রিজার্ভ থেকে প্রথম ৫৪১৭ কোটি টাকা ঋণ পেল পায়রা

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০২১, ০১:৫১ এএম

বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের (বিআইডিএফ) প্রথম ঋণ পাচ্ছে পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষ। এই বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য এই ঋণের অর্থ ব্যয় করা হবে। এই কর্মসূচির অনুকূলে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ছাড় করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার অর্থ বিভাগ, পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষ ও সোনালী ব্যাংকের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। রিজার্ভ থেকে দেশের কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন এটাই প্রথম।

এর আগে গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’-এর উদ্বোধন এবং এই তহবিল থেকে ‘পায়রাবন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং’ স্কিমে অর্থায়নের লক্ষ্যে ত্রিপক্ষীয় ঋণচুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ বছর মেয়াদে পায়রা বন্দরকে এই ঋণ দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ১ শতাংশ সুদে সোনালী ব্যাংককে এই ঋণ দেবে। সোনালী ব্যাংক বন্দর কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে ঋণের বিপরীতে ৩ শতাংশ সুদ আদায় করবে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অর্থ বিভাগ প্রান্তে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের চেয়রম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী, পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর হুমায়ুন কল্লোলসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রাথমিকভাবে বন্দর এবং বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ তহবিলের বার্ষিক বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ কোটি ডলার।

করোনার মহামারীর মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয় বাড়তে থাকায় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও বাড়তে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জুলাইয়ে রিজার্ভ থেকে একটি অংশ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা যায় কি না এমন একটি প্রস্তাব রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অর্জন করে।

অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, আসলে উন্নয়নটা তখনই হবে দেশটাকে যদি কেউ চিনতে পারে, জানতে পারে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে পারে এবং উন্নতি যে অপরিহার্য দেশটার জন্য, সেটা যদি কারও চিন্তা-চেতনায় থাকে, তখনই সে দেশের উন্নতি সম্ভব। বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ, ভৌগোলিক সীমারেখার তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। এ দেশে ধারাবাহিক গণতন্ত্র চলেনি, মিলিটারি ডিক্টেটররা বিভিন্ন সময় কখনো দৃশ্যমান হয়ে আবার কখনো অদৃশ্যভাবে এই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।  ক্ষমতা যুদ্ধাপরাধী আর খুনিদের হাতে থাকলে সেই দেশের কখনো উন্নতি হওয়া সম্ভব না।

শেখ হাসিনা বলেন, আজকের বাংলাদেশ সারা বিশে^র কাছে উন্নয়নের রোল মডেল। অনেকে অনেক সময় জিজ্ঞেস করেন ম্যাজিকটা কী? ‘আমি বলি ম্যাজিক কিছুই না। ম্যাজিকটা হচ্ছে দেশপ্রেম। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবোধ, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, কর্তব্যবোধ। মানুষকে নিজের করে চিন্তা করা। কেউ শুধু হয়তো কারও সন্তানকে দুই পায়ে দাঁড় করানোর চিন্তা করবে। আর আমার চিন্তা আমার বাবার কাছ থেকে যেটা শিখেছি, দেশের মানুষকে দুই পায়ে দাঁড় করিয়ে তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা। সেটাই হচ্ছে আমার একমাত্র লক্ষ্য।’

‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’ গঠন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস বিশ^ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এর মাঝেও আমাদের দেশকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আর সেই লক্ষ্য নিয়েই এই তহবিল গঠন।’ তিনি বলেন, মহামারীর মধ্যেই রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেয়েছে, আবার আমদানি ব্যয় কমে গেছে। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

‘এই রিজার্ভের টাকাটাকে আমাদের দেশের উন্নয়নের কাজে আমরা নিজেরা কীভাবে ব্যয় করতে পারি, সেটাই আমরা চিন্তা করেছি। বারবার শুধু অন্যের কাছে হাত পাতা বা অন্যের থেকে ধার না করে আমরা আমাদের নিজেদের অর্থ দিয়েই নিজেদের অবকাঠামো উন্নয়ন বা সেখান থেকে আমরা যারা আমাদের এখানে বিনিয়োগ করতে আসবে বা দেশি-বিদেশি যারাই আসুক, তাদের ঋণ নেওয়ার যে চেষ্টা, সেটা আমরা নিজেরা নিজেদের অর্থ থেকে ব্যয় করতে পারি। তাতে দেশেরও লাভ, আবার আমাদেরও একটা আত্মবিশ্বাস জন্মাবে, আত্মমর্যাদাবোধ আসবে, আর আমরাও যে পারি, সেটাও আমরা বিশে^র কাছে দেখাতে পারব।’

শেখ হাসিনা বলেন, সেই চিন্তা থেকেই ছয় মাসের আমদানি খরচের টাকা রিজার্ভে রেখে বাকি টাকা কীভাবে বিনিয়োগ করা যায়, সেই পরিকল্পনা তিনি নেন। ‘সেই চিন্তা থেকে নিজস্ব একটা তহবিল গঠন...যে তহবিল থেকে বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিতে পারবে এবং আমাদের দেশের অবকাঠামোগুলোর যাতে উন্নয়ন হয়, তার প্রচেষ্টা আমরা করব।’

এই তহবিল থেকে পায়রাবন্দরে অর্থায়নের বিষয়টি তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দরটাও করতে হবে। ইতিমধ্যে মোংলা বন্দরও আমরা চালু করেছি, যেটা বিএনপি সরকারের আমলে বন্ধ ছিল। তা ছাড়া আমাদের আরেকটা বন্দর কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে, সেটা হচ্ছে মহেশখালীর মাতারবাড়ী, সেখানেও কিন্তু একটা সমুদ্রবন্দর হচ্ছে। আর পায়রাবন্দরটা আমরা নিজের উদ্যোগেই করি।’

গ্লোবাল ভিলেজে এককভাবে কেউ চলতে পারে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের পোর্ট...চট্টগ্রাম পোর্ট, মোংলা পোর্ট, এখন পায়রা পোর্ট, আবার মাতারবাড়ীতেও অর্থাৎ মহেশখালী সেটাও একটা নতুন পোর্ট আমাদের তৈরি হচ্ছে। আমরা শুধু নিজে ব্যবহার করব না। ইতিমধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান তাদেরও আমরা কিন্তু সুযোগ দিয়েছি।’

রাবনাবাদ চ্যানেল শুধু ড্রেজিং নয়, রক্ষণাবেক্ষণেরও নির্দেশনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এভাবে আমাদের দক্ষিণের নদীগুলো শত শত বছরে সিলড মুখগুলো যে বন্ধ করে রেখেছে, সেটা যদি আমরা খুলে দিতে পারি, আমাদের নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে। নদীপথে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সুগম হবে। শুধু তাই নয়, এখান থেকে আমরা সেই ভারতের আসাম থেকে বা ভুটান থেকে নৌপথেই পণ্য পরিবহন করার সুযোগ হবে এবং তারা আমাদের পোর্টগুলোও ব্যবহার করতে পারবে। তার ফলে আমাদের অর্থনীতি আরও মজবুত হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি মোংলা পোর্ট যখন চালু হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে এই দুটো হলে আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখতে পারবে। কাজেই আমি মনে করি, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এবং সত্যি কথা বলতে, পায়রা পোর্ট যখন প্রথম করি তখন অনেকের কাছে শুনেছি, এটা চলবে না, এটা কীভাবে হবে, এটা কাজে লাগবে না, ইত্যাদি নানা কথা শুনতে হয়। তবে এটা ঠিক অনেক কিছু শুনতে হতে পারে, ওগুলো নিয়ে আমি চিন্তা করি না।’ দেশের উন্নয়নে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’-এর উদ্বোধন করার পর তার মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে একটি নবযুগের সূচনা হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বিআইডিএফ থেকে অর্থায়নের জন্য প্রথম অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে পায়রাবন্দরে রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেইন্যান্স ড্রেজিং স্কিমটি গ্রহণ করেন। এই প্রকল্পের অর্থায়ন বিষয়ে অনুষ্ঠানে অর্থ বিভাগ, পায়রাবন্দর কর্র্তৃপক্ষ ও সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার ডিভিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংযুক্ত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত