আমি লেখক হতে চাই না, কথক হতে চাই: মেহেদী উল্লাহ

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২১, ০৬:৫২ পিএম

লেখক মেহেদী উল্লাহর নতুন গল্পের বই ‘আগিলা যুগের আয়ু’। বইটি প্রকাশ করেছে বৈতরণী। বইমেলা-২০২১ এ চৈতন্যের স্টলে বইটি পাওয়া যাচেছ। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৮, এর মূল্য ২০০ টাকা।

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় চৈতন্যের ৩৩২-৩৩৩ নাম্বার স্টল থেকে সংগ্রহ করুন অথবা অনলাইনে বৈতরণীর ফেসবুক পেজ থেকে অর্ডার করুন। ফোন করতে পারেন 01717 589274 নাম্বারে।

বইটি নিয়ে লেখক কথা বলেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র’র সঙ্গে।

আমি ‘আগিলা যুগের আয়ু’ বইটা পিডিএফ থেকে পড়েছি, ছয়টা গল্প আছে। ছয়টা গল্প একটু ভিন্ন রকম আসলে, আমরা যেভাবে গল্প পড়ে অভ্যস্ত সে রকম না। ‘আগিলা যুগের আয়ু’র মধ্যে যে মেসেজ আছে সেই মেসেজটা কী, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করব, আলোচনাটা মূলত বই নিয়ে। শুরুতে বইয়ের নামের কারণটা জানতে চাই, মানে আগিলা যুগের আয়ু কেন?

মেহেদী উল্লাহ: ধন্যবাদ শুভ্র ভাই। আসলে আমি আগিলা যুগের আয়ু লেখার আগ পর্যন্ত ‘অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগ’ যখন লেখি তখন গল্পের যে বোঝাপড়া বা তাতে বসবাস করছিলাম, ‘আগিলা যুগের আয়ু’— মাঝখানে এক বছর গ্যাপ হলো, তারপর আবার গল্প লেখা শুরু হলো। ‘আগিলা যুগের আয়ু’ লেখার সময় হঠাৎ যেন মনে হলো বর্তমান জীবন-যাপন দেখে, আমাদের এই শহর, এই বাস্তবতা, আর্থসামাজিক পেক্ষাপট, এই রাজনীতি, এই বাংলাদেশ, এই পৃথিবী, কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে যে আগিলা যুগে একটা বরকত আছে, বরকতময় ব্যাপার আছে। যেটা এই সময়ে নেই এবং আমরা মোটামুটি কম বেশি বিশ্বাস করে ফেলি মনে মনে আগিলা যুগটা ভালো ছিল, এখন সেই আগিলা যুগে তো ফেরত যাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা শৈশবে আগিলা যুগের কিছু কিছু নিশানা বা ইশারা দেখে দেখে বড় হয়েছি। লেখক আসলে গল্পের মধ্যে কী করেন, তার যে একটা অতীতচারিতা আছে, বর্তমানে কী কাজে লাগে বা কীভাবে অনুধাবনগুলোকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করবে সেগুলো গল্পকার, লেখক দেখার চেষ্টা করেন। এবং বর্তমান সময়ে আরো কিছু প্রেক্ষাপট দেখা যায় যে বর্তমানে এতো বেশি দেখার যুগ,  ইউটিউবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছি; আমরা আগেও দেখতাম কিন্তু সেই দেখার সাথে এই দেখার পার্থক্য হচ্ছে, যখন সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচুর দেখা এখন তৈরি হচ্ছে, এই দেখাগুলো কিন্তু এক ধরনের শিল্পীত দেখা, কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তিগত ব্লগ বা যে কেউ তৈরি করে থাকুক না কেন, এই দেখাগুলো শিল্পীর চোখে দেখা, কিন্তু আগিলা যুগে সেটা হতো না। তখন এত শিল্পীত ব্যাপার ছিল না। সুতরাং সমাজকে সরাসরি দেখা হতো, সে কারণে সেই সমাজে একধরনের সারল্য থাক, সেই সারল্যগুলো এত বেশি বেশি দেখার ভীড়ে আসলে হারিয়ে গেছে। এবং সেই জীবন-যাপন এই সময়ের সাথে মিলিয়ে এই গল্পগুলো লেখা।

বুঝতে পারছি, আমি তো পড়ছি, মূল বিষয়টা কিন্তু আধুনিক যুগের সাথে ট্রাডিশন আর মর্ডানের যে একটা দ্বন্দ্ব, বোঝা-পড়া, নিতে পারা-না নিতে পারা, মাঝে মাঝে পলিটিক্যাল ব্যাপারও আছে ক্রাইসিসগুলো মোস্টলি পলিটিক্যাল ক্রাইসিস, নানাভাবে দেখানো হয়েছে, সরাসরি না আরকি। পুরো বইয়ে আমি যেটা খেয়ালরেছি যে, গল্প বলার যে ভঙ্গি লেখক সরাসরি বছে আরকি গল্পগুলো লেখক সরাসরি বলছেন। লেখক হাসছে, লেখক নিজের সাথেই নিজে তর্ক করছেন-এই আলাদা একটি ভঙ্গি এটা কীভাবে আসলো?

মেহেদী উল্লাহ: শুভ্র ভাই, মোটামুটি সবগুলো গল্পেই লেখকের বয়ানে বলা। খুবই সচেতনভাবে করা। আপনি ধরেছেন বিষয়টি, খুবই খুশি হয়েছি। আমি অনেকদিন ধরে বাংলাদেশের গল্প এবং আমার নিজের গল্পে কীভাবে পরিবর্তন আনা যায় ভাবছিলাম। আসলে ভাবতে ভাবতে পাচ্ছিলাম না যে কোন স্থান থেকে মুভটা করব। এখন আমাদের গল্পের যে ঐতিহ্য, বিশেষ করে মৌখিক (ভারবাল) যে গল্পের ঐতিহ্য, ঠাকুরমার ঝুলি। আমাদের আছে কিচ্ছা। কিন্তু ওই কিচ্ছা নিয়ে কোনোদিন কথা হয় না। দীনেশচন্দ্র সেন কিচ্ছা নিয়ে বলেননি। ঠাকুরমার ঝুলি নামটা আমাদের লোক সমাজ গ্রহণ করেনি যে এগুলো তাদের গল্প। আবার সেগুলো অনেকে আবার লিখছেন কোনো বোঝা-পড়া বা আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছাড়াই। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র সেগুলোকে এক ধরনের এডিট করে ওই সময়ের স্বদেশী সাহিত্য বলে চালিয়েছেন। সেটার নামকরণ, প্রবণতা, গল্পগুলো হয়তো তখনকার বাস্তবতা, মানুষের গল্প, কিন্তু সেটায় যখন ঠাকুরমার ঝুলি নাম দেওয়া হয়-তা আসলে এই পূর্ব বাংলার কতটুকু থাকে সেটা একটা বিষয়।  ঠাকুরমার ঝুলি পূর্ব বাংলায় চালাতে পারব কিনা সচেতনভাবে আমরা? এখানে তো ঠাকুরমার ঝুলি চেনে না, চেনে হলো কিচ্ছা। যেমন, নেত্রকোনায় একটি ফর্ম আমরা পেয়েছি ‘আছাব্বোয়া গল্প’ (আষাঢ়ে গল্প)। এটা নিয়ে আমি গবেষণা করছি, এতো সুন্দরভাবে গল্প বলা, এটা অভ্যাস। আমরা কী করি! আমরা লেখকরা না লিখে থাকতে পারি না, আমাদেরও অভ্যাস। আমি যে লেখক, গল্প লেখা দীর্ঘদিনের চর্চা। সে হয়তো গল্প বলে আমি লিখি। কিন্তু আমার মাঝে যেটা আছে সেটা গল্প বলার উওরাধিকার। মানুষ গল্প লেখার চেয়ে গল্প বেশি বলে। লেখা বিষয়টা অনেক স্থানে দেখেছি চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়, লেখাটা এভাবে পাঠকের সাথে কানেক্ট করে না। আমি চিন্তা করছি, এই বইয়ে এমন একটি ফর্ম আমি সৃষ্টি করব, আমাদের এখানকার মানুষ যে স্টাইলে, যে ন্যারাশনে, যে ফর্মে গল্পটা বলে সেটা। রেলওয়ে স্টেশনে, চায়ের দোকানে, আত্মীয়র সাথে ফোনের মধ্যে, লাইভ চ্যাটের মধ্যে- একজন আরেকজনকে যে টোনের মধ্যে গল্পটা শোনায়, সেটার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। আমাদের গল্পগুলো অনেক বেশি বাস্তবতা দিতে গিয়ে বাস্তবতা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে গেছে।

আমরা যদি আগের বাংলা সাহিত্য দেখি, হুতুমপ্যাঁচার নকশা এ ফর্মে বলা, আলালের ঘরের দুলাল লেখক নিজেই বলে যাচ্ছে, হাসছে, বটতলা সাহিত্য বলতে আমরা টুকটাক যা পড়েছি, পুথিগুলো সেরকম।

মেহেদী উল্লাহ: আমার একটা পলিটিক্যাল সচেতন প্রয়াস, আমি চেয়েছি যে এখানকার গল্প বলতে হবে, শোনাতে হবে। আশা করি, পড়লে বুঝা যাবে কতটুকু শোনাতে পেরেছি আমরা। গল্পের ফর্মটা এখন থেকে এরকমই হবে আমার।

কিন্তু একটা সমস্যা হলো ক্যারেক্টারের মূল্যটা থাকে না, লেখকই সর্বস্ব, লেখকই সবকিছু। ক্যারেক্টারের বিল্ডাপ থাকে না। যেমন, রিয়ার যে কাহিনি একটা আছে, রিয়া লেখকের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।

মেহেদী উল্লাহ: বুঝতে পারছি গল্পের ন্যারেশন হয়তো মিস হয়ে গেছে। গল্প কিন্তু রিয়ার নিজের গল্প। এ গল্পে লেখক বলতে কিছু নাই, লেখক কল্পনা মাত্র। রিয়া একা একা চিন্তার মধ্যে পড়ে যায়, সে নিজেই ইমাজিন করে লেখক চরিত্রটা সৃষ্টি করে।

সেটা বুঝেছি, কিন্তু গল্পটা দেখছি লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা। লেখক গল্প নিয়ে যখন সংকটে পড়ে, রিয়া গল্পটা পড়তে গিয়ে সেটা মনে হয়েছে। লেখক যখন গল্প লিখতে শুরু করে তখন ক্যারেক্টারগুলো ঝামেলা তৈরি করছে, সে মনে করছে সকালে এটা লিখে রাখবে আবার রাতে মনে হয়েছে এটা লেখাটা ঠিক হচ্ছে না। এরকম লেখার সময়ে যে ক্রাইসিস সেটা আছে বোধ হয় গল্পটাতে।

মেহেদী উল্লাহ: সবগুলো হয়তো এমন থাকবে না, তার কারণ হচ্ছে লেখক বলতে তো কিছু না, গল্পগুলো উওম পুরুষে বলা হয়। সেটাতে এ জন্যই এই বইতে লেখক বলছেন, কিন্তু লেখক চরিত্র না বা উওম পুরুষে বর্ণিত না।

আমি যেটা বলছিলাম যে এই ফর্মে ক্যারেক্টার লেখকের সাথে মিশে যায়। ক্যারেক্টার তৈরি হয় না, এমন সংকট আছে মনে হয়।

মেহেদী উল্লাহ: তাহলে আপনি ধরেন, যে লোকটা বিভিন্ন স্থানে বসে গল্প বলে তার গল্পের মধ্যে ক্যারেক্টার থাকে না?

সাহিত্যে আমরা যেটা চাই মূলত সাহিত্য ক্যারেক্টার সৃষ্টি করে কিন্তু ওরাল লিটারেচারে সেই অর্থে ক্যারেক্টারের প্রতি মনোযোগ থাকে না।

মেহেদী উল্লাহ: কেন আমাদের ধরেন এই যে মৌখিক সাহিত্য মহাভারত, রামায়ন সেগুলো থেকে সবচেয়ে বড় চরিত্রগুলো পাওয়া যায়।

সেগুলো তো লেখার পর আমরা পেয়েছি। কিন্তু সেগুলো কাব্যিক ফর্মে ছিল। লেখা ও বলা দুইটার মধ্যে পার্থক্য হলো যখন আমি লেখছি তখন এক ধরনের কনসেন্ট্রেশন তৈরি হ লেখার প্রতি। যখন বলছি আশ-পাশ থেকে শব্দ আসছে, অনেক কিছুর সাথেই বলছি যখন লিখছি তখন কিছুই দেখছি না। লিখতে গিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। তিনি অনেক এথিক্যাল, পূর্ব ধারণার মধ্যে পড়ে যান। নীতি-নৈতিকতা, পূর্বানুমান, নানারকম বিশ্বাস, সেগুলোর একটা চাপ পড়ে যায় লেখালেখির মধ্যে। বলার ক্ষেত্রে হঠাৎ একটা মাথায় আসলো, বলে ফেললাম। ওরাল লিটারেচার আর লেখার যে পার্থক্যকটা বুঝাতে চাইছি আরকি। ক্যারেক্টারের কনসেন্ট্রেশন লেখকের যেভাবে থাকে, ওরাল লিটারেচারে সেভাবে থাকে না মনে হয়।

মেহেদী উল্লাহ: আপনি দেখেন যে আমাদের এখানে ওরাল লিটারেচরের যে ধরনের ট্রেন্ড আছে, আমার মনে হয় কিচ্ছা শুনলে যে ধরনের চরিত্রের গাঁথুনী দরকার, একজন নানি-দাদি যখন বাচ্চাদের গল্প শোনান তখন এই গল্প অনেক মানুষ বলছে, বলতে বলতে চরিত্রের পরিবর্তন আসছে। নতুন চরিত্র যোগ হচ্ছে, পুরাতন চরিত্র বাদ পড়ে যাচ্ছে। পুরো বিষয়টা হলো, চরিত্র ফিক্সড না, সবচেয়ে বড় সুযোগ হচ্ছে পাঠক নিজেও চরিত্র সৃষ্টি করতে পারবে। পাঠক যখন গল্পটা অন্য কাউকে শোনাবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, ‘আগিলা যুগের আয়ু’ বইতে আমি লেখক হতে চাই না, কথক হতে চাই। বাংলা গল্প যেভাবে বলে সেই উওরাধিকারের সঙ্গে অবশ্যই নিরীক্ষাধর্মী এবং এই গল্পে কখনো লেখক হতে চাইনি, কথক হতে চেয়েছি। সেই ফর্মটা দিয়ে কীভাবে উপন্যাসে যাওয়া যায় সেটাই চাইব। লেখার বাস্তবতা এবং বলার বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্যটুকু, সেটা এই বই।

বুঝতে পারছি, আমাদের এখানে যে ক্যারেক্টার আছে, যেমন, ডালিমকুমার,পঙ্খিরাজ ঘোড়া, সুখ পাখি-অনেক রকম গল্প আমরা শুনে আসছি নানা-নানি, দাদা-দাদি তাদের কাছ থেকে।

মেহেদী উল্লাহ: উপেন্দ্রকিশোর রায়ের টুনটুনির বই এটা পুরোই বলা গল্প, জসিম উদদীনের হাসির গল্প যা মানুষ মানুষকে বলে।

এই সব গল্পে তো শেষ পর্যন্ত একটা মেসেজ থাকে এথিক্যাল, সামাজিক মেসেজ।

মেহেদী উল্লাহ: যেমন ইশপের গল্পে থাকে,লোক গল্পে থাকে।

কিন্তু লেখালেখি বিপ্লবাত্মক কেননা আমরা লিখে সমাজ পরিবর্তন করতে চাই, গণ্ডগোল তৈরি করতে চাই, লেখালেখি করে একটা প্রশ্ন তৈরি করতে চাই।

মেহেদী উল্লাহ: আমি লেখালেখি করে সমাজ পরিবর্তন করতে চাই না, এর আগে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছি। লেখালেখি করে আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে চাই। অর্থাৎ আমি নিজে সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চাই।

সমাজ পরিবর্তনের কথা আমিলি নাই যেমন হুমায়ূন আহমেদ সমাজ পরিবর্তন করতে চান নাই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সমাজ পরিবর্তন করতে চেয়েছে। যেটা লেখা হইলো সেটার তো একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় সমাজে, আমার মনে হলো, লেখার সাথে সমাজের দ্বন্দ্ব ,সমাজের এথিক্স জড়িত।

মেহেদী উল্লাহ: এটাতে দ্বান্দ্বিক অবস্থা কী রকম হবে ভাবছি। এ গল্প এলিটের রুচির সাথে কতটুকু যায়। কারণ আমাদের এখানে অভিজাত কালচারের ঘরনার মানুষ তারা এই গল্পটা নিতে পারবে না, সাংস্কৃতিক দূরত্ব আমাদের এখানে তৈরি হয়েছে। ধরেন আমরা অভিজাত শ্রেণির স্টাইলে কথা বলি, সেভাবে বুঝতে চাই আমরা। আমরা আমাদের সমাজের ৮০ ভাগ মানুষকে বুঝি না। এ জন্য সাহিত্যের এ দূরাবস্থা। ধরেন, ঢাকা শহরের যে মঞ্চ নাটকগুলো হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চল, যারা গ্রামে বসবাস করে এই শ্রেণি থেকে দূরে। গ্রাম পরিবর্তন হয়ে গেছে অবকাঠামোগত দিক দিয়ে, কিন্তু গ্রামের মানুষ কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে? এবং শহরের মানুষ কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে? দুইটা মানুষের সাংস্কৃতিক দূরত্ব থাকার জন্যই সমাজের বাজে অবস্থা হচ্ছে। ধরেন আমাদের ওয়াজ-নসিয়তে একধরনের উগ্রতা খেয়াল করছি। অভিজাত শ্রেণি ঐ বয়ানটাকে ঢাকায় বসে একধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছে,  তাদের ওয়ার্ল্ডে তাদের সমস্যা হচ্ছে না। তারা তাদের ওয়াজ-নসিয়ত শুনছে, তারা উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে, হে হে করছে। ওয়াজগুলো অধিকাংশ জাজমেন্টাল এবং কেন জাজমেন্টাল? তারা দেখেন যে অভিজাত শ্রেণির কালচারের বিরুদ্ধে তারা পেশ করছে প্রতিনিয়ত, তাদের কিন্তু সমস্যা হচ্ছে না। আমরা যারা অভিজাত শ্রেণির অংশ, নিজেকে মনে করি রুচিশীল সাহিত্যিক, তারা কিন্তু তাদের কালচারকে বুঝতে পারছি না। আমার মনে হয় একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে, যেটা এখন করতে হবে, আমাদের দুইটা সাংস্কৃতিক দূরত্ব যতবেশি ঘোচানো যাবে তত বেশি ভালো। এই দুইটা সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘোচানোর জন্য গল্প লেখার চেয়ে গল্পটা বলা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা আপনাকে বুঝতে পারে। অর্থাৎ একজন লেখকে যদি অধিকাংশ মানুষ বুঝতেই না পারল তার সমাজের, তাহলে ওই লেখক সমাজকে বুঝে না, না হলে ঐ সমাজ পিছিয়ে আছে। আমি এখন যেটা করতে চাচ্ছি, এভাবে গল্পটা বলে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের মানুষদের যারা সাংস্কৃতিক দূরত্বে চলে গেছে, তাদের বুঝানোর চেষ্টা করা উচিত তাদের ভাষা দিয়ে, তাদের মর্ম দিয়ে। আমি গল্প বলার মধ্যে যোগ দিলাম।

কভারটা সুন্দর! রাজিব দত্তের করা, বইয়ের সাথে মানানসই। রাজিব দত্তের এই বিষয়টা আবার আছে! গল্প, উপন্যাসের কভার সুন্দর করা।

মেহেদী উল্লাহ: কভারটা খুব পছন্দ হয়েছে, কভারটা মনে হচ্ছে, বলছে! রাজিব দত্ত খুব ভালো করে।

আমি অনেক সময় ভাবি শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করে করে করবো সেটা আর হয় না।

মেহেদী উল্লাহ: আমি রাজিব দত্তকে গল্প পাঠিয়েছিলাম, সবগুলো পাঠাইনি তার হয়তো পড়ার সময় হবে না।

আমি গল্পের বই করিনি, উপন্যাস করেছি গত দুই মেলায়। আমি সামারি পাঠাই, আমি ভাবি আলাপ করে করে করবো সেটা হয় না।

মেহেদী উল্লাহ: আপনার ‘আলোয় অন্ধ শহর’র প্রচ্ছদ কে করেছেন?

ধ্রুব এষ

মেহেদী উল্লাহ: আমার অধিকাংশ ধ্রুব এষ করেছেন। এবার একটু রাজীব দাকে দিয়ে করালাম, একবার শিবু দা (শিবু কুমার শীল) করেছিলেন, সবকিছুতে পরিবর্তন আসলে ভালো আরকি।

বই প্রসঙ্গে আসি এক খাটের সন্তান, আগিলা যুগের আয়ু, তারপর রাষ্ট্রপতির অগোচরে, খাঁটি সোনা ছাড়িয়া যে নেয় নকল সোনা-এই গল্পগুলো মূলত ট্রাডিশনের সঙ্গে মডার্নিটির বোঝা-পড়ার বিষয়।

মেহেদী উল্লাহ: মডার্নিটি বলাটা কতটুকু ঠিক হবে আমি জানি না। আমি চেষ্টা করছি ট্রাডিশনালি যেভাবে গল্পটা বলা হয়, মডার্ন যে ইনটেলেকচুয়াল যোগাযোগ, গল্পের যে অনুষঙ্গগুলো আছে, গল্পে যা বলতে চাই আগিলা যুগে আছে, কিছু বর্তমান যুগেরও আছে ঘটনা। এটা হচ্ছে মডার্ন চিন্তার কনটেন্টকে, কীভাবে ট্রাডিশনাল ওয়েতে পরিবেশন বা বলা যায় এ অভিজ্ঞতা থেকে এই বই।

দুই নায়িকার গল্পের মধ্যে হেফাজত ইসলামকে ঢুকিয়ে দিতে দেখি। বড় হুজুর মরে গেছে, নতুন হুজুর রাস্তা দখল করে সমাবেশ করছে, সরকারের সাথে দ্বন্দ্ব, আবার রাষ্ট্রপতির এখানে দেখি পলিটিক্যাল ভোটের বিষয় আছে রংপুরের সেই গ্রামে।

মেহেদী উল্লাহ: রাষ্ট্রপতি হয়ে যাওয়া সহজ হয়ে গিয়েছিল। এখন সংসদ সদস্য হয়ে যাওয়া কেমন, সেটাও একটা ব্যাপার আছে আরকি!

আমরা গল্পগুলো বলে দিলে আবার সমস্যা।

মেহেদী উল্লাহ: গল্প বলা সম্ভবও না।

বলার ভঙ্গিটা অন্যরকম, এটা কিন্তু আমরা দেখেছিলাম নাটকে, সেলিম আল দীন করেছেন। এভাবে কি উপন্যাস লেখা সম্ভব হবে?

মেহেদী উল্লাহ: দেখেন সেলিম আল দীন স্যার আমার খুবই শ্রদ্ধার মানুষ। আমাদের যে ঐতিহ্যবাহী নাট্য রীতি এবং আমাদের মধ্যযুগে যে বাংলানাট্য সেটার মধ্যে নৃত্য, কীর্তন, পাচাঁলি এগুলো আছে। একসাথে উঠানের এক কোণে, পথনাটক-সেটাই আসলে নাটকের চর্চা। সেলিম স্যার হচ্ছেন সে টোনের আঙ্গিকগুলো ব্যবহার করছেন। মধ্যযুগে নাটককে যেভাবে পরিবেশন করা হয়, আমরা যদি ‘চাকা’ নাটকের কথা বলি, ‘চাকা’ নাটকের গল্প কতটা বলা হয়েছে, তারচেয়ে বেশি দেখেছি মধ্যযুগের নাটকের ইঙ্গিতগুলো এখানে এসেছে।  ‘স্বর্ণবোয়াল’, ‘নিমজ্জন’ এগুলোয় অনেক বেশি ম্যাজিকাল বা মিথিকাল ব্যাপারও আছে। আমি সেলিম আল দীন স্যারকে বুঝেছি, ওন করেছি, উনি যেমন আমাদের নাটক বলেছেন। আমারও আমাদের গল্পটা বলা উচিত। যেটা কেউ করেনি। শহীদুল জহির একটু চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তারটা ম্যাজিক ঘরনার হয়ে গেছে। আমরা যে বাস্তবতায় বসবাস করছি আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের গল্পটা এভাবে বলার উত্তম সময়, কারণ এরকম একটি সময় আমরা কাটাচ্ছি।

আমার কাছে বইটা পড়ে এটাই মনে হয়েছে, নতুন ফর্মটাকে হাজির করার জন্য লেখা। শহীদুল জহির ক্লেইম করেননি বাংলাদেশী বা পূর্ববঙ্গ।

মেহেদী উল্লাহ: আমার স্বত্ব গ্রামগঞ্জের মানুষ আর শহীদুল জহিরের স্বত্ব তার নিজের স্বত্ব। এটা বলার কিছু নেই। কলমকুমার মজুমদার, ইলিয়াস কোথাও কোথাও লিখতে শুরু করেছেন, শহীদুল জহিরের মতো করেই। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসগুলোতে এভাবে করছে, এটা পুরানো ভঙ্গি। আমার স্বত্ব আমার না। আমার স্বত্ব হলো গ্রাম-গঞ্জের মানুষ, ফোক যেটা বলে থাকি, লোক মানুষ বা তারা যেভাবে গল্পটা এতকাল বলে আসছে তারা ইতিহাসের বাইরে থেকে গেছে।

তাহলে তো আপনি লেখকের চেয়ে গবেষক বেশি নাকি?

মেহেদী উল্লাহ: কোন অর্থে?

গবেষণা করে লিখতে হচ্ছে তাই।

মেহেদী উল্লাহ: ঠিক, আসলে আমি লক্ষ-উদ্দেশ্য ছাড়া লিখতে রাজি না। একটা বইয়ের কী লিখব সেটা তো মানে, দেশের জাতীয়তা, জাতীয়তাবাদ না। মানুষের জাতীয়তা। জাতীয়তাবাদ ভিন্ন বিষয়। এখন অনেকেই ইগনোর করে আবার অনেকে ধরে রাখতে চায় সেই বিতর্কে আমরা যেতে চাই না। আমি বলতে চাই একটা জাতিত্বের বন্ধন যে অর্থে বাংলাদেশে, যে অর্থে পূর্ববাংলা।

এটি এন্টি কলোনিয়ালিজমের অবস্থান আরকি। এটা আগেও ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

মেহেদী উল্লাহ: আমরা দেখতে চাই বেশি মাত্রায় যে এই ফর্মগুলো আনা যায়। এটা ঠিক গবেষণা না, একটি দেশের প্রতি, যে দেশের শিল্প সাহিত্যের প্রতি অবিচার হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, নিজেদের নিজেরা ছোট করে রাখা, এতো কিছু হচ্ছে। সেই কবে আমরা বলতে শুনেছি, আমাদের গল্প আমাদের মতো হচ্ছে না। ইলিয়াস বলছে, বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করেছেন। তারপরেও আমরা সচেতন হইনি। আমাদের গল্প আমাদের মতো হোক। মূলত আমাদের গল্পের আঙ্গিক আমাদের মতো না আরকি। ইউরোপীয় হয়ে যায়, মানুষগুলো কেমন যেন আছে আরকি। সবকিছু আসলে পুরো ইডিওলজিটা, পুরো প্রকল্পটা চরিত্রের জন্য করতে চায়। আমরা ক্যারেক্টারের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাই। আমি বলতে চাই ক্যারেক্টারাইজেশন এখানে হয়েই আছে। আমার লোকমানুষ যেভাবে গল্প বলে, বাইরের দিক থেকে দেখলে সে নিজেও একটা ক্যারেক্টার, কিন্তু আমি সেটা বলার চেষ্টা করছি। আমি ওই মানুষটা হয়ে গেছি আরকি। কথক গল্পের কথক সে নিজেই আসলে বলছে এটার ঋণ মানুষের, আমার না।

আমরা শেষ করি। বই নিয়ে যদি পাঠকদের কিছু বলেন আরকি।

মেহেদী উল্লাহ: প্রিয় পাঠক, এটা আমার ষষ্ঠ গল্পের বই। আমি আগের যে ঘরনার, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন আখ্যান সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছি। আমি নতুনভাবে গল্প লেখার চেষ্টা করেছি। আপনারা যদি এটি পড়েন সেক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব যে সাহিত্য  দেশিয় যে সাহিত্য বা আসলে আমরা যে বাংলাদেশ বলি, দেশপ্রেম সেটা কতটুকু আছে, কতটুকু দেখাতে পারি কারণ আমাদের সবকিছুতে বাইরের প্রভাব, পশ্চিমা প্রভাব, তো এক্ষেত্রে আমি বলব এটা ঘরের জিনিস, ঘরের গল্প। এভাবে বলা হয়, এভাবে বলতে বেশি অভ্যস্ত, তো আপনারা বইটি, ‘আগিলা যুগের আয়ু’ পড়লে খুব ভালো লাগবে এবং মনে করব যে আসলে আমার এটা সার্থক হয়েছে এবং আমি এই ব্যাপারটাকে আপনাদের যেমন লাগলো সেটা বড় বিষয়। আপনাদের যদি ভালোলাগে তাহলে আমার শ্রমটা সার্থক হবে এবং আমি আরো বড় ন্যারেশনের বা ন্যারেটিভের দিকে যেতে চাই এই ভাষা দিয়ে। ভালো থাকবেন আপনারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত