স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং বিদেশে বাংলাদেশের স্বীকৃতির কথা বলি, তখন একজনের নেতৃত্বের কথা সর্বপ্রথম মনে আসে। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারই নির্দেশিত পথে তার আদর্শে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন, বহির্বিশে^ বাংলাদেশের যে স্বীকৃতি, সেটি সত্যিকারভাবে অতুলনীয়।
এ বছর বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করা হচ্ছে। যেটি মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিববর্ষ উদ্যাপন খুবই তাৎপর্যময় এবং আনন্দের। এই মুজিববর্ষের মধ্যেই ঘোষণা এলো ‘গান্ধী পুরস্কার’। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বঙ্গবন্ধুকে সম্মানজনক গান্ধী পুরষ্কার-২০২১ ঘোষণা করেছে। এটা একটি বড় অর্জন। এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে, বঙ্গবন্ধুর ‘জুলিও কুরি’ সম্মাননার কথা। ১৯৭৩ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মানজনক এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
১৯৭১-এ একটি রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। ৯ মাসব্যাপী সংগ্রামে আমরা প্রতিবেশী দেশের সাহায্য পেয়েছি, কিন্তু এর মূল চালিকাশক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এই দেশের মুক্তিকামী জনগণ। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল বিশে^র শক্তিশালী কয়েকটি দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। আরও বেশ কিছু শক্তিশালী দেশ ছিল বিরোধিতায়। আবার সব প্রতিবেশী রাষ্ট্রই যে সহায়তা করেছিল, তাও নয়। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যখন চূড়ান্ত রূপ পায়নি, তার আগেই প্রতিবেশী ভারত ও ভুটান আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন এরপর বাংলাদেশের পাশে এগিয়ে এলো। এরপর পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহ স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিল। জাপান এগিয়ে এলো। এরপরই বাংলাদেশের স্বীকৃতির শোভাযাত্রা শুরু হলো! আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাইরে যারা ছিলেন, তারাও নানা সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ তখন এগিয়ে চলেছে। তারই যোগ্য নেতৃত্বে এবং পররাষ্ট্রনীতির কৌশলে কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অতি অল্প সময়ে স্বীকৃতি পেল। এটা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণে।
বাহাত্তরের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে আসছেন, তখন কূটনৈতিক রীতিনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলেই তাকে স্বাগত জানানো হয়েছিল বিদেশের মাটিতে। পাকিস্তান থেকে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে তিনি যখন দেশে ফিরছেন তখন লন্ডন ও দিল্লিতে তাকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। এসবই বঙ্গবন্ধুর নায়কোচিত নেতৃত্বের জন্য সম্ভব হয়েছিল।
একটি কথা আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। সেটি হচ্ছে ১৯৭২ সালে আঙ্কারা সম্মেলনে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে। ওই সময়ে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তখন আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই সেখানে যোগ দিলাম। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে আমরা সদস্যপদ লাভ করি। যদি চীন ভেটো দিত তবে তা সম্ভব হতো না। চীন তখন সরাসরি বিরোধিতা না করলেও আমাদের লাভ হয়েছিল, কারণ তারা ভেটো দেওয়া থেকে বিরত ছিল। এরপর চীন আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও বঙ্গবন্ধু চীনে আমাদের ব্যবসায়িক প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন। সেখানে আমাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চীনের সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয়বিষয়ক কোনো চুক্তি করা যায় কি না সেসব খতিয়ে দেখতে। ওই সময়ের একটি কথা আমার মনে পড়ছে। নাইজেরিয়ার একটি সমৃৃদ্ধশালী অঞ্চল নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। এমনকি তারা সরকারও গঠন করেছিল। কিন্তু স্বীকৃতির অভাবে সেটি আর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকতে পারেনি। তাই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি পাওয়া জরুরি ছিল। এসব ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও পররাষ্ট্র কৌশল আমাদের সঠিক পথের দিশা দিয়েছে।
বাহাত্তরের মার্চেই বঙ্গবন্ধু ভারত এবং রাশিয়া সফরে গিয়েছিলেন। তখন কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তিও তিনি সম্পাদন করেছিলেন। এক বছরের মধ্যেই বিশে^র কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আলোচনা হয়েছিল।
এরপর বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভায় বিশে্বর ১৫০টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বাঙালি জাতির মুক্তি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতায় অনন্যসাধারণ অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আরও বেগবান হয় এবং নতুন মাত্রা পায়। তখন বলা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির বন্ধু নন, তিনি বিশে^র সব মুক্তিকামী মানুষের বন্ধু। সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুক্তিকামী ও বিপ্লবী চেতনার গণতান্ত্রিক মানুষ। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক শাসকের বিরুদ্ধে, সাম্য ও সুবিচারের ভিত্তিতে সারা পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষকে একতাবদ্ধ হতে।
আজকে তাই আমরা বঙ্গবন্ধুকে দেখছি শুধু বাংলাদেশের জনক হিসেবে নয়, একটি সার্থক ও সফল পররাষ্ট্রনীতির সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। তার এই পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে তিনি সমগ্র পৃথিবীতে একটি বন্ধুত্বের বন্ধন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাস্তবিক অর্থে পৃথিবীতে যত দিন দরিদ্র, নিপীড়িত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুক্তির আকাক্সক্ষা থাকবে, তত দিন শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে মুক্তির আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখাবেন। বিশ্ববাসীর হৃদয়ে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবেন গিরিরাজ হিমালয়ের মতো। তার দেখানো আলোকের ভিত্তিতে আজকে আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজে পাই। এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নারীর ক্ষমতায়নসহ উন্নয়ন সূচকে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সাফল্য পাচ্ছি। বাংলাদেশের এই সাফল্য বাংলাদেশকে বিশ্বের মধ্যে একটি আদৃত দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে বিশে্বর বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা বাংলাদেশে আসছেন। তাদের শুভেচ্ছাবার্তা ও অভিনন্দনে আমরা সিক্ত হচ্ছি। এটার কারণ হচ্ছে আমাদের সাফল্যকে তারা মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। আমাদের দেখানো পথে এগোলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেরও উন্নতি হতে পারে। এতে করে পৃথিবীরও অগ্রগতি হতে পারে।
আমরা নানা ক্ষেত্রে এগোলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে চ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় আমরা বিষবাষ্প লক্ষ্য করছি। এগুলো আমাদের আসল চেতনা ও আদর্শ নয়। একাত্তরে যে চেতনা ও আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তা থেকে আমরা সরে যেতে পারি না। সাম্প্রদায়িকতার স্থান বাংলাদেশে নেই, সেটা আমাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি সাম্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পেরেছি এটাই আসল সাফল্য।
আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি সফল হচ্ছে, এর একটি কারণ আমাদের পররাষ্ট্রনীতিও সফল হচ্ছে। বিশ্ববাসীর সম্মান ও মর্যাদা আমরা লাভ করতে পারছি। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হতে পেরেছি, তার স্বীকৃতি পেয়েছি, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন। এটাও আমাদের সফল পররাষ্ট্রনীতির একটি ফল। আজকে আমরা ৫০ বছরের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য ও ব্যর্থতা যখন আলোচনা ও পর্যালোচনা করছি, তখন দেখতে পাব সফলতার পরিমাণই বেশি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের সময়ে আমরা জাতির জনকের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করতে পারছি, এটাও আমাদের এক ধরনের সাফল্য বলেই বিবেচিত হবে। বিগত ৫০ বছরে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে গেলে আমাদের দেশ আরও এগিয়ে যাবে এ কথা বলা যায়।
লেখক : সাবেক সচিব ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
