মার্জিন ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে নামিয়ে আনতে আরও ছয় মাস সময় পেল ঋণ বিতরণকারী ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। এ বিষয়ে নতুন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) কোনো নির্দেশনা জারি না করলেও মার্জিন ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ সমন্বয়ে মৌখিকভাবে সময় বৃদ্ধিতে সম্মতি দিয়েছে এসইসি। গত রবিবার বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) ও শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার আগামী বছর থেকে কার্যকরে সম্মতি দেন এসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।
এ বিষয়ে বিএমবিএ সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার কার্যকরের বিষয়টি আমরা এক বছর সময় চেয়ে চিঠি দিয়েছিলাম। এটি বাজারে চাপ তৈরি করছে। বিষয়টি আমরা এসইসি চেয়ারম্যানকে বুঝিয়ে বলেছি। বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বোচ্চ সুদহার কার্যকরের বিষয়টি আরও ছয় মাস বাড়াতে এসইসি চেয়ারম্যান সম্মতি দিয়েছেন। এর ফলে আগামী বছর থেকে এটি কার্যকর হবে।
গত ১৩ জানুয়ারি মার্জিন ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ১২ শতাংশ উল্লেখ করে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছিল এসইসি। এতে বলা হয়, মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো তাদের কস্ট ফান্ড থেকে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ বেশি মুনাফা করতে পারবে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। তবে সুদহার সমন্বয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময় চেয়ে কমিশনে আবেদন জানিয়েছিল ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। তবে কমিশন থেকে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ থেকে মার্জিন ঋণধারী গ্রাহকের বিও হিসাব থেকে অনেক শেয়ার ট্রিগার সেল দেওয়া হয়। এতে করে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের বিক্রি চাপ তৈরি হয়। ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক। পরবর্তীতে সুদহার সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে জুন পর্যন্ত করা হলেও পুঁজিবাজারে অস্থিরতা রয়েই যায়। লেনদেন নেমে আসে ৪০০ কোটি টাকার নিচে। আর সুদহার কার্যকরের নির্দেশনার পর থেকে সূচক কমে যায় ৫৬৬ পয়েন্ট।
এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে বিএমবিএ থেকে সুদহার সমন্বয়ে আরও এক বছর সময় চেয়ে ২০২২ সালের জুন সময় কার্যকরের আবেদন জানানো হয়। আর গত রবিবার বিএমবিএ ও শীর্ষ ব্রোকারদের সঙ্গে আলোচনায় ছয় মাস বাড়িয়ে আগামী বছরের শুরু থেকে সর্বোচ্চ সুদহার কার্যকরে সম্মতি দেয় এসইসি।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিনিয়োগকারীরা ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক থেকে যে ঋণ নেন, সেটি মার্জিন ঋণ হিসেবে পরিচিত। ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক নিজস্ব তহবিলের বাইরে বিভিন্ন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের মার্জিন ঋণ দিয়ে থাকে। বর্তমানে শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজসহ অনেক হাউজ মার্জিন ঋণে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। মার্জিন ঋণের বিধান অনুযায়ী একজন বিনিয়োগকারী তার নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ (১:০.৭৫) হারে মার্জিন ঋণ নিতে পারেন।
বর্তমানে শতাধিক ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক গ্রাহকদের মার্জিন ঋণ দিচ্ছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। অবশ্য গ্রাহকদের দেওয়া এই মার্জিন ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশই অনাদায়ী। ২০১০ সালের দরপতনের কারণে মার্জিন ঋণে থাকা গ্রাহকের পোর্টফোলিও ফোর্সড সেলের (বাধ্যতামূলক বিক্রি) আওতায় থাকলেও সরকার এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপে গ্রাহকের শেয়ার বিক্রি করতে পারেনি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরপর থেকে শেয়ারদর ব্যাপক কমায় বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের বিও হিসাবে মূলধনী লোকসান তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ নয় বছর পরও মার্জিন ঋণের ওই সংকট থেকে বের হতে পারেনি পুঁজিবাজার।
গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্সের ওপর নির্ভর করে পুরনো মার্জিন ঋণ নীতিমালায় পরিবর্তন আনে এসইসি। সূচক কম থাকলে বেশি ঋণ এবং সূচক বেশি থাকলে কম ঋণ এমন পদ্ধতি আরোপ করে এসইসি। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৪০০০ বা তার নিচে থাকলে গ্রাহককে ১০০ টাকার বিপরীতে ৭৫ টাকা ঋণ দিতে পারবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। নতুন নির্দেশনায় ৪০০১ থেকে ৭০০০ পয়েন্ট পর্যন্ত ডিএসইর প্রধান সূচকের ক্ষেত্রে ১ অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ হারে এবং ৭০০০ পয়েন্টের ওপরে সূচকের ক্ষেত্রে ১ অনুপাত শূন্য দশমিক ২৫ হারে মার্জিন ঋণ দিতে পারবে বলে বলা হয়েছে। নির্দেশনাটি চলতি ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।
মার্জিন ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী যেসব শেয়ারের পিই রেশিও ৪০-এর নিচে রয়েছে, শুধুমাত্র সেসব শেয়ারেই ওই ঋণ দেওয়া যায়।
