শতভাগ শ্রমিক দিয়েই চলবে পোশাক কারখানা

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২১, ১২:৪৪ এএম

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫০ শতাংশ জনবল নিয়ে অফিস কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। তবে রপ্তানি ও দেশের অর্থনীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে শতভাগ শ্রমিক নিয়েই কারখানা পরিচালনা করবেন পোশাক কারখানার মালিকরা। তারা মনে করছেন, করোনার প্রথম ধাক্কার সময় যেহেতু শ্রমিকরা শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনেছে এবং খুব কমসংখ্যক আক্রান্ত হয়েছে তাই এবারও কোনো সমস্যা হবে না। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কারখানা মালিকদের সবরকমের নির্দেশনা দিয়েছে মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ৫০ শতাংশ জনবল নিয়ে কারখানা খোলার যে নির্দেশনা দিয়েছে তা আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয় বলেই জেনেছি। আমাদের মনে রাখতে হবে জীবন ও জীবিকা একসঙ্গে চালাতে হবে। রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতিতে ধস নামবে। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি কারখানাগুলো চালু রাখার। একই সঙ্গে সব শ্রমিককেই আমরা কাজে লাগাব।’

শতভাগ শ্রমিক নিয়েই যে পোশাক কারখানা চলবে এ বিষয়ে গত বুধবারই আভাস দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ও পোশাক কারখানা মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি টিপু মুনশি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেছিলেন, অর্ধেক জনবল দিয়ে পোশাক কারখানা চালানো সম্ভব নয়। তাই অর্থনীতি স্বাভাবিক রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কার্যক্রম চালাতে হবে। বাইরে বহু মানুষ মাস্ক ছাড়া ঘোরাঘুরি করলেও পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সবাই মাস্ক পরেই কাজ করে। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে অনভিজ্ঞতায় ভুগতে হয়েছে। সরকার এখন অনেক অভিজ্ঞ। কারখানার সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে কাজ করছে। আমাদের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো বিশ্বমানের। নিরাপদ ও কর্মবান্ধব পরিবেশে শ্রমিকরা কাজ করছে।

ঢাকা, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে প্রায় তিন হাজার পোশাক কারখানা বর্তমানে চালু আছে। গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে ২৫ মার্চ থেকে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু পোশাক কারখানাগুলোর বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দেওয়ায় কারখানা চালু রাখা হয়। বিতর্কের মুখে ২৮ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এ সময়ে শ্রমিকের বড় একটি অংশ গ্রামে চলে যায়। সরকার সাধারণ ছুটি বাড়ালেও কারখানা মালিকরা বাড়াননি। এদিকে যানবাহন বন্ধ থাকায় চাকরি বাঁচাতে হেঁটে বা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চরম ভোগান্তি নিয়ে শ্রমিকরা কর্মস্থলে ফেরেন। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বাধ্য হয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এরপর শুধু রাজধানীতে যেসব শ্রমিক রয়েছেন তাদের নিয়েই কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও এক সপ্তাহ পরেই প্রায় সব শ্রমিক কারখানায় উপস্থিত হন।

বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বছর আমরা অনভিজ্ঞ ছিলাম। এরপরও আমরা কিন্তু সফলভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালাতে পেরেছি। এবারও সরকার আমাদের যে নির্দেশনাগুলো দিয়েছিল সেগুলো ফলো করছি। সব কারখানাকে নির্দেশনা দিয়েছি যাতে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা পরিচালনা করে। এছাড়া আমাদের করোনাকেন্দ্রিক আগে যে উদ্যোগগুলো ছিল সেগুলোও চলমান আছে। বিশেষ করে নিজস্ব করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা, বিশেষায়িত হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি। আশা করছি করোনা মোকাবিলায় পোশাক কারখানা খোলা রাখলেও কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।’

বর্তমানে রপ্তানিমুখী কারখানায় প্রায় ৩৪ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এদের বেশিরভাগই কারখানার আশপাশে থাকেন। কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই তাদের শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রবেশ গেটে হাত ধোয়ার সাবান ও পানি রাখা হয়েছে। বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে। কোনো শ্রমিক অসুস্থ অনুভব করলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে কোয়ারেন্টাইনের জন্য বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকের করোনাজনিত চিকিৎসার ব্যবস্থা কারখানা কর্র্তৃপক্ষই করবে। যেসব শ্রমিক কারখানা থেকে দূরে বসবাস করে তাদের কারখানায় আনা-নেওয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারখানাগুলো নিয়ম-কানুন মানছে কি না সেগুলো তদারকিতে থাকবে বিশেষ সেল। কোনো কারখানা যদি স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে গাফিলতি করে সে ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

ফতুল্লা অ্যাপারেলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কারখানাগুলো শতভাগ কমপ্লায়েন্স। একটি মেশিন থেকে আরেকটি মেশিনের দূরত্ব কমপক্ষে তিন ফুট। সুতরাং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না। আরেকটা বিষয় আপনারা (গণমাধ্যমকর্মী) হয়তো খেয়াল করেছেন, করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে পোশাক শ্রমিকদের সংখ্যা একজন। আক্রান্তের হারও কম। এর কারণ হলো, আমাদের শ্রমিকরা নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন। তারা জানে, কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সবার ক্ষতি। এজন্য অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা অনেক বেশি। সুতরাং আমরা বিশ্বাস করি, শ্রমিকদের সহায়তা ও মালিকদের সচেতনতার মাধ্যমে পোশাক খাতে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব শ্রমিককে নিয়েই কারখানা পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত