এজেন্ট ব্যাংকিং ধারণার সূত্রপাত ব্রাজিলে হলেও খুব অল্প সময়ের ভেতরে এই ব্যাংকিং ধারণা মেক্সিকো, পেরু, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডাসহ অনেক দেশ এটি অনুসরণ করে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ব্যাংকিংসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই সেবা চালু হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও। ব্যাংকিংসেবা থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিংসেবা দেওয়ার জন্য ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যার ধারাবাহিকতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিংসেবা পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং। ব্যাংক এশিয়া প্রথম এ সেবা চালু করলেও পরবর্তী সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় সর্বপ্রথম ব্যাংক এশিয়া একটি পাইলট প্রকল্প চালুর মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম শুরু করে। কোনো ধরনের বাড়তি চার্জ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। এজেন্ট ব্যাংকিং এত দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যবসাবান্ধব সেবা প্রদান। কম খরচে সব জায়গায় ব্যাংকিংসেবা পৌঁছে দেওয়ার এ উদ্যোগ সফল হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ব্যাংকিংসেবার আওতায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যেক এজেন্টের একটি চলতি হিসাব থাকতে হয়। এই সেবার মাধ্যমে ছোট ছোট অঙ্কের অর্থ জমা ও উত্তোলন করা যায়। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা স্থানীয় মুদ্রায় বিতরণ, ছোট ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং এককালীন জমার কাজও করার সুযোগ আছে এই সেবার দ্বারা। উপযোগ সেবা বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ প্রদান করতেও পারছে এজেন্টরা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ আবেদন, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের নথিপত্রও সংগ্রহ করার সুযোগ আছে এসব এজেন্টের।
ট্রেড লাইসেন্সসহ কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এমআরএ) নিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এনজিও, সমিতি নিবন্ধন আইন-১৮৬০ অনুযায়ী নিবন্ধিত সমিতি, সমবায় সমিতি আইন-২০০১ অনুযায়ী নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত/পরিচালিত সমবায় সমিতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শাখা/ইউনিট অফিস, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত কুরিয়ার ও মেইলিংসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, কোম্পানি আইন-১৯৯৪ অনুযায়ী নিবন্ধিত কোম্পানি, মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরের এজেন্ট, ইনস্যুরেন্স কোম্পানির এজেন্ট, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান, এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনা করার যোগ্যতা রাখে।
এজেন্ট ব্যাংকিং সফটওয়্যার (এবিএস) ব্যবহার দ্বারা এজেন্ট ব্যাংকিংসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা ও সেই ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতে হয়। এর মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি লেনদেন সম্পন্ন করা যাবে। দুই স্তরের নিরাপত্তা (টুএফএ) ব্যবস্থায় লেনদেনগুলোর নিরাপত্তা দেওয়া হয়। এ ব্যবস্থায় লেনদেন বা লেনদেনের অনুরোধ বৈধ করতে একটি বায়োমেট্রিক যন্ত্রে গ্রাহক ও এজেন্ট উভয়ের আঙুলের ছাপ নিতে হয়। লেনদেন সম্পন্ন হলে গ্রাহককে একটি প্রিন্ট করা রিসিট ও মোবাইলে খুদেবার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রথাগত শাখা ব্যাংকিংব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকিংসেবা দেওয়া বেশ কঠিন ও খরচ সাপেক্ষ। কিন্তু এজেন্ট ব্যাংকিংব্যবস্থায় এসব অঞ্চলে বসবাসকারী ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিতদের সেবা দেওয়া সম্ভব। আর তাই বাংলাদেশ ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দ্বারা আর্থিক বিষয়ে স্বল্পশিক্ষিত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে এর সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর ২০২০-ভিত্তিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয় ২৮টি ব্যাংক এই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমতি পেলেও ২৬টি ব্যাংক এ সেবা প্রদান করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পনেরো হাজার নয়শত সাতাত্তর কোটি টাকা। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের সংখ্যা এগারো হাজার নয়শত পঁচিশটি; যাদের আউটলেট রয়েছে পনেরো হাজার নয়শত সাতাত্তরটি। মোট গ্রাহকের বা হিসাবের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছিয়ানব্বই লাখ। যার ভেতরে শুধু মহিলা গ্রাহক বা হিসাব আছে প্রায় চুয়াল্লিশ লাখ। গ্রামীণ হিসাব আছে প্রায় চুরাশি লাখ। ঋণ বিতরণ হয়েছে প্রায় আঠারো হাজার তিরানব্বই কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত এজেন্টদের মাধ্যমে প্রায় আটচল্লিশ হাজার আটশত ছয় কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় দেশে এসেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিংসেবা শুধু শহরে নয়, প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে এবং দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা যত্রতত্র ও যাকে-তাকে দিয়ে করানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। ব্যাংকগুলো বিভিন্ন এলাকায় মোবাইলের ফ্ল্যাক্সি লোড দোকানদার, বিকাশের দোকানদার, মুদিখানার দোকানদার, ওষুধের দোকানদারসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিংসেবা চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংক এনজিওর আদলে ঋণ বিতরণ করছে। কোনো কোনো ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংক বিকাশের আদলে টাকা পাঠানোকেই প্রধান কাজ হিসেবে মনে করছে। কোনো কোনো এজেন্ট বিল কালেকশন করছে এবং সেই টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে সটকে পড়ার ঘটনাও আছে। ফলে গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নানা ঝামেলা ও ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই চলছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। পত্রিকার মাধ্যমে এই তথ্য ইতিমধ্যেই আমাদের নজরে এসেছে।
তবে ইদানীং উপশাখা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ঝুঁকি উপশাখা দিয়ে দূর করা সম্ভব, কেননা উপশাখা ওই নির্দিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত হয় বিধায় ঝুঁকি অনেকাংশে কম থাকে।
ব্যাংক একটা দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। দিন দিন এই খাতের প্রতিযোগিতা বাড়ছে, ফলে নতুন নতুন গ্রাহক ও বাজার তৈরিতে ব্যাংকের রিসার্চ বিভাগকে আরও ভাবতে হবে কী করে গ্রাহকসেবা সহজীকরণ করা যায়। প্রায় সব ব্যাংকের সুদের হার বর্তমানে একই রকম। তাই সেসব গ্রাহককে টার্গেট করে এজেন্ট ব্যাংকিং বা উপশাখাকে কীভাবে আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। সরকারি ব্যাংকের ভেতরে অগ্রণী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করলেও অন্য সরকারি ব্যাংক এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। যেহেতু বেসরকারি ব্যাংকের সেবা প্রদান থেকে মুনাফা অর্জনে নজরদারি বেশি থাকে, তাই সরকারি ব্যাংকগুলোকেই হাল ধরতে হবে, যাতে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ এ সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।
লেখক ব্যাংকার ও গবেষক
