করোনায় খাদের কিনারে পোলট্রি খাত

আরোপিত কর-কাঁচামালের বাড়তি দর গলার কাঁটা

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২১, ১১:৩৩ পিএম

মহামারী কভিড-১৯ এর প্রভাবে দেশীয় পোলট্রি শিল্প দাঁড়িয়েছিল খাদের কিনারে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হওয়ার পর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। কিন্তু বিদ্যমান বাজেটে আরোপিত নানা ধরনের কর ও বিশ^বাজারে ফিড তৈরির কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পোলট্রি সেক্টরের ঘুরে দাঁড়ানোর পথে গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যমান সুবিধাদি বজায় রেখে পোলট্রি শিল্পকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, করোনার এই সময়ে পোলট্রি শিল্পে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাভাবিক গতি ফিরে এলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ফিড রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ ও ২০২৫ সাল নাগাদ পোলট্রি মাংস, ডিম ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি মার্কেটে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কর ও শুল্ক সুবিধার ক্ষেত্রে ছাড় না দিলে সম্ভব হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা কারণে এখন বাজারে পোলট্রি মুরগির দাম চড়া। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো ফিডের বাড়তি দাম। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য পোলট্রি পালনের খরচ অনেক বেশি পড়ছে। এজন্য অনেক উদ্যোক্তা খামারে বাচ্চা ওঠাতে সাহস পাচ্ছে না। এর ফলে সহসাই মুরগির দাম কমার সম্ভাবনা নেই। তবে মানুষের জন্য মাংস ও ডিম স্বাভাবিক করতে চাইলে কর অব্যাহতি দেওয়া জরুরি।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) তথ্য অনুসারে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে ফিড তৈরির অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে সয়াবিন মিলের দাম ৬২ শতাংশ, রেপসিড অয়েল কেক ৫৫ শতাংশ, রাইস পলিস ৬৫ শতাংশ, ভুট্টা ৩০ শতাংশ, ডিওআরবি’র দর ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বেড়েছে উৎপাদন খরচ কিন্তু প্রান্তিক খামারিদের দুর্দশার কথা বিবেচনায় নিয়ে ফিড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ফিডের দাম সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি করতে পারছে না। ফলে প্রায় প্রতিটি ফিড মিলই লোকসান গুনছে। যদিও কভিড-১৯ এর কারণে সারা বিশ্বে শস্য জাতীয় ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ায় গত ৭ বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন মজুদ দিয়ে এ বছরের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য অস্থিরতার কারণে রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রয়োজনীয় কাঁচামাল রপ্তানির পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া কাঁচামাল পরিবহনে কন্টেইনার ও জাহাজভাড়া প্রায় ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ফিআবের সভাপতি এহতেশাম বি. শাহজাহান বলেন, পোলট্রি শিল্পের বর্তমান অবস্থা এবং আগামীদিনের চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবিত সুবিধাদি প্রদান করা জরুরি।

পোলট্রি শিল্পে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার জানিয়ে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ খাতে স্বাভাবিক গতি ফিরে এলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে ফিড রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ ও ২০২৫ সাল নাগাদ পোলট্রি মাংস, ডিম ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের রপ্তানি মার্কেটে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কর ও শুল্ক সুবিধার ক্ষেত্রে ছাড় না দিলে সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে সরকারের কাছে পোলট্রি শিল্পের বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের দেওয়া বিদ্যমান সুবিধাগুলো (অগ্র্রিম কর এটি, এআইটি, কর ও শুল্ক, ভ্যাট) ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখা অন্যতম। এছাড়া স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধানটি রহিত করা, পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার দাবি জানাই। তিনি জানান, আগে করপোরেট ট্যাক্সের হার ছিল শূন্য শতাংশ। ২০১১ সালে তা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ, ২০১৪-১৫ সালে তা কমিয়ে ৩ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে তা আবারও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়।

একই ধরনের দাবি জানিয়ে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) সভাপতি  মো, রকিবুর রহমান (টুটুল) বলেন, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অধিক মুনাফা লাভের আশায় ব্রাজিল থেকে হিমায়িত ব্রয়লার মুরগির মাংস আমদানি করছেন। অনেক সময় আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমেও হিমায়িত ব্রয়লার মুরগি আমদানির অপচেষ্টা হচ্ছে। চারটি এইচএস কোডের আওতায় (০২০৭.১২.১০, ০২০৭.১২.৯০, ০২০৭.১৪.১০, ০২০৭.১৪.৯০) বাংলাদেশে হিমায়িত ব্রয়লার মুরগির মাংস আমদানি করা হয়ে থাকে। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে হিমায়িত মুরগির মাংস আমদানিতে ২৫ শতাংশ কাস্টমস ডিডটি, ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি, ৪৫ শতাংশ সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও এআইটি এবং ৫ শতাংশ এটি আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত