মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে বায়ুম-লে তাপ ধারণকারী গ্রিন হাউজ গ্যাসের যথেচ্ছ উদগিরণ ঘটছে। যার ফলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা। এর ফলে ক্রমেই মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গতকাল শনিবার ঢাকায় সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) উদ্যোগে ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রণয়ন : প্রেক্ষাপট এবং প্রত্যাশা’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয় এ তথ্য।
সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বায়ুম-লে তাপ বৃদ্ধিকারী এসব গ্রিন হাউজ গ্যাসের উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে বৈশি^ক গড় উষ্ণতা ইতিমধ্যে শিল্প-বিপ্লবপূর্ব পর্যায় থেকে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়েছে। বৈশি^ক গড় উষ্ণতা বৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ এবং দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। কার্বন উদগিরণ কমানোর মাধ্যমে বৈশি^ক উষ্ণায়নকে একটি সহনীয় মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখাকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হিসেবে বিবেচনা করে ইউএনএফসি সুস্পষ্টভাবেই সর্বাগ্রে কার্বন উদগিরণ হ্রাসের বিষয়ে রাষ্ট্রসমূহকে তাগিদ দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০১৫ সালে গৃহীত প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের প্রাক্কালে রাষ্ট্রসমূহ তাদের আইএনডিসির মাধ্যমে কার্বন উদগিরণ হ্রাসের যে অবদান নির্ধারণ করেছিল, তা কোনোভাবেই প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে সীমাবদ্ধ রাখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রগুলো যদি তাদের আইএনডিসি অনুসারে কার্বন উদগিরণ হ্রাসের অবদান সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে, তবুও পৃথিবীর উষ্ণতা শিল্প-বিপ্লবপূর্ব পর্যায় হতে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বাড়তে পারে; যা পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
শামসুদ্দোহা বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম একটি জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাঁচতে এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে এ বিষয়টি নিয়ে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশকে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য, ব্যাখ্যাযোগ্য, কার্বন উদগিরণ হ্রাসকরণকে হিসাব করা যায় এমন একটি পুনর্মূল্যায়িত এনডিসি তৈরি করতে হবে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ডা. নুরুল কাদের বলেন, এনডিসি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ অনেক জরুরি। সবাইকে নিয়ে এ রকম একটি জাতীয় দলিল তৈরি করা দরকার। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে আমরাও রক্ষা পাব না এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমদের জিডিপির জন্যও অনেক ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে আনবে।
বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক ডা. এম আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা মূলত কার্বন উদগিরণের যে কথাটি বলছি, সেই কার্বন কিন্তু আসলে বেশির ভাগই এনার্জি সেক্টর থেকে আসে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা দেশ উন্নত রাষ্ট্র হোক, তা জনগণও চায়, কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র হতে হলে কিছু নিয়মনীতিও মানতে হবে। আমাদের টেকসই উন্নয়নের দিকে যেতে হবে, সে বিষয়টিও বুঝতে হবে। এনডিসি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটিতে সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক, বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি কামরুল ইসলাম, জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ উৎপল দত্ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের অপর পরিচালক মির্জা শওকত আলী, পিকেএসএফের জলবায়ু পরিবর্তন ইউনিটের পরিচালক ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা।
