পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতায় শেষ দ্বিতীয় ধাপের ভোট

নন্দীগ্রামে হেনস্তার শিকার মমতা, কটাক্ষ মোদির

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪২ এএম

সহিংসতার মধ্য দিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ। এদিন হেভিওয়েট আসন নন্দীগ্রামের একটি পোলিং বুথে আটকা পড়ে হেনস্তার শিকার হন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি।

এনডিটিভি বলছে, ভোটগ্রহণের সময় তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নিলে নন্দীগ্রামের একটি কেন্দ্রের বুথে মমতা ব্যানার্জি আটকা পড়েন। এ সময় তিনি গভর্নর জগদীপ ধানগড়কে ফোন করে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মুখ্যমন্ত্রীকে সেখান থেকে উদ্ধারে সক্ষম হয়।

এদিকে গতকাল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে নির্বাচনী প্রচারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মমতাকে কটাক্ষ করেছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে পরাজয় নিয়ে শঙ্কিত তৃণমূল নেত্রী। মমতা আরেকটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কিনা তাও জানতে চান মোদি।

নন্দীগ্রামের আসনে বিজেপি থেকে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী তারই এক সময়ের সহকর্মী শুভেন্দু অধিকারী। এ আসন নিয়ে শুরু থেকেই দু’দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান মমতা। এরপর থেকে হুইলচেয়ারে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি।

গতকাল নন্দীগ্রামের রায়পাড়ায় নিজ বাড়িতে বসে ভোট পর্যবেক্ষণ করছিলেন মমতা। বিজেপি কর্মীরা বুথ দখল ও ভোট জালিয়াতি করছে অভিযোগ পেয়ে দুপুর ১টার দিকে তিনি হুইলচেয়ারে করে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হন। বয়াল এলাকায় পৌঁছে তার দলের এজেন্টদের বুথে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে ঘিরে ধরে ‘জয় শ্রী রাম’ সেøাগান দেওয়া শুরু করে বিজেপির নেতাকর্মীরা। এরপর সেখানে তৃণমূল কর্মীরা এলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যে জেড-প্লাস নিরাপত্তা পাওয়া মমতা একটি বুথে আশ্রয় নেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বাইরে দুই পক্ষের কর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুথে বসেই গভর্নর জগদীপ ধানগড়কে ফোন করেন মমতা। নিজের জীবন শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। এখানে আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।’ পরে তাকে পাহারা দিয়ে বাইরে আনা হয়।

এর কিছুক্ষণ পর এক টুইটে গভর্নর বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে মমতা ব্যানার্জির তোলা ইস্যু নিরসন করা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।’

বার্তা সংস্থা এএফপি বলেছে, গতকাল দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণে সহিংসতায় দুজন নিহত হয়েছে। পুলিশ বলছে, তৃণমূলের এক কর্মীকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে এ ঘটনায় বিজেপির তিন সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া তৃণমূল সমর্থকদের হুমকির মুখে বিজেপির এক কর্মী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। পরে তার পরিবার মামলা করে। পুলিশের তথ্য বলছে, রাজনৈতিক সংঘাতে বরাবরই এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। গত বছর এখানে ৫০ জন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

ভোট উপলক্ষে একসঙ্গে চারজনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হলেও গতকাল নন্দীগ্রামে কেন্দ্রের বাইরে মমতার শত শত সমর্থক বিজেপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে দু’দলই পরস্পরের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানা এবং নির্বাচনে কমিশনে অভিযোগ দেয়। এরই মধ্যে একাংশ একটি টিভি চ্যানেলের গাড়িতে হামলা চালালে গাড়ি ফেলেই সংবাদকর্মীরা পালিয়ে যান। নন্দীগ্রাম ছাড়াও বেশ কয়েকটি শহরে দু’দলের সংঘাত থামাতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, ‘নন্দীগ্রামে ভোটাররা চরম ভীতি নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভয়ে অনেকে বাড়ি থেকে বেরই হননি।’

এদিকে গতকাল দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে নির্বাচনী সভায় নরেন্দ্র মোদি বলেন ‘দিদি, আপনি আরেক আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিচ্ছেন বলে গুজব ছড়িয়েছে, তা কি সত্যি? প্রথমে আপনি সেখানে (নন্দীগ্রাম) গেলেন, মানুষ জবাব দিয়ে দিয়েছে। অন্য জায়গায় গেলেও বাংলার মানুষ আপনাকে সঠিক জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দিদি ভবানীপুর (কলকাতায় মমতার আসন) ছেড়ে নন্দীগ্রামে গেছেন। তারপরই বুঝতে পেরেছেন ভুল হয়ে গেছে। দিদি তিন দিন ধরে নন্দীগ্রামে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছেন।’

এ সময় তার সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের তোলা অভিযোগের জবাবে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘বাংলাদেশে মা কালির মন্দিরে আমার পুজো দেওয়া দিদি পছন্দ করেননি। ঈশ্বরের প্রতি আমাদের বিশ্বাস মমতা ব্যানার্জির মতো মৌসুমি নয়। আমরা সব সময়ই আমাদের বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করে থাকি। ওড়াকান্দিতে শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের (মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা) প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কি আমার অন্যায়?’

গত ২৭ মার্চ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়। মোট আট ধাপের এ নির্বাচন শেষ হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। এরপর ২ মে ফলাফল প্রকাশ করা হবে। ২০১১ সাল থেকে মমতার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় রয়েছে। বিজেপি এখন পর্যন্ত এ রাজ্যের শাসনভার পায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত