প্রতিবন্ধকতা জয় করে দুর্বার সৌমিক

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২১, ১২:৩৪ এএম

জন্ম থেকেই বাঁ হাতের অর্ধেকটা নেই সৌমিক ম-লের। এ নিয়ে বাবা তুষার ম-ল ও মা রুপা ম-লের কষ্টের শেষ নেই। কিন্তু ১৩ বছরের সৌমিকের আছে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন। তাই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে সে ঠিকই দুর্বার গতিতে ছুটে চলছে। আর দশটা ছেলের মতোই সে এখন ব্যস্ত টেবিল টেনিস নিয়ে। পল্টনের শহীদ তাজউদ্দীন উডেন ফ্লোরে খেলছে চলমান মহানগরী টেবিল টেনিস লিগে। এর মধ্যে একটি ম্যাচে জয়ও পেয়েছে অষ্টম শ্রেণিতে পড়–য়া নড়াইলের এই কিশোর। জন্ম থেকেই বাঁ হাতের অর্ধেকটা নেই বলে একরত্তি আফসোস নেই সৌমিকের। কনুই দিয়ে ঠিকই সার্ভের জন্য বল ছুড়ে মারছে শূন্যে। আর ডান হাতে খেলছে স্বাভাবিকদের মতোই। এক হাতেই সৌমিকের চোখে এখন সেরা হওয়ার স্বপ্ন।

প্রথম বিভাগ টিটিতে নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সৌমিক খেলছে প্রমিজিং জুনিয়র দলের হয়ে। দু’বছর আগে সৌমিককে টিটিতে আসতে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন জাতীয় দলের খেলোয়াড় সাদিয়ার রহমান মৌয়ের মা শাহনাজ পারভীন, ‘আসলে সৌমিকের বড় বোন আর আমার বড় মেয়ে একই স্কুলে পড়ত। ওকে ক্রিকেট খেলতে দেখে ওর মাকে বললাম টিটিতে দিতে। কারণ ক্রিকেট এক হাতে খেলা সত্যিই কঠিন। আমার পরামর্শে সৌমিককে দু’বছর আগে ভর্তি করানো হয় নড়াইল টিটি ক্লাবে। আমার মেয়েদের কোচ বিপ্লবের কাছেই সৌমিকের টিটির হাতেখড়ি। ও সত্যি খুব ভালো খেলোয়াড়। ওকে আমি চাই স্পেশাল অলিম্পিকের জন্য তৈরি করতে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ও কিছু করতে পারলে ওর বাবা-মা অনেক খুশি হবেন।’

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নয়, সৌমিককে ঘরোয়া আসরে খেলতে দেখেই আনন্দের সীমা নেই মা রুপা ম-লের। যেন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে তার আদরের ছেলে, ‘আসলে আনন্দে আজ বারবার আমার চোখে পানি চলে আসছে। বলে বোঝাতে পারব না মা হিসেবে আজ আমার কতটা আনন্দের দিন।’ নড়াইল থেকে টেলিফোনে বলছিলেন রুপা ম-ল, ‘আজকে ও ঢাকায় গিয়ে খেলছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান ভাবির (শাহনাজ পারভীন)। আমাদের চেয়েও ওনার বেশি উৎসাহ সৌমিককে নিয়ে। ও যখন জন্ম নিল, তখন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। একটা দুশ্চিন্তাও ছিল। কীভাবে ছেলেটা বড় হবে? কিন্তু ওর মধ্যে ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রতি ঝোঁক দেখতে পাই। ছেলেটা আমার খুব আদরের। অন্য দশজনের মতো চঞ্চল নয়, নম্র স্বভাবের। ক্রিকেট খেলতে খুব পছন্দ করত। একবার প্রতিবন্ধীদের একটি আসরে গিয়ে দেখা হয় ভাবির সঙ্গে। তিনিই ওকে টিটিতে ভর্তি হওয়ার কথা বলেন। এরপর থেকে ও টিটি ক্লাবে প্রতিদিন অনুশীলন করে। এবারই প্রথম ভাবি এবং জাতীয় দলের কোচ মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের সহায়তায় ওকে ঢাকায় খেলতে পাঠিয়েছি। আমি চাই সৌমিক একদিন বড় টিটি খেলোয়াড় হয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনুক।’

একজন ভালো টিটি খেলোয়াড় হওয়ার সব বৈশিষ্ট্যই আছে ওর মধ্যে। ঢাকা খেলতে এসে উচ্ছ্বসিত সৌমিক বলে, ‘এখানে খেলতে খুব ভালো লাগছে। আগে সার্ভ করতে একটু সমস্যা হতো। অনুশীলন করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’ এক হাত যে নেই সেটা তাকে কখনই কষ্ট দেয় না, ‘আসলে এক্ষেত্রে আমার তো কিছু করার নেই। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে আমার কিছু মনেই হয় না। বাবা-মা আর স্কুলের বন্ধুরা অনেক উৎসাহ দেয় বলেই খেলতে পারছি। এখানে আসার পর জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা অন্যদের সঙ্গে থাকছি, অনুশীলন করছি। অন্যদের মতোই আমি সার্ভ করি, জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলি। আমি তো কোনো সমস্যাই মনে করি না।’

সৌমিককে স্বপ্নের সিঁড়ির প্রথম ধাপে নিয়ে আসতে বড় অবদান আছে জাতীয় দলের কোচ মোহাম্মদ আলীর। সৌমিক সম্পর্কে আলীর মূল্যায়ন, ‘নড়াইলে ওকে দেখে বলেছিলাম লিগে খেলাব। এমনিতে ও খুব ভালো খেলোয়াড়। কনুই দিয়েই সার্ভ করে। পুলিশ প্লাটিনাম ক্লাবের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ওই দলকে জিতিয়েছে। ভালো নার্সিং পেলে ও অনেক ভালো খেলোয়াড় হবে। এবার প্রথম খেলতে এসে ওর সাহস বেড়েছে। ভবিষ্যতে ওকে আমরা স্বাভাবিকদের সঙ্গেই খেলার আরও সুযোগ করে দেব। পাশাপাশি যদি সুযোগ হয় ওকে স্পেশাল অলিম্পিক, প্যারা অলিম্পিকের জন্য তৈরি করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত