ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) আগুনে পুড়ে গেছে। আগুন লাগার পর স্থানান্তর করে হাসপাতালের অন্য ভবনে নেওয়ার সময় চিকিৎসাধীন তিন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৮টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় করোনা ইউনিটের ওই আইসিইউতে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাড়ে ৯টার দিকে তা নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত তিন করোনা রোগী হলেন ধামরাইয়ের ঈশাননগর শাহ কারী ইসমাইলিয়া দাখিল মাদ্রাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৮), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা (৬৬) ও টাঙ্গাইলের কিশোর চন্দ্র রায় (৭০)।
হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং আগুন লাগার পর ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়া ও স্থানান্তরের সময় অক্সিজেনের অভাবে তিন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনরা। তারা বলেছেন, আগুন লাগার পর নার্স বা ওয়ার্ডবয় কেউই তাৎক্ষণিক এগিয়ে আসেননি। স্বজনরা নিজেরাই রোগীদের স্যালাইনপত্র খুলে কোলে করে বের করে নিয়ে আসেন।
এর আগে গত বছর ২৭ মে রাতে রাজধানীর গুলশানে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আগুন লেগে চিকিৎসাধীন পাঁচ রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংযোগে ‘স্পার্ক’ হয়ে ওই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
গতকাল ঢামেকের আইসিইউর আগুনের সূত্রপাত হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা থেকে বলে ধারণা করছে হাসপাতালটির কর্র্তৃপক্ষ। তবে প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা। আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা গতকাল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে ঢামেকের আইসিইউতে আগুন লাগার খবর পান। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিটের সদস্যদের প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি বলেও উল্লেখ করেন ফায়ার সার্ভিসের এ কর্মকর্তা।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল সকাল ৮টা ১০ মিনিটে আইসিইউতে আগুন লাগার পর ধোঁয়া বের হয়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাসপাতালে চলে আসেন। আগুন লাগার পর প্রথমে অগ্নিনির্বাপণের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাসপাতালের কর্মচারীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। এরপর ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এছাড়া নার্স, ওয়ার্ডবয় ও চিকিৎসকরাও আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে অংশ নেন বলে দাবি করেছেন ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘আইসিইউতে সব ক্রিটিক্যাল পেশেন্ট (রোগী) থাকে। কভিড ইউনিটের এই আইসিইউতে ১৪ জন রোগী ছিলেন। এদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানান্তরের পর চিকিৎসাধীন ওই তিনজন মারা যান। মৃত্যু হওয়া তিনজনের শরীরে কোনো অংশ দগ্ধ হয়নি। তারা কেউ আগুনের ধোঁয়াতেও মৃত্যুবরণ করেননি। সবাইকে আইসিইউ থেকে দ্রুত অন্যান্য সিসিইউ, আইসিউ ও ওয়ার্ডে স্থানান্তর করার পর সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, ‘আগুন লাগার পর আইসিইউর রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর স্পেশাল লোক নিয়ে অক্সিজেন লাইন বন্ধ করা হয়। আর এর আগে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ভেন্টিলেটরসহ তাদের স্থানান্তর করি। আইসিইউতে ফোম ও প্লাস্টিকের বিভিন্ন আইটেম থাকায় ব্যাপক ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। যে পরিমাণ আগুন লেগেছে ও ক্ষতি হয়েছে, তারপরও আমরা সব রোগীকে সেখান থেকে বের করে আনতে পেরেছি।’
আগুনের কারণ খুঁজে বের করতে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জানিয়ে ব্রিগেডিয়ার নাজমুল বলেন, ‘এনেসথেশিয়া বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোজাফফর হোসেনকে প্রধান করে আমরা ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তারা একটি প্রতিবেদন জমা দেবেন। এছাড়া আমরা সব অভিযোগই তদন্ত করে দেখব। আইসিইউর রোগীদের হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে এখন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছে। এটাতে দাহ্য পদার্থ অক্সিজেন থাকে, কাজেই কোনো সুযোগ পেলেই আগুন ধরে যায়।’
আইসিইউতে আগুনের ঘটনায় ৪-৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে এমন ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এর একেকটি বেডের জন্য সব যন্ত্রপাতিসহ ২০ লাখের মতো টাকা খরচ হয়। তবে এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার সব মেশিন নষ্ট হয়নি। কিছু বেডও ভালো আছে।’
নিহতের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইসিইউতে আগুন লাগার পরই দ্রুত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। সেখান থেকে হুড়োহুড়ি করে রোগী স্থানান্তর করা হয়। সংকট দেখা দেয় অক্সিজেনের। এ ঘটনার পর নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।
আইসিইউতে থাকা মাহবুব মণ্ডল নামে এক রোগীর ছেলে ইসলামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১২ নম্বর বেডের রোগীর সামনে থাকা একটি পাইপ থেকে হঠাৎ সিগারেটের ধোঁয়ার মতো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। এক রোগীর সঙ্গে থাকা একজন অভিভাবক হাত দিয়েই ওই ধোঁয়া নেভানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন হঠাৎ করেই আগুন জ¦লে উঠে সেন্ট্রাল এসিতে চলে যায় এবং মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সবাই ছোটাছুটি শুরু করে। ডাক্তার-নার্স, ওয়ার্ডবয় সবাই বের হয়ে যান। যেসব রোগীর স্বজন ভেতরে ছিলেন তারাই তাদের রোগীদের কোলে ও কাঁধে করে বের করেন। পাশে কোনো হুইলচেয়ার বা ট্রলি ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রোগীদের নিয়ে বের হয়ে পাশের সিসিইউতে যাই। তবে সেখানেও কোনো ডাক্তার ছিল না। সবাই রোগীদের নিয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে। আমার মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে আমি আইসিইউর খোঁজে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলি। তারা বলে যে বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে দেবে, কিন্তু দেয়নি।’
ঢামেকের আইসিইউতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তর। অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অ্যাম্বুলেন্স) নূর হাসানকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) দেবাশীষ বর্ধন এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ আইসিইউতে অগ্নিকাণ্ডের খবরে পাঁচটি ইউনিট পাঠানো হয়। তবে প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়। ধোঁয়া বের হওয়ার সুযোগও ছিল সীমিত। এজন্য ধোঁয়া বের করে দেওয়ার পর আগুন নির্বাপণ করতে হয়েছে। আগুনের কারণ প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ ওই কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে বলেও জানান দেবাশীষ বর্ধন।
ঢামেকের আইসিইউতে আগুন লাগার খবর পেয়ে দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ও স্বাস্থ্য সচিব মো. আবদুল মান্নান। তারা যত দ্রুত সম্ভব নতুন করে হাসপাতালটিতে আইসিইউ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
