ইন্না লিল্লাহ পড়ার তাৎপর্য

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২১, ১২:৫১ এএম

 প্রাত্যহিক জীবনের নানা প্রসঙ্গে মুসলমানরা বেশ কিছু ইসলামি বাক্য বা শব্দ উচ্চারণ করেন। যেমন পারস্পরিক সাক্ষাতে আসসালামু আলাইকুম, আনন্দের সংবাদে আলহামদুলিল্লাহ, ভবিষ্যতের ব্যাপারে ইনশাআল্লাহ ও খারাপ কিছু প্রসঙ্গে নাউজুবিল্লাহ বলা। তেমনি খারাপ সংবাদ অথবা কারও মৃত্যুর সংবাদ শুনে মানুষ বলেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ এই যে কারও মৃত্যুর সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ি, এই কথাটার মানে কী এবং এটা কেন পড়ি? এটা কি মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া?

যেহেতু আরবি আমাদের ভাষা নয়, তাই স্বভাবতই আমরা ভেবে নিই- এই দোয়া শুধু মৃত্যুর সংবাদ শুনলে পড়তে হয়। এটা ভুল ধারণা। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ মূলত সুরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াত। সরল অর্থ, ‘ইন্না লিল্লাহ’ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য। আর ‘ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’- এবং নিশ্চিতই আমাদের তার সান্নিধ্যে ফিরে যেতে হবে। এই দোয়া পড়লে, তার প্রভাব মৃত ব্যক্তির রুহের ওপর পড়ে না কিংবা মৃত ব্যক্তির কোনো উপকার হয় না। এই দোয়ার সঙ্গে মৃত ব্যক্তির দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই, দোয়াটি মৃত ব্যক্তির জন্য নয় বরং নিজের জন্য পড়া হয়।

প্রশ্ন জাগতে পারে, তবে কেন আমরা দোয়াটি পড়ি। সহজ উত্তর, এই দোয়া পড়ার উদ্দেশ্য হলো, আমরা যেন মৃত্যুর কথা স্মরণ করি। যখন কারও মৃত্যু সংবাদ শুনব, তখন আমরা যেন চিন্তা করে নিতে পারি যে, এভাবে আমরাও যেকোনো এক মুহূর্তে মারা যেতে পারি। তাই আল্লাহতায়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করে বলি, ‘আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই ফিরে যাব।’ -সুরা আল বাকারা: ১৫৬

সুরা বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ধৈর্যশীল মুমিনের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন, ‘তারা কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হলে বলে, আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয় আল্লাহর কাছেই ফিরে যাব।’ এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, একজন মুমিন যেকোনো ধরনের বিপদ মুসিবত সামনে এলে এই আয়াতটি বলবে এবং আল্লাহতায়ালার ফয়সালা সমর্পিতচিত্তে মেনে নেবে। সুতরাং স্পষ্ট বোঝা গেল, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়া মানে মৃত মানুষের জন্য দোয়া নয়। নিজেও মারা গিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যাব এমন ঘোষণা দেওয়া।

হাদিস শরিফে এসেছে হজরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, মুসলিম যখন কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হয় এবং আল্লাহ তাকে যা বলতে বলেছেন তাই বলে, তখন আল্লাহ তাকে ওই মুসিবতের উত্তম বদলা এবং আগের চেয়ে উত্তম বিকল্প দান করেন। -সহিহ মুসলিম: ৯১৮

কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের, যারা তাদের ওপর বিপদ এলে বলে, আমরা তো আল্লাহতায়ালারই এবং নিশ্চিতভাবে তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদেরই ওপর বর্ষিত হয় তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত। আর তারাই সৎপথে পরিচালিত।’ -সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭

প্রায় দিনই আমরা কারও না কারও মৃত্যু সংবাদ শুনে ইন্নালিল্লাহ পড়ছি। সেখানে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার ওয়াদা করে পরক্ষণেই আগের মতো পাপাচারে মশগুল হই। অর্থাৎ আমি আগের মতোই আছি। অথচ মৃত্যু সংবাদ বা বিপদের কথা শুনে এই আমিই তো বলি, ‘নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর জন্য এবং তার দিকে আমাকে ফিরতেই হবে। এর ভিন্নতা বা ব্যত্যয় না পূর্বের কারও জন্য ঘটেছে, না পরে কারও জন্য ঘটবে।

এবার আপনিই বলুন, এ কথার কোনো প্রভাব আমাদের বাস্তব জীবনে আছে কি? কখনো কি আমি নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করেছি, একদিন এরকম লাশের খাটিয়ায় চড়ে আমার গন্তব্যও তো কবরে হবে। আমারও জানাজা পড়ার জন্য লোকেরা আসবে, কাঁধে তুলে নেবে, আত্মীয়-স্বজন পরমপ্রিয় স্ত্রী-সন্তানরা কেউ কবরের সাথী হবে না। আমি কী প্রস্তুতি নিয়েছি আল্লাহতায়ালার সামনে হাজিরা দেওয়ার? অন্য মুসলমান ভাই বা বোনের মৃত্যুতে এ কারণেই আমরা ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়ি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত