বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

ছাপা বইয়ের আবেদন কখনো পুরনো হবার নয়

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ০২:১৯ এএম

ডিজিটাল বহু মাধ্যমে বইয়ের বিকল্প পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে গেলেও ছাপা বইয়ের আবেদন কখনো পুরনো হবার নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর বাংলা একাডেমি চত্বর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী অমর একুশের বইমেলা উদ্বোধন করে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে বাংলা একাডেমির মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ‘বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’।

সকলকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে পড়ার বিষয়ে উৎসাহিত করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আরও অনেক কিছু জানতে পারে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। সরকারে কিংবা বিরোধী দলে যেখানেই  থাকি, আমি সবসময় বইমেলায় অংশগ্রহণ করি। এবার সশরীরে উপস্থিত না থাকতে পারলেও ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে আপনাদের সঙ্গে অংশ নিচ্ছি। এবারের বইমেলা আমাদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের বিষয়; করোনা মোকাবিলায় আমরা টিকা প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছি। তারপরও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে বইমেলায় আসতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী অনুবাদ সাহিত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘নিজের মায়ের ভাষাকে জানা যেমন দরকার তেমনি অন্য ভাষা জানাটাও দরকার। সেজন্য অনুবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্য বাংলা একাডেমিকে সবসময়ই আমি অনুরোধ করেছি অন্যান্য দেশের সাহিত্য যেন আমরা জানতে পারি। কারণ, সাহিত্যের মধ্য দিয়েই মানুষের জীবনচর্চা জানা যায়, সংস্কৃতি ও ইতিহাস জানা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতিকরা দিনভর বক্তৃতা করার পর সেখানে কিছুটা মন ছুঁয়ে গেলেও সাহিত্য মানুষের মধ্যে গভীর রেখাপাত করতে পারে। কাজেই, সাহিত্যের মাধ্যমে কোনো বার্তা দেওয়া গেলে সেটা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়িত্ব লাভ করে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। তবে আমাদের একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের যথাযথ অনুবাদ বিশ্বের ভাষাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। কারণ যথাযথ অনুবাদের মাধ্যমেই আমাদের জনজীবন, সংস্কৃতি ও গণমানুষের অন্তরঙ্গ পরিচয় পাওয়া যাবে।’

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবং সংস্কৃতি সচিব মো. বদরুল আরেফীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন ফরিদ আহমেদ।

শিল্পী শারমিন সাথী ইসলামের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং ঐতিহাসিক ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘স্বাধীনতার মাস মার্চ থেকে শুরু করে বাংলা নববর্ষ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত এবারের মেলায় সবাই স্বাস্থ্যসচেতন থেকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করবেন এই প্রত্যাশা করছি।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘বৈশ্বিক করোনা মহামারীর বিরুদ্ধ-বাস্তবে আমরা নির্ধারিত সময়ের পরে হলেও সবার সহযোগিতায় বইমেলা আয়োজন করার সংকল্প গ্রহণ করেছি। জনগণের স্বাস্থ্যসুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এবার গত বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিসরে বইমেলার স্থান বিস্তৃত করা হয়েছে।’ 

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব বদরুল আরেফীন বলেন, ‘জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে অমর একুশে বইমেলা একটি ঐতিহাসিক শুভ পদক্ষেপ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে প্রতিপাদ্য করে আয়োজিত এবারের মেলা গোটা বাঙালি জাতির প্রাণের মেলা।’

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘করোনা মহামারীর বৈরী বাস্তবতায় বিলম্বে হলেও একুশে বইমেলা শুরু হওয়া একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। করোনা মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশনাশিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেন, “একুশের বইমেলা কেবল বই বিকিকিনির উৎসব নয় বরং তাকে আমাদের জাতিসত্তার শেকড়ের বিষয় বিবেচনা করতে হবে। কারণ ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমির এই বইমেলা শুরুর সময়ে স্লোগান নির্বাচন করা হয়েছিল ‘একুশ আমাদের পরিচয়’।”

বইমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এর ইংরেজি অনুবাদ ‘ঘঊড ঈঐওঘঅ ১৯৫২’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ফকরুল আলম। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও প্রদান করা হয়। এ বছর পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতায় মুহাম্মদ সামাদ, কথাসাহিত্যে ইমতিয়ার শামীম, প্রবন্ধ/গবেষণায় বেগম আকতার কামাল, অনুবাদে সুরেশরঞ্জন বসাক, নাটকে রবিউল আলম, শিশুসাহিত্যে আনজীর লিটন, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় সাহিদা বেগম, বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞানে অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনীতে ফেরদৌসী মজুমদার, ফোকলোরে মুহাম্মদ হাবীবুল্লা পাঠান।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে ৩ লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমির বিক্রয়কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নূরুন্নাহার খানম ও শাহাদাৎ হোসেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত