মুন্সীগঞ্জে সালিশ বৈঠকে দু’পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে দুই তরুণসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হন আরও কমপক্ষে ৫ জন। গত বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে শহরের উত্তর ইসলামপুর মহল্লায় এ ঘটনা ঘটে। ইভটিজিংকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের মারামারির পর তাদের মধ্যকার বিরোধ মেটাতে ওই সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
নিহতদের মধ্যে একজন হলেন মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার সর্বশেষ নির্বাচনে ৭ নং ওয়ার্ডের পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী আওলাদ হোসেন মিন্টু প্রধান (৪৫)। তিনি উত্তর ইসলামপুর এলাকার প্রয়াত আনোয়ার আলী প্রধানের ছেলে। অন্য দু’জন হলেন একই এলাকার দিনমজুর কাশেম পাঠানের ছেলে মো. ইমন পাঠান (২০) ও দিনমজুর বাচ্চু মিয়ার ছেলে মাহবুব হোসেন সাকিব (১৯)।
নিহত ইমন ও সাকিব জেলা শহরের সরকারি হরগঙ্গা কলেজের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এলাকাবাসী জানায়, উত্তর ইসলামপুর মহল্লায় নানাবাড়িতে বসবাস করা এক তরুণীকে উত্ত্যক্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানকার জামাল হোসেন প্রধানের দোকানের সামনে বুধবার রাত ৯টার দিকে সালিশ বৈঠকে বসেন পরাজিত কাউন্সিলর প্রার্থী মিন্টু প্রধান। তিনি তরুণীকে উত্ত্যক্ত করা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়া ইমন পাঠান-মাহবুব হোসেন সাকিব এবং সৌরভ প্রধান-শিহাব গ্রুপের লোকজন নিয়ে ওই সালিশ বৈঠকে বসেন। বৈঠকের প্রথম পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দেন মিন্টু প্রধান। কিন্তু ওই সমঝোতা মানতে পারেননি সৌরভ প্রধানের বাবা জামাল হোসেন প্রধান। যে কারণে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফের বৈঠকে বসতে ওই দুই গ্রুপের লোকজনকে বাড়ি থেকে ডেকে আনেন মিন্টু প্রধান। এরপর পুনরায় জামালের দোকানের সামনে বৈঠক চলতে থাকে। এরই একপর্যায়ে দুই পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তখন দুই পক্ষকে শান্ত করেন মিন্টু। দ্বিতীয় দফায়ও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ মেটাতে সক্ষম হন তিনি। তবে এবারও সমঝোতা মেনে নিতে পারেননি সৌরভের বাবা জামাল। একপর্যায়ে রাত পৌনে ১২টার দিকে দুই পক্ষের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় মিন্টু প্রধান, ইমন ও সাকিব ছুরিকাহত হন। তাদের পেটে ও বুকে একাধিক আঘাত করা হয়। এই তিনজনকে তাৎক্ষণিক মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইমনকে মৃত ঘোষণা করেন। আর আহত মিন্টু ও সাকিবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাত আড়াইটার দিকে ঢামেকে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাকিবকে মৃত ঘোষণা করেন। সবশেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিন্টু প্রধানের মৃত্যু হয়।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুর ২টার দিকে নিহত ইমনের লাশ নিয়ে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এলাকাবাসী। মিছিলটি শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকা থেকে বের হয়ে কৃষি ব্যাংক ঘুরে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফের উত্তর ইসলামপুর এলাকায় গিয়ে শেষ হয়। ময়নাতদন্তের জন্য নিহত আওলাদ হোসেন মিন্টু প্রধান ও মাহবুব হোসেন সাকিবের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।
এদিকে ৩ জন নিহত হওয়ার পর গতকাল দিনভর উত্তর ইসলামপুর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে উত্তর ইসলামপুর এলাকা থেকে ৩ জনকে গ্রেপ্তার এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও ১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি।
সদর থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পরপরই উত্তর ইসলামপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত।’
সালিশ বৈঠকে সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় ৩ জনকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি আরও ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানান জেলার পুলিশ সুপার আব্দুল মোমেন।
