কারাবন্দি জঙ্গি, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও যুদ্ধাপরাধীসহ দাগি আসামিদের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সতর্কতার অংশ হিসেবে মন্ত্রণালয় থেকে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে (আইজি প্রিজনস) বন্দির সঙ্গে স্বজনের সাক্ষাৎ ও মোবাইল ফোনে কথা বলার বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিশেষ শ্রেণির বন্দিকে (জঙ্গি, যুদ্ধাপরাধী, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি) ৩০ দিন পর মাত্র একবার একজন আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ রাখা হয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কারা শাখা-১ এই নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনায় বিশেষ শ্রেণির বন্দির মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ সীমিত করার পাশাপাশি আরও কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের সব কারাগারে নিরাপত্তার স্বার্থে যা যা করণীয় সবই করা হচ্ছে। বিশেষ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও যুদ্ধাপরাধীরা যেসব কারাগারে আছে তাদেরকে সতর্কতার সঙ্গে কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। ওইসব বন্দির স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সময়ও বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বিষয়টি নিরাপত্তারই অংশ।’
এ বিষয়ে অতিরিক্ত আইজি (প্রিজনস) কর্নেল মো. আবরার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্দির সাক্ষাৎ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা ইতিমধ্যে দেশের সব কারাগারে কার্যকর করা হয়েছে। পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বন্দির সঙ্গে স্বজনের সাক্ষাতের সুযোগে আরও কড়াকড়ি আরোপ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত আরও একটি নির্দেশনা তৈরির কাজ করছে। এই নির্দেশনায় সাধারণ বন্দির সঙ্গেও মাসে মাত্র একবার এবং বিশেষ শ্রেণির বন্দির সাক্ষাৎ বিষয়েও আরও কড়াকড়ি আরোপিত হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘কভিড সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বন্দির সঙ্গে সাক্ষাতে আরও কড়াকড়ি আরোপ করার বিকল্প নেই। তাই আমরা এটি করতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ কারাগারে একজনও করোনা আক্রান্ত হলে সবাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি গোয়েন্দা তথ্য এসেছে যে, জঙ্গিরা কারাগার থেকে বাইরে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাই জঙ্গিদের ফোনে কথা বলার বিষয়ে অধিকতর কড়াকড়ি আরোপ করে বিশেষ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘কিছু দিন আগে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েক কারা কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে একজন বন্দি তার বান্ধবীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটান। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর একটি তদন্ত কমিটি করা হয় এবং ওই ঘটনায় জড়িতদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কভিড সংক্রমণ এড়ানো ও জঙ্গিদের সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টার বিষয়ের পাশাপাশি ওই ঘটনায় গঠিত চারটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে সাক্ষাতের নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দেশনায় বন্দির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও রেকর্ড করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় থেকে উপসচিব মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ও কারা অধিদপ্তরের কারা মহাপরিদর্শককে দেওয়া নির্দেশনায় বলা হয়, করোনা পরিস্থিতিতে কারা অধিদপ্তর বন্দি ও বন্দির স্বজন ও কারাগারের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কারা অধিদপ্তর কিছু সুপারিশ করে। তাদের সুপারিশ ছিল সাধারণ সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন বন্দির মামলা পরিচালনা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ১৫ দিনে একবার অনুমতি দেওয়া। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ১৫ দিনে একবার অনুমতি দেওয়া যাবে। সাক্ষাৎ কক্ষগুলোর ভেতর এবং বাইরের দিক থেকে প্রোটেকশন দিয়ে কমপক্ষে তিন ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এ ছাড়া সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হলে কারাগারের ভেতরে কভিড সংক্রমণের সুযোগ থেকে যাবে এবং কোনো বন্দি আক্রান্ত হলে পুরো কারাগারের বন্দিরা ঝুঁকিতে পড়বে।
ওই নির্দেশনায় জেএমবি, সন্ত্রাসী, দুর্ধর্ষ বা নৃশংস অপরাধী, শীর্ষ সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একজন ডেপুটি জেলার ও পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সাক্ষাৎপ্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বন্দির সঙ্গে সম্পর্ক নিশ্চিত হয়ে ৩০ দিনে একবার যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
আগে কারা অধিদপ্তরের নির্দেশনা ছিল, ‘একজন বন্দির সঙ্গে সর্বোচ্চ দুজন সাক্ষাৎপ্রার্থী দেখা করতে পারবে।’ মন্ত্রণালয় সেটাকে আরও সীমিত করে একজনকে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ার নির্দেশনা দেয়।
কারা অধিদপ্তর নো মাস্ক নো সার্ভিসের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় কারাবন্দি ও সাক্ষাৎপ্রার্থী সবার জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেয়।
এ ছাড়া সাক্ষাৎ কক্ষের ভেতরে, বাইরে ও আরপি গেটের সামনে সাক্ষাতের আগে বন্দি এবং দর্শনার্থীর হাত এবং পা ক্লোরিন মিশ্রিত পানি বা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা ও আরপি গেটে দর্শনার্থীর শরীরের তাপমাত্রা মেপে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের বেশি হলে বা সর্দি, কাশি জাতীয় লক্ষণ থাকলে প্রবেশ করতে না দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেও একই নির্দেশনা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়া প্রতিবার সাক্ষাতের সময়সীমাও কমানো হয়েছে নতুন নির্দেশনায়। ১৫ মিনিট থেকে কমিয়ে তা ১০ মিনিট করার কথা বলা হয়েছে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বা অবাঞ্ছিত কথা বলার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে সাক্ষাৎ বাতিল করার পাশাপাশি পুরো সাক্ষাতের বিষয় সিসিটিভির মাধ্যমে রেকর্ড রাখার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিশেষ শ্রেণির বন্দিদের মোবাইল ফোনে কথা বলা সংক্রান্ত বিষয়ে ৮টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে ১৫ দিনে একবার জেএমবি, সন্ত্রাসবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীসহ দাগি সন্ত্রাসীদের মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ বিবেচনা করা, কথা বলার সময় একজন ডেপুটি জেলারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বিশেষ বন্দিদের কথা বলার তারিখ, বিস্তারিত তথ্য (জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি) রাখা, বিশেষ বন্দিদের কথা বলার জন্য সপ্তাহের যেকোনো এক বা দুই দিন নির্ধারণ করা এবং বন্দিকে মাত্র একজনের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৫ মিনিট কথা বলার সুযোগ দেওয়া।
