নির্দেশনা বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপ নিন

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪৩ পিএম

দেশে করোনা মহামারীতে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় সংক্রমণের হারও দ্রুত বাড়ছে। গত ১৩ মার্চ সংক্রমণের উচ্চ হার ছিল মাত্র ছয় জেলায়। এক সপ্তাহ পরই এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০টিতে। পরবর্তী এক সপ্তাহেরও কম সময়ে সংক্রমণের উচ্চ হার চিহ্নিত হয় ২৯টি জেলায়। গত এক সপ্তাহে আরও দুটি জেলা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে দেশে করোনার উচ্চ সংক্রমিত জেলার সংখ্যা মোট ৩১টি। অর্থাৎ ইতিমধ্যেই দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় করোনা সংক্রমণের উচ্চ হার ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু মহামারীর ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর এবং মাঠপর্যায়ে প্রায়োগিক দায়িত্বে নিয়োজিতদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা ১৮ দফা নির্দেশনার কিছু কিছু বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুসরণ করা শুরু হলেও সবক্ষেত্রে এখনো সেসব বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। এসব কারণে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলসহ উচ্চসংক্রমিত জেলাগুলোতে নানা ক্ষেত্রে সমন্বয়ের তীব্র অভাবে বিভ্রান্তিতে পড়েছে জনগণ।

জনস্বাস্থ্য ও মহামারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত ছিল ১৮ দফা নির্দেশনা ঘোষণার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমিকভাবে সেগুলো বাস্তবায়নের একটা রোডম্যাপ প্রকাশ করা। তাহলে দায়িত্বশীল দপ্তরগুলো ধাপে ধাপে নির্দেশনা বাস্তবায়নের সুযোগ পেত। তেমনি সাধারণ মানুষের মানসিক প্রস্তুতি থাকত যে, কবে থেকে কোনটা বন্ধ হচ্ছে, কবে থেকে কোনটা নিষিদ্ধ হচ্ছে। সে অনুযায়ী পরিবার-পরিজন ও নিজের প্রস্তুতি গ্রহণ করার সুযোগ থাকতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, সরকারি-বেসরকারি অফিসসহ শিল্পকারখানায় অর্ধেক জনবল নিয়ে কাজ করার নির্দেশনা বাস্তবায়নের আগেই নগর-মহানগরে বাস-মিনিবাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি ও অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরুর কারণে সাধারণ মানুষের মারাত্মক ভোগান্তির কথা। আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসেও একই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। সড়ক ও রেলপথের পর দেখা গেল একইভাবে নৌপথেও ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়ে অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই জনবল অর্ধেকে নামেনি। এক্ষেত্রে ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলের কর্মীরা বিপাকে পড়েছেন। তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা তো বলছেনই যে, এই খাতে অর্ধেক জনবল নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। প্রশ্ন হলো, সরকার এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কেন মাঠপর্যায়ে তা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সেই প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি?

তবে, এক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে দেশের পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করার সিদ্ধান্তটি আশাব্যঞ্জক। জনসমাগম এড়াতে সরকার দেশের সব পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র আগামী ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল ও রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও। কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসকরা জানিয়েছেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলাপ্রশাসন ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। একইসঙ্গে এসব জেলায় প্রতিদিন রাত ৮টায় সব দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেট বন্ধ করার পাশাপাশি হোটেল-মোটেলে অর্ধেক টেবিল-চেয়ার তুলে রেখে ভোক্তাদের সেবা প্রদান এবং আবাসিক হোটেল বন্ধ রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সারা দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে উচ্চসংক্রমিত জেলাগুলোর সঙ্গে বাকি দেশের বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। কিন্তু এখনো সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। সংক্রমণের উচ্চ হারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মৌলভীবাজার জেলা। এরপরই সংক্রমণের শীর্ষে রয়েছে মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেট। এছাড়া সংক্রমণের উচ্চহার রয়েছে নরসিংদী, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, বগুড়া, নড়াইল, নীলফামারী, গাজীপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মাদারীপুর, নওগাঁ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল ও কক্সবাজার জেলায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে প্রায় অর্ধেক জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরও উচ্চ সংক্রমিত এই জেলাগুলোতে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ কার্যকর করা হয়নি। এক্ষত্রে রাজধানী ঢাকাসহ ঢাকা জেলার কথা আমলে নিলে দেখা যাচ্ছে, এখানে সংক্রমণ শনাক্তের হার ১৭ শতাংশের মতো। তবু এখনো লোকসমাগমের বড় আয়োজন যেমন বন্ধ হয়নি তেমনি কোনো মার্কেট-বিপণিবিতানও বন্ধ হয়নি। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরকার যে ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, সেখানে ১০টি মন্ত্রণালয় অন্তর্ভুক্ত। নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসব মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এই মন্ত্রণালয়গুলো কি মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে কোনো সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে? কেবল নির্দেশনা দিলেই হবে না। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত অনুসারে করণীয় বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সংবাদ মাধ্যমসহ জনপরিসরে এসব নিয়ে প্রচার চালাতে হবে। একইসঙ্গে জনগণকেও নিজ নিজ সুরক্ষায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ মহামারীর বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতন হতে হবে।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত