হরতালে হেফাজতের তান্ডব ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফের নিহত ২

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২১, ০১:৪১ এএম

হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও রাজধানীতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুজন নিহত ও পুলিশসহ অন্তত দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। হরতালকে ঘিরে গতকাল রবিবার কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। সরাইলে হাইওয়ে থানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে হরতাল সমর্থকরা। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক কিশোরসহ দুজন নিহত হয়। এছাড়া জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করেছে হরতাল সমর্থকরা।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে শিমরাইল পর্যন্ত সড়কের পুরোটাই গতকাল ছিল হরতাল সমর্থকদের দখলে। তারা দফায় দফায় হামলা করে অর্ধশতাধিক যানবাহন ভাঙচুর ও ৩০টিরও বেশি গাড়িতে আগুন দেয়। মুন্সীগঞ্জে হরতাল সমর্থকদের হামলায় আহত হয়েছেন সিরাজদীখান থানার ওসি। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন হেফাজতের নায়েবে আমির মধুপুরের পীর আব্দুল হামিদ। কিশোরগঞ্জের স্টেশন রোডে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এছাড়া রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জের ভৈরবসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, হামলা এবং ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় হরতালে পিকেটিংয়ের সময় গুলিবিদ্ধসহ আহত ১০ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তারা হলেনময়মনসিংহ সদর উপজেলার মো. ইয়াসিন (৩৫), নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ সানারপাড়ের স্কুলছাত্র সাজ্জাদ হোসেন (১৫), সাইনবোর্ডের ফার্নিচার দোকানের কর্মচারী মো. শাকিল (২৬), বাসচালক মানিক (৩২), কাভার্ড ভ্যানচালক রাসেল (৩২), হেলপার রাকিব (১৮), রাজমিস্ত্রী নুর হোসেন (১৮), ট্রাকচালক নুর হোসেন (৩৩), বিআরটিসির বাসচালক মারুফ হোসেন (৩৫) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পেট্রলপাম্প কর্মচারী হাবিব (২২)। ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক মো. বাচ্চু মিয়া জানান, সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ১০ জনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জনের শরীরে গুলি লেগেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সমাবেশে গুলি ও চট্টগ্রাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কয়েকজনের মৃত্যুর প্রতিবাদে সারা দেশে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে হেফাজতে ইসলাম। এ হরতাল কর্মসূচিতে সমর্থন দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন।

রাজধানীতে পিকেটিং-সংঘর্ষ : রাজধানীর কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ ও আশপাশের এলাকা, ফকিরাপুল, পল্টন, নর্দা, বসুন্ধরা গেইট, ফরিদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও সাইনবোর্ড এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে হেফাজতকর্মীরা। জোহরের নামাজের পর ফরিদাবাদ মাদ্রাসার ছাত্ররা মিছিল করতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পুলিশের সঙ্গে মাদ্রাসাছাত্রদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কয়েক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শী হাজী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মাদ্রাসাছাত্ররা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। দুপুর ২টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। এসময় তারা সরকারবিরোধী সেøাগান দেয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি সাজু মিঞা বলেন, ‘ভাই আমি খুব ক্লান্ত, এখন কথা বলতে পারব না।’ থানার অন্য কোনো কর্মকর্তাও এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজি হননি।

গতকাল বেলা ৩টার দিকে নর্দা থেকে কুড়িল পর্যন্ত সড়ক টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করে হরতাল সমর্থকরা। এসময় তাদের হাতে ছিল লাঠি। এতে বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। ধাওয়া দিলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীদের একজন আলী হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বসুন্ধরা বড় মাদ্রাসাসহ আশপাশের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে এসেছি।’

