বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজ ফ্ল্যাট থেকে তৈরি হয়ে বের হওয়ার মুখেই বাজল ফোনটা। সাত তাড়াতাড়ি অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনটা ধরলেন এলিটা কিংসলে। পরিচয় দিতেই অবশ্য চিনতে সময় নিলেন না। মুহূর্তেই জিজ্ঞাসু কণ্ঠ বদলে আপন করে নিলেন। আর এভাবেই এদেশের মানুষকে লহমায় আপন করে নেওয়া মানুষটাও বদলে হয়ে গেছেন পুরোদস্তুর বাংলাদেশি। অবয়বে পরিচয় আনা সম্ভব হয়নি, তবে কাগজে-কলমে এলিটা কিংসলে এখন সাচ্চা বাংলাদেশি। জন্মভূমি নাইজেরিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ৩১ বছরের এই ফুটবলার বুকে লাল-সবুজ পতাকা ধারণের পাশাপাশি পকেটে পুরে নিয়েছেন সবুজ মলাটের পাসপোর্ট। যা তাকে দিয়েছে এদেশে নির্বিঘেœ বসবাসের সুযোগ। একই সঙ্গে এই পাসপোর্ট নতুন করে দেখাচ্ছে লাল-সবুজ জার্সিতে খেলার স্বপ্নও।
এই স্বপ্নটা অবশ্য আগেও একবার দেখেছিলেন এলিটা কিংসলে। সেটা কোচ লডউইক ডি ক্রুইফের জমানায়। এই ডাচ ভদ্রলোক একবার উদ্যোগ নিলেন এলিটাসহ ঢাকার মাঠে অতি পরিচিত তিন আফ্রিকানকে নাগরিকত্ব দিয়ে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার। কোচের কাছে এসে সাক্ষাৎকার দিয়ে নাগরিকত্ব পাল্টে ফেলার ইচ্ছের কথাও জানিয়েছিলেন এলিটা। কিন্তু ডি ক্রুইফের চাওয়া অবশ্য পূরণ করে দেয়নি বাফুফে। ২০১১ সালে আরামবাগের হয়ে খেলতে আসেন এলিটা। পরের বছর পরিচয় হয় লিজা নামে এক বাঙালির সঙ্গে। সে বছরই বিয়ে করেন দুজন। আর ২০১৬ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার আবেদন করেন। বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্ব পেতে হলে আগের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার কঠিন শর্ত প্রিয় স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্য মেনে নেন এই নাইজেরিয়ান। স্বামীর এই আত্মত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়ে গেলেন লিজা, ‘আমার আগের সংসারের একটা ছেলে আছে। তাকে দেখেই কিন্তু এলিটা আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। আমাদের নিজেদের একটা মেয়ে হয়েছে। এলিটা এখন দুই সন্তানের বাবা। আর আমাদের জন্য ও অনেক বড় আত্মত্যাগ করেছে। বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্ব পেতে হলে ওকে নাইজেরিয়ার নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করতে হতো। ও সেটা করেছে বলেই ও এদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছে। আমি আসলে অনেক ভাগ্যবান ওর মতো ভালো মনের একজন মানুষকে স্বামী হিসেবে পেয়ে।’
লিজার সঙ্গে এলিটার পরিচয় ফারিয়ান আরজুর মাধ্যমে। লিজার প্রথম ঘরের সন্তানের সঙ্গেই এলিটার প্রথম পরিচয় হয়েছিল এক রেস্তোরাঁয়। ছোট্ট আরজুর বাবা থেকেও নেই জেনে খুব মায়া হয়েছিল এলিটার। লিজার সঙ্গে সেভাবেই হয় পরিচয়। এরপর সখ্য। ২০১২’র মে মাসে হয় বিয়ে। সেই যে মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়া, এরপর থেকে এলিটা মনেপ্রাণে বাঙালি হতে চেয়েছেন, ‘আমি সত্যি খুব খুশি। এখন থেকে আমি পুরোপুরি বাংলাদেশি। অনেক দিনের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়েছে। রবিবার নাগরিকত্ব পেয়েছি। এখন আর স্ত্রী, সন্তানকে ছেড়ে যাওয়ার ভয় নেই।’ ৭ বছরের মেয়ে সাফিরার কাছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত মুখস্ত করেছেন এলিটা।
একটা স্বপ্ন তো পূরণ হলো। ডাচ কোচ ক্রুইফ যে স্বপ্নটা ২০১৫ সালে বুনে দিয়েছিলেন, সেই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন তো এলিটা? নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ-নাইজেরিয়া দৌড়াদৌড়ি করে এ মৌসুমে কোনো ক্লাবের হয়ে চুক্তি করা হয়নি। ফলে বেশ কয়েক মাস তিনি খেলার বাইরে আছেন। সম্প্রতি অবশ্য চুক্তি করেছেন লিগ টেবিলের শীর্ষে থাকা বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে। যদিও কিংসের খেলার বিষয়টি মুখে স্বীকার করতে চাইলেন না এলিটা। তবে কিংসে খেলেই যে তিনি জাতীয় দলের ইংলিশ কোচ জেমি ডে’র নজর কাড়তে চান সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘আগামী ৬ মাস আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা ক্লাব পেয়ে গেছি। তবে সেটা ক্লাবই ঘোষণা দেবে। চেষ্টা করব নিজেকে আরও উন্নত করতে। কারণ নাগরিকত্ব যখন পেয়েছি তখন আমি জাতীয় দলে খেলার জন্য যোগ্য। ক্লাবে ভালো করতে পারলেই তো নিজেকে জাতীয় দলের জন্য নিজেকে প্রমাণ করতে পারব।’
এলিটার নাগরিকত্ব পাওয়ার কথাটা শুনেছেন জেমি ডেও। তবে এখনই তার ব্যপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চান না জাতীয় দলের কোচ, ‘ও নিঃসন্দেহে ভালো ফরোয়ার্ড। তবে বেশ কিছুদিন খেলার মধ্যে নেই। তাই আগে ওকে খেলে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। যদি সে নিজেকে প্রমাণ করতে পারে তবে অন্য বাংলাদেশিদের মতোই তার জন্য জাতীয় দলে খেলার সুযোগ থাকবে।’
