করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে মারা যাচ্ছেন বিএনপির একের পর এক জ্যেষ্ঠ নেতা। বিশেষ করে সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দলটির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুর পর বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘মওদুদ আহমদের মৃত্যুতে দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’ এ বিষয়ে বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে একের পর এক বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মৃত্যুতে হঠাৎ মনে হচ্ছে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে দৃশ্যমান হচ্ছে মরুভূমি। তবে আশার কথা হচ্ছে মরুভূমির পরে থাকে মরীচিকা এবং মরীচিকার পরে থাকে মরূদ্যান। স্থায়ী কমিটির বাইরে দলে অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। তাদের দিয়ে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করলে ঠিক হয়ে যাবে।’
স্থায়ী কমিটিতে আসার মতো যোগ্য নেতাদের নাম জানতে চাইলে দলটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মওদুদ আহমদের মৃত্যুর পর দলের স্থায়ী কমিটি যোগ্য নেতাদের দিয়ে পূরণ করা দরকার। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ার মতো অনেক নেতা রয়েছেন। এদের মধ্যে বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল্লাহ আল নোমান, বরকতউল্লা বুলু, মো. শাহজাহান, শাহজাহান ওমর, শামসুজ্জামান দুদু, আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, শওকত মাহমুদ। এ ছাড়া বিশেষ সম্পাদক রয়েছেন ড. আসাদুজ্জামান রিপন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন প্রমুখ।
তারা আরও বলেন, ‘বিএনপি এখন বছরব্যাপী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালন করছে। আমরা নিজেদেরকে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের দল বলি। এ অবস্থায় বিএনপিতে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা রয়েছেন। তাদেরকে স্থায়ী কমিটিতে আনা হলে মুখের কথার সঙ্গে কাজের মিল আসবে। জনগণের সামনে বিএনপি তথা স্থায়ী কমিটির ইমেজ বাড়বে।’
বিএনপির ওই ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘এক সময় কে এম ওবায়দুর রহমান, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম, মান্নান ভূঁইয়া, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মতো জাঁদরেল নেতারা ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য। তখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী এই ফোরাম ভাইব্রেন্ট ছিল। তবে এখন অনেকটা কমেছে। কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না। সময়ের ব্যবধানে সবকিছু পূরণ হয়ে যায়।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মওদুদ আহমদ উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছিল অনেক কিছুতে পূর্ণ। তিনি চলে যাওয়ায় বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বাস্তবতা হলো কারও জন্য কোনো কিছু থেমে থাকে না। সারা দেশে দলের লাখো-কোটি নেতা-কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। এখন যোগ্যদের স্থায়ী কমিটিতে আনা হলে অনেকটা ক্ষতিপূরণ পুষিয়ে নেওয়া যাবে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নবীন সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মওদুদ আহমদ স্থায়ী কমিটিতে থাকায় স্থায়ী কমিটির যে জৌলুস, উইজডম ছিল তা অনেকটা কমবে। তার না থাকা পূরণ হওয়ার নয়। তবে এটাও সত্য, কেউই অত্যাবশ্যক নয়। কারও জন্য দল থেমে থাকবে না। দল চলবে দলের গঠনতন্ত্র মেনে আদর্শের ভিত্তিতে।’
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের তালিকা ঘোষণা করা হয়। পদাধিকার বলে কমিটির সদস্য দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তখন মোট ১৭টি পদের মধ্যে দুটি পদ শূন্য রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে এম তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা যান। তিনজন মারা গেলে পদ শূন্য হয় পাঁচটি। এরপর ১৯ জুন ২০১৯ বেগম সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। নতুন দুজন যুক্ত হওয়ায় দলটির স্থায়ী কমিটিতে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ জন।
মওদুদ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় গত ১৩ মার্চ শনিবার বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য যথাক্রমে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এ ছাড়া অসুস্থতার কারণে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া খুব কমই বৈঠকে অংশ নেন। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান এখন আর সম্পৃক্ত নন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে। সালাহউদ্দিন আহমেদ রয়েছেন ভারতে। এ ছাড়া এম তরিকুল ইসলাম, এম কে আনোয়ার ও ব্রি. জে. (অব.) আ স ম হান্নান শাহ মৃত্যুবরণ করেছেন।