ভাটারা থানার ওসি মোক্তারুজ্জামান জানান, ৩টার দিকে কয়েকটি মাদ্রাসার ছাত্র সড়কে অবস্থান নেয়। পরে তাদের বুঝিয়ে আধঘণ্টার মধ্যে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে পল্টন পর্যন্ত সড়কে অবস্থান নেয় হেফাজতকর্মীর। আর দক্ষিণ গেট থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দুপক্ষ হরতালের সমর্থন ও বিরোধিতা করে সেøাগান দেয়। তাদের অনেকের হাতে রড ও লাঠি দেখা যায়। উভয়পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা। তাদের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখে পুলিশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, হরতালের সমর্থনে সকাল থেকে বায়তুল মোকাররম এলাকায় দফায় দফায় মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ করে হেফাজতে ইসলাম ও সমমনা ইসলামী দলগুলোর নেতাকর্মীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্টনে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এসময় উভয়পক্ষকেই ইট-পাটকেল ছুড়তে দেখা যায়। এতে ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

জোহরের নামাজের পর বিক্ষোভ মিছিল বের করে হেফাজত নেতাকর্মীরা। মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ে এসে অবস্থান নেয় তারা। এসময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হেফাজত নেতাকর্মীদের কারও হাতে বাঁশের লাঠি এবং কারও হাতে লোহার পাইপ ছিল। সন্ধ্যার আগে পল্টন মোড়ে বিক্ষোভ করে তারা।

বায়তুল মোকাররম এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার সৈয়দ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা জানেন হরতালের দিন পিকেটিং হয়। সেই অর্থে আমাদের এই বায়তুল মোকাররম এলাকায় পিকেটিং খুবই কম। সকালের দিকে হেফাজতে ইসলামের এক থেকে দেড়শ সদস্য পল্টনের ভেতর থেকে বের হয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় আছে, কোনো অবনতি হয়নি। যানবাহন চলাচল করছে।’

হরতালের সমর্থনে বিভিন্ন মাদ্রাসার ছাত্ররা যাত্রাবাড়ী এলাকায় পিকেটিং ও বিক্ষোভ করে। তবে কোনো ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও হরতালবিরোধী মিছিল বের করে। এসব মিছিলে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এছাড়া মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, বসিলা রোড ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।

হেফাজতের হরতালকে ‘অবৈধ’ উল্লেখ করে উত্তরায় আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী মোটরসাইকেল মহড়া ও সমাবেশ করেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আজমপুরে ঢাকা-১৮ আসনের এমপি মো. হাবিব হাসানের নেতৃত্বে হরতালবিরোধী সমাবেশ হয়। উত্তরা জোনের এডিসি তাপস কুমার দাস জানান, কোথাও কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

এছাড়া লালবাগ, মিরপুর, পল্টন, ফকিরাপুল, কাকরাইল, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও এলাকায় পিকেটিং করে হরতাল সমর্থকরা। তবে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এর বাইরে শ্যামলী, মহাখালী, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, নিউমার্কেট, বিজয়সরণি, হাতিরঝিল, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় সড়কে সারা দিনই বাস, মিনিবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলতে দেখা গেছে। সকালের দিকে যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। গণপরিবহনে যাত্রীর সংখ্যাও ছিল কিছুটা কম। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে থাকে।

হরতালকে কেন্দ্র করে ভোর থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেয়।

বিজিবির টহল : হরতাল চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, বিজয়সরণি, মহাখালী, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়। বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল ফয়জুর রহমান বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত ২ : হরতালকে কেন্দ্র করে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। দফায় দফায় সংঘর্ষে নিহত হয় দুজন। তারা হলো সরাইলের কুট্টপাড়া গ্রামের সুফী আলীর ছেলে আলামিন (১২) ও সদর উপজেলার খাটিহাতা গ্রামের আলতাব আলী ওরফে আলতু মিয়া ওরফে হাদিস মিয়া ওরফে কালন মিয়া (২৩)। এ নিয়ে মোদির সফরের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে এ জেলায় নিহত হয়েছে ৭ জন। গতকাল ভোর থেকেই হরতাল সমর্থকরা বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান নেয়। এসময় তারা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে। শহরের পৈরতলা, পুলিশ লাইনস এলাকা, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক, বিশ্বরোড এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইল বিশ্বরোডে খাটিহাতা হাইওয়ে থানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে হরতাল সমর্থকরা। এসময় থানার ওসি সাখাওয়াত হোসেনসহ পাঁচজন আহত হয়। পুলিশ থানার মসজিদের মাইক থেকে হামলা না করার জন্য অনুরোধ জানায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি করে তারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোজাম্মেল হোসেন রেজা বলেন, ‘হেফাজতের সঙ্গে জামায়াত-শিবির মিলে এসব তাণ্ডব চালায়।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা, শিল্পকলা একাডেমি, জেলা পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, ভূমি অফিস, আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, জেলা আওয়ামী লীগের অফিস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব, আনন্দময়ী কালীবাড়ি মন্দির, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বাড়ি, শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভাষা চত্বর, উন্নয়ন মেলাসহ বিভিন্ন সরকারি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে হরতাল সমর্থকরা। এতে আহত ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রিয়াজউদ্দিন জামির মাথায় ৬টি সেলাই দিতে হয়েছে। এছাড়া সদরের বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

হরতালকে কেন্দ্র করে জেলার বিভিন্ন স্থানে দোকানপাটসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। আঞ্চলিক ও মহাসড়কে বন্ধ ছিল ছোট-বড় এবং দূরপাল্লার যান চলাচলও। ঢাকা-সিলেট, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশের কমপক্ষে ৪০টি স্পটে টায়ার জ্বালিয়ে সড়কে ব্যারিকেড দেয় বিক্ষোভকারীরা। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ তৈরি করে তারা। আশুগঞ্জে সোনার বাংলা এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ট্রেনে হামলা চালানো হয়। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেটের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

সিদ্ধিরগঞ্জে গাড়িতে আগুন-ভাঙচুর : সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে হেফাজত নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১০ জন। অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে অন্তত ৩০টি গাড়িতে। ভাঙচুর করা হয় রোগীবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স ও র‌্যাব পুলিশের গাড়িসহ অর্ধশতাধিক গাড়ি। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার কওমি মাদ্রাসার হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক ফজরের নামাজের পর ভোর ৬টা থেকে সাইনবোর্ড, সানারপাড়, মৌচাক, মাদানীনগর ও শিমরাইল মোড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেয়। তারা টায়ার ও কাঠের স্তূপ করে আগুন ধরিয়ে দেয় মহাসড়কের কমপক্ষে ৩০টি স্পটে। এসময় কোনো যানবাহন চলেনি।

দুপুর ১২টার দিকে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু করতে চাইলে পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে হেফাজত নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে হেফাজতকর্মীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা মাদানীনগর কওমি মাদ্রাসার সামনে মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাস, একটি ট্রাক, দুটি কাভার্ড ভ্যান ও একটি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে মারধর ও ক্যামেরা ভাঙচুর করে হরতাল সমর্থকরা। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় তারা। দুপুরের পর থেকে হেফাজতের সঙ্গে যোগ দেয় কিছু বিএনপিকর্মী। হরতাল সমর্থকদের তান্ডব বাড়তে থাকলে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকশ রাউন্ড গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। দুপুর ও বিকেলের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, শফিকুল ইসলাম, শাকিল, শাহাদাত ও পুলিশ সদস্য এমদাদসহ কমপক্ষে ১০ জন। বিকেল ৪টার দিকে আবারও হরতাল সমর্থকরা মহাসড়কে উঠে ৫টি পয়েন্টে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত হেফাজতকর্মীরা যানবাহন ভাঙচুর ও কয়েকটি বাসে আগুন দেয়।

মুন্সীগঞ্জে মধুপুরের পীর ও থানার ওসিসহ আহত ২০ : জেলার সিরাজদীখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় হেফাজতকর্মীরা। দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার কেয়াইন ইউনিয়নের বড় শিকারপুর এলাকায় এ  ঘটনা ঘটে। এসময় মধুপুরের পীর আব্দুল হামিদ ও সিরাজদীখান থানার ওসি এসএম জামালউদ্দিনসহ ২০ জন আহত হন। সিরাজদীখান থানার ওসিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, হেফাজতের নায়েবে আমির ও মধুপুরের পীর আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার নিমতলা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। পুলিশ যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে উত্তেজিত হেফাজত নেতাকর্মীরা বড়শিকারপুর এলাকায় পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ছোড়ে।  পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ এবং ফাঁকা গুলি ছোড়ে। সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও একটি অটোরিকশা ভাঙচুর এবং তিনটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় হেফাজত নেতাকর্মীরা। দুপুর ২টার দিকে মধুপুর ও তেঘরিয়া এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বাড়িতে হরতাল সমর্থকদের অগ্নিসংযোগ করার খবর পাওয়া গেছে।

সিরাজদীখান থানার ওসি (তদন্ত) কামরুজ্জামান জানান, হেফাজতের কর্মীদের হামলায় ওসিসহ ১০ পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। ওসি জালাল উদ্দিনকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সিলেটে ককটেল বিস্ফোরণ : হরতাল চলাকালে সিলেটের বন্দরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও হেফাজতকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এসময় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পুলিশ পাঁচজনকে আটক করেছে।

কিশোরগঞ্জে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা : দুপুরে কিশোরগঞ্জের স্টেশন রোড এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা চালায় হেফাজতকর্মীরা। তারা বঙ্গবন্ধুর ছবি ও চেয়ারটেবিল ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতকর্মী ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে।

রাজশাহীতে দুই বাসে আগুন : রাজশাহী মহানগরীর ট্রাক টার্মিনালে রাখা দুটি বিআরটিসি বাস আগুনে পুড়ে গেছে। তবে এটা নাশকতার আগুন নাকি দুর্ঘটনা তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদর স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুর রউফ বলেন, ট্রাক টার্মিনালের ভেতর মেরামতের জন্য পার্কিংয়ে রাখা দুটি বাসের মধ্যে প্রথমে একটিতে আগুন লাগে। পরে একটি বাস পুরোটাই পুড়ে গিয়ে অন্যটিতেও আগুন ধরে। দ্বিতীয় বাসটি আংশিক পুড়ে গেছে।

আজমিরিগঞ্জে পুলিশের মোটরসাইকেলে আগুন : হবিগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলা, মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ, গাড়ি ভাঙচুর করেছে হরতাল সমর্থকরা। বেলা সাড়ে ১১টায় আজমিরিগঞ্জ উপজেলার নোয়াগড় যাত্রী ছাউনির কাছে পুলিশ ও হেফাজতকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে আজমিরিগঞ্জ থানার ওসি নূরুল ইসলামসহ ৭ পুলিশ ছাড়াও ২০ জন আহত হয়। এসময় হেফাজত ও ইসলামী আন্দোলনের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা টহল পুলিশের পিকআপ ভাঙচুর করে। তারা পুলিশের দুটি মোটরসাইকেলও পুড়িয়ে দেয়। এছাড়া সকাল ১০টার দিকে হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ সড়কের ধুলিয়াখালে রায়ধর, আলাপুর ও দীঘলবাগসহ বিভিন্ন গ্রামের হাজারো মানুষ ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। বেলা সাড়ে ১১টায় ব্যারিকেড তুলে নেওয়া হয়।

হামলার শিকার ট্রেন ফিরে আসে ভৈরব : কিশোরগঞ্জের ভৈরবে সকাল থেকে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুর্জয় মোড়ে অবস্থান নেয় হরতাল সমর্থকরা। ভৈরব থেকে দূরপাল্লার যানবাহনসহ কোনো ধরনের যান চলাচল করেনি। ঢাকা থেকে আসা আন্তঃনগর সোনার বাংলা ট্রেনটি সকাল ৯টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আউটার সিগন্যালের কাছে হরতালকারীদের কবলে পড়ে। এসময় তারা ইটপাটকেল ছুড়লে ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ১৪টি বগির ১৩২টি গ্লাস ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হরতালকারীদের ইটপাটকেলে ট্রেনে থাকা ৩৫০ যাত্রী আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ট্রেনের মেঝেতে শুয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এসময় ট্রেনের ৮ যাত্রী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা একটি তেলবাহী ট্রেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া অতিক্রমের সময় ট্রেনের ইঞ্জিনে ইটপাটকেল ছুড়লে চালক আনোয়ার হোসেন ও সহকারী চালক সবুজ হাসান আহত হন। ট্রেনগুলো ভৈরব স্টেশনে আটকে থাকে।

কমলগঞ্জে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মুন্সীবাজারে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হেফাজতকর্মী ও পুলিশের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। হেফাজতকর্মীদের বাধায় মুন্সীবাজারে খাবার ও ওষুধ ছাড়া সব দোকান বন্ধ ছিল। তারা মুন্সীবাজার, বাবুর বাজার ও দেওড়াছড়া সড়কে যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা আটকে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

হরতালের প্রভাব ছিল না বন্দর নগরীতে : হরতালের কোনো প্রভাব ছিল না চট্টগ্রাম নগরীতে। তবে হাটহাজারী ও পটিয়ায় হরতালে সমর্থনে অবস্থান ছিল কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। এছাড়া নগরীতে হরতালবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় ছিল যুবলীগ ও ছাত্রলীগকর্মীরা। অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে তৎপর ছিল র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা।

হাটহাজারীতে সড়কে ব্যারিকেড : হরতাল চলাকালে হাটহাজারী পৌর সদরে দোকানপাট বন্ধ ছিল। হাটহাজারী-নাজিরহাট মহাসড়কের সরকারহাট পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার, মাটিয়া মসজিদ, মীরেরহাট, মুন্সির মসজিদের টেক, চারিয়া বোর্ড স্কুল, চারিয়া মাদ্রাসা, বুড়ি পুকুর পাড়, মুছার দোকান, মুহুরীহাট বটতল প্রভৃতি এলাকায় মহাসড়কে সড়কের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে হরতাল সমর্থকরা। এতে সকাল থেকে মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল।

ফটিকছড়িতে পিকেটিং : ফজরের নামাজের পর থেকেই ফটিকছড়িতে রাস্তায় নামে হেফাজতকর্মীরা। উপজেলার নাজিরহাট, বিবিরহাট, ভূজপুর, নানুপুর, আজাদীবাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পিকেটিং, ব্যারিকেড ও লাটিসোঁটা হাতে মিছিল করে তারা। উপজেলার বেশিরভাগ দোকানপাটও বন্ধ ছিল। ফটিকছড়ি থেকে ছেড়ে যায়নি চট্টগ্রাম শহরগামী কোনো বাস।

যশোরে বিএনপির মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ : যশোরে বিএনপির একটি মিছিলে লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। বিকেলে শহরের মাইকপট্টি মোড়ে এ ঘটনার পর বিএনপির জেলা কার্যালয় অবরোধ করে রাখে পুলিশ। জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আনসারুল ইসলাম রানা জানান, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তারা একটি মিছিল বের করেন। এসময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এরপরও তারা রেল রোডে গিয়ে মিছিলটি শেষ করেন।

সুনামগঞ্জে লাঠি হাতে সড়কে হেফাজতকর্মীরা : হরতালের সমর্থনে সুনামগঞ্জে শহরের বিভিন্ন সড়কে লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান নেয় হেফাজতের নেতাকর্মীরা। এছাড়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে মোটরসাইকেল  মিছিল ও সমাবেশ করে তারা। দূরদূরান্ত এবং শহরে সব ধরনের যানবাহন চলাচলে বাধা দেন হেফাজতকর্মীরা। এদিকে হেফাজতের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ করেছে জেলা যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।

নারায়ণগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক লীগের বিক্ষোভ : হরতালের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও পথসভা করেছে নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ। মিছিলটি ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধানের নেতৃত্বে বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে নবীগঞ্জ কবিলের মোড় এসে পথসভায় মিলিত হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত