রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি

ঠাঁই নেই আইসিইউতে ওয়ার্ডে উপচেপড়া রোগী

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২১, ১২:৫৮ এএম

রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন করোনা রোগীর সংখ্যা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সব শয্যাই (বেড) ভর্তি করোনা রোগীতে। প্রায় একই পরিস্থিতি হাসপাতালটির করোনা ওয়ার্ডেরও। সেখানকার ৪৮ বেডের মধ্যে ৩৮টিতেই রয়েছে রোগী। এছাড়া কেবিনের ২২টি বেডেও করোনা রোগীর চিকিৎসা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে একাধিক সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এদিকে করোনা শনাক্তের হার হঠাৎই বেড়ে গেলেও এখনো রাজশাহীতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনীহা দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। এমন উদাসীনতায় উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি মানাতে প্রশাসনের কঠোরতার বিকল্প নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরু থেকেই রাজশাহীতে করোনার নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শনাক্তের সংখ্যাও। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ল্যাবে প্রতিদিন দুই পালায় (শিফটে) করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। করোনা পরীক্ষার ল্যাব থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ১ মার্চ রাজশাহীতে করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৮৭ জনের। এর মধ্যে পজিটিভ হন ৮ জন। ১০ মার্চ ২৭৭ জনের পরীক্ষা করে করোনা ধরা পড়ে ১৮ জনের। ১৫ মার্চ করোনা পরীক্ষা হয় ২৮২ জনের, পজিটিভ রিপোর্ট আসে ১৭ জনের। ২০ মার্চ ২৮০ জনের পরীক্ষা করে পজিটিভ রিপোর্ট আসে ১৮ জনের। ২১ মার্চ ২৭৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩০ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়। ২২ মার্চ ২৭৭ জনের পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হয় ৪৩ জনের। আর সর্বশেষ ২৩ মার্চ ২৮১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হয় ৩৪ জনের।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজশাহীতে এখন একটি ল্যাবেই শুধু করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমরা দুই শিফটে সর্বোচ্চ ৩২০টি নমুনা পরীক্ষা করতে পারব। তবে কয়েক দিন ধরে যে হারে চাপ বেড়েছে তাতে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো চাপ সামলানো আর সম্ভব হবে না। তখন সিরিয়াল ধরে অপেক্ষা করতে হবে।’

রামেক অধ্যক্ষ জানান, মাত্র কয়েক দিনেই করোনা পরিস্থিতি খুব খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে ২০টি বেডের কোনোটিই ফাঁকা নেই। সেখানে ১১ জন করোনা রোগী এবং করোনার লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা চলছে ৯ জনের। আরও অন্তত ২০ জন আইসিইউর বেডের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন। হাসপাতালের ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের পুরোটাই করোনা রোগীদের জন্য আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ৪৮টি বেডের মধ্যে ৩৮টিতেই রোগী আছে। এছাড়া ২২টি কেবিনের সবকটিতেই রয়েছে করোনা রোগী।

ডা. নওশাদ আলী বলেন, ‘৩৯ ও ৪০নং ওয়ার্ডের ১৮টি বেডও করোনা রোগীদের জন্য আলাদা করা হচ্ছে। এছাড়া চাপ আরও বেশি বেড়ে গেলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটা অংশকে করোনা চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে। হাসপাতালের ২২, ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর ওয়ার্ডকে ফাঁকা করে করোনা ওয়ার্ড করার কথা ভাবা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজশাহীর জন্য ভয়ংকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, যদি স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর না দেওয়া হয়। যারা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের শ্বাসকষ্ট, কাশি, ডায়রিয়া বা তাৎক্ষণিক অসুস্থ হয়ে পড়ার লক্ষণ থাকছে। এমন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে।’

অন্যদিকে করোনা রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে ইতিমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা চিকিৎসার জন্য এরই মধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। এছাড়া যেসব ছোটখাটো সমস্যা ছিল সেগুলোর সংস্কার করা হয়েছে। আগের বছর আমরা করোনা চিকিৎসার জন্য মিশন হাসপাতাল ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় আমরা এবার পুরো চিকিৎসা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই করার প্রস্তুতি নিয়েছি। আর করোনা পরীক্ষার চাপ বেড়ে গেলে হাসপাতালের ল্যাবটি আবারও চালু করা হবে। এজন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতালে একটি জিন-এক্সপার্ট মেশিন রয়েছে। সেখানে করোনার পরীক্ষা আরও সহজে সম্ভব। এক ঘণ্টার মধ্যেই শতভাগ নিশ্চিত ফলাফল পাওয়া যেতে পারে এ যন্ত্রের মাধ্যমে। এখানেও প্রতিদিন ২০-২৫ জনের করোনা পরীক্ষা করা সম্ভব। করোনার নমুনা পরীক্ষার বাড়তি চাপ সামাল দিতে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ব্যবহারের দাবি উঠেছে।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে গেলেও রাজশাহীতে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা এখনো প্রকট। সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহীর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন মাস্ক ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতা বাড়াতে চলছে কার্যক্রম। যেকোনো সেবা পেতে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে বারবারই। কিন্তু সেই নির্দেশনার যেন কোনো গুরুত্বই নেই সাধারণ মানুষের কাছে। বাজারঘাট, পরিবহন, অফিস, চিকিৎসা কেন্দ্র সবখানেই উপেক্ষিত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। বিভিন্ন স্থানে চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও। কিন্তু এরপরও যেন কোনোভাবেই মানুষের সচেতনতা বাড়ানো যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে উদাসীন। মুখে মাস্ক নেই এমন সংখ্যা এখনো বেশি। বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং মলে কিছুদিন আগেও তাপমাত্রা মেপে ও জীবাণুমুক্তকরণ কক্ষের মাধ্যমে প্রবেশে বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমানে এসবের বালাই নেই। তবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন অফিসের প্রবেশপথে ‘নো মাস্ক নো সেল’ ‘মাস্ক ছাড়া সেবা নয়’ এমন ঘোষণা ঝুলছে। অবশ্য এসব লেখা থাকলেও মানুষ মাস্ক না পরলেও সেবা পেতে বা পণ্য কিনতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এছাড়া গণপরিবহনে মাস্ক বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের কোনো নিয়মই যেন নেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন আবারও কঠোর অবস্থানে গেছে। শহরে প্রতিদিন চারজন ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকছেন। উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী কর্মকর্তারা তদারকি করছেন। আমরা মানুষকে সচেতন করছি, নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে মাস্ক বিতরণ করছি। পাশাপাশি প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত