সংশয় আর শঙ্কা নিয়েই আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার সাঁইত্রিশতম আসর। বিকেল ৩টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এবারের মেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে প্রতি বছর এই মেলা বসলেও মাহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অনিশ্চয়তায় পড়ে এবারের আসর। পরে অবশ্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মার্চের ১৮ তারিখ থেকে মেলা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মেলা চলার কথা থাকলেও সেটি নির্ভর করবে করোনা পরিস্থিতির ওপর। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ জানিয়েছেন, সংক্রমণ বাড়লে মাঝপথেই মেলা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অমর একুশে বইমেলা উৎসর্গ করা হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। এবারের বইমেলার মূল থিম ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’। মহামারী করোনার কারণে এর সংক্রমণ ঠেকাতে বইমেলায় নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তা। প্রবেশপথে থাকবে ‘নো মাস্ক-নো এন্ট্রি’ সংবলিত লোগো। এবার থাকছে না শিশু প্রহরও।
গত মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিস্তারিত বিষয় সাংবাদিকদের জানান আয়োজকরা। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বইমেলার সাঁইত্রিশতম আসর এবার ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে মার্চ মাসে শুরু হচ্ছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বইমেলা ১৮ মার্চ শুরু হয়ে চলবে ১৪ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলা উৎসর্গিত হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। এবারের বইমেলার মূল থিম ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি বইমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. বদরুল আরেফীন। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সভাপতিত্ব করবেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ বঙ্গবন্ধু রচিত ও বাংলা একাডেমি প্রকাশিত আমার দেখা নয়াচীন-এর ইংরেজি অনুবাদ ঘঊড ঈঐওঘঅ ১৯৫২-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই গ্রন্থ উন্মোচন করবেন। এছাড়া উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২০ প্রদান করা হবে। ইতিমধ্যে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়লে মেলার বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। যে কোনো সময় মেলা বন্ধও করা হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘সবার আগে জীবন। সেটা বিবেচনায় রেখে করোনায় যে কোনো সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে আমরা করোনায় সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এই মেলা সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে চাই।’
বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গায়। এবার মেলায় মোট ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেলায় ৩৩টি প্যাভিলিয়ন থাকবে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থানান্তরিত হয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মেলা প্রাঙ্গণে। সেখানে ১৩৫টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ৫টি উন্মুক্ত স্টলসহ ১৪০টি স্টল দেওয়া হয়েছে। একক ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই বিক্রি করবে। বাংলা একাডেমির ৩টি প্যাভিলিয়ন, শিশু-কিশোর উপযোগী বইয়ের জন্য ১টি এবং সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকার-এর ১টি স্টল থাকবে। এবারও শিশুচত্বর মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকবে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রথম দিকে ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে না।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে। বইমেলার প্রচার কার্যক্রমের জন্য একাডেমির বর্ধমান ভবনের পশ্চিম বেদিতে ১টি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৩টি তথ্যকেন্দ্র থাকবে।
এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব প্রান্তে নতুন একটি প্রবেশপথ করা হয়েছে এবং সেখানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। সব মিলে সোহরাওয়ার্দীতে ৩টি প্রবেশপথ ও ৩টি বাহির পথ থাকবে। মাস্ক ছাড়া এবার মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন না কেউই। প্রত্যেক প্রবেশপথে থাকবে সুরক্ষিত ছাউনি, যাতে বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন। বইমেলার প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত সংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। নিরাপত্তার জন্য মেলায় এলাকাজুড়ে ৩ শতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
১৯ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৪টায় বইমেলার মূল মঞ্চে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২০ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগতমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ২০২০ বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মধ্য থেকে শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রতিষ্ঠানকে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। এছাড়া ২০২০ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থের জন্য ১টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ এবং এ-বছরের মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে। এবারের গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করছে নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১১৫টি বই।
মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার মেলায় বেশ কিছু নতুন সংযোজন করা হয়েছে। জাতির পিতার জীবন ও কর্ম-অধ্যয়ন এবং স্বাধীনতার মর্মবাণী জাতীয় জীবনে যাতে প্রতিফলিত হয় তার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মেলার বিন্যাসে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৩টি প্রবেশপথ বিবেচনায় রেখে স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলো বিন্যাস করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন হয়েছে রমনা প্রান্তে একটি প্রবেশপথ ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে। এছাড়া লেখক বলছি মঞ্চ ও গ্রন্থ উন্মোচনের স্থান বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। নামাজের ঘর, টয়লেট ব্যবস্থা সম্প্রসারিত ও উন্নত করা হয়েছে। মহিলাদের জন্য সম্প্রসারিত নামাজ ঘর থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে দুটি ফুডকোর্ট থাকবে।
বইমেলা ১৯ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
