অসমন্বয়যোগ্য অগ্রিম আয়কর ও সরবরাহ কর

প্রত্যাহার চান সিমেন্টশিল্প মালিকরা

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ১২:৪২ এএম

এক বছর ধরে করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারীর প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের মূল কাঁচামাল ক্লিংকারের অস্বাভাবিক ও অব্যাহত মূল্য বৃদ্ধিতে দেশের সিমেন্ট খাতে নেমে এসেছে চরম দুর্দিন। এমন অবস্থায় অস্তিত্ব সংকটের মুখে থাকা দেশের সিমেন্টশিল্পকে রক্ষা করতে আসন্ন বাজেটে খাতটিতে বিদ্যমান অসমন্বয়যোগ্য অগ্রিম আয়কর এবং সরবরাহের ওপর কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চেয়েছে বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)।

এর বাইরে সিমেন্ট উৎপাদনে ব্যবহৃত মৌলিক কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানিতে প্রতি মেট্রিক টন ৫০০ টাকা নির্ধারিত শুল্কের পরিবর্তে ৫ শতাংশ হারে নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে বিসিএমএ। এছাড়াও সমন্বিত অগ্রিম আয়কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমাকৃত প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা দ্রুত ফেরত বা ছাড় করার বিষয়েও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হস্তক্ষেপ কামনা করেন সংগঠনের নেতারা। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে এক বাজেট পূর্ববর্তী সভায় বিসিএমএ’র প্রেসিডেন্ট মো. আলমগীর কবির সংগঠনের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরেন।

আলমগীর কবির বলেন, সিমেন্ট একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের সিমেন্টের ব্যবহার অনেক কম থাকায় প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এই খাতে, অথচ গুরুত্ব একেবারেই কম। আমাদের দেশের রাজস্ব আহরণ যারা করে থাকেন, তাদের বেশিরভাগই চেষ্টা করেন সোর্স বা উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ করতে, যেন মাঠপর্যায়ে যেতে না হয়। তাই পরিধি না বাড়িয়ে উৎসে কর আদায় করার একটি অলিখিত নিয়ম চলছে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে এ পরিধি বাড়াতেই হবে, নয়তো সোর্স বা উৎস থেকে রাজস্ব আদায় করা হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই টার্গেট ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেমনটি ঘটেছে এ সিমেন্ট খাতে।

তিনি বলেন, সিমেন্টের সব কাঁচামালই আমদানিনির্ভর, তাই আমদানি শুল্ক, মূসক ও কর সবই কর্তন হয় আমদানি পর্যায়ে। আমরা বারবার অনুরোধ করে আসছি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ন্যূনতম মুনাফা বেঁধে দিতে পারে না। অথচ এ খাতে ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যা সমন্বয় বা ফেরতযোগ্য নয়, অর্থাৎ চূড়ান্ত দায়। এটি গণতান্ত্রিক পন্থায় শুধু ভুল বলব না, অন্যায়ও বটে।

তিনি আরও বলেন, এ খাতের অন্যতম মূল কাঁচামাল ক্লিংকারের শুল্কায়ন করা হয় ৫০০ টাকা প্রতি টনে যা প্রায় ১১ শতাংশ। অথচ ইন্টারমিডিয়েট কাঁচামাল হিসেবে এটা কোনোভাবেই তা ৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। বিগত কয়েক বছরে এ সেক্টরে অগ্রিম আয়কর হিসেবে সমন্বয়যোগ্য বা ফেরতযোগ্য যে অর্থ এনবিআরের নিকট জমা রয়েছে তা আমরা ফেরত পাচ্ছি না। বর্তমানে পুঞ্জিভূত টাকার পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে পুঁজি সংকটের এটি অন্যতম কারণ।

অথচ আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৪৬ ধারা অনুযায়ী, করদাতার পরিশোধিত টাকা পরিশোধযোগ্য করের চেয়ে বেশি হলে তা ফেরত পাওয়ার যোগ্য। ফেরত দিতে দেরি হলে সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ফেরত দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, এ ফেরতযোগ্য টাকাগুলো বছরের পর বছর পরে থাকে এবং বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও তা নগদে ফেরত পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত তাদের কর হার অত্যন্ত বেশি। তার ওপর ব্যক্তির লভ্যাংশ থেকে পুনরায় কর কেটে নেওয়া হয় অর্থাৎ একই খাত থেকে মোটা অঙ্কের দ্বৈত কর থাকার কারণে উদ্যোক্তারা পুঁজি সংকটে ভোগেন।

শিল্প মালিকদের মতে, বাংলাদেশে সিমেন্ট উৎপাদনের সব কাঁচামাল বিদেশনির্ভর। সুতরাং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যে তারতম্য হলে তার প্রভাব দেশে পড়ে। গত দুই মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্টের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ মূল্য বৃদ্ধির একটি বড় কারণ পরিবহন বা জাহাজ ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত ডিসেম্বরে প্রতি টন পরিবহন ব্যয় ছিল ১১ ডলার, যা বর্তমান সময়ে চলছে ২৩ ডলার, এ অবস্থা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এখনই কোনো অনুমান করা যাচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত