্পদ দখলের জন্যও সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। অন্যদিকে একটি প্রশিক্ষিত ও দক্ষ অ্যাটর্নি সার্ভিস না থাকায় সরকার এসব মামলা সামলাতে পারছে না। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে সরকারপক্ষে আরও দক্ষতার সঙ্গে মামলা পরিচালনার জন্য স্বতন্ত্র অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন করার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্মরণ করা যেতে পারে, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ ২০০৮ প্রণীত হয়েছিল। পাশাপাশি সরকারি অ্যাটর্নি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন ও সংসদে পাস না হওয়ায় সেই উদ্যোগের অগ্রগতি হয়নি। অ্যাটর্নি সার্ভিস আইন প্রণয়ন করা হলে চুক্তিভিত্তিক আইন কর্মকর্তার নিয়োগ থাকবে না। একটি শক্তিশালী অ্যাটর্নি সার্ভিস সরকারের শক্তি ও সক্ষমতা অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে। সরকার অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন ত্বরান্বিত করার পদক্ষেপ নেবে সেটাই কাম্য।
