আন্নে লাকাতঁ ও জ্যাঁ ফিলিপ ভ্যাসেল এ বছর যুগ্মভাবে স্থাপত্যের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার প্রিৎসকার জিতেছেন। এই দুই স্থপতি প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করে ভবন রূপান্তরে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। তিন দশক ধরে একই সঙ্গে পথচলা দুই স্থপতিকে নিয়ে লিখেছেন দাউদুল ইসলাম ও মুমিতুল মিম্মা
স্থাপত্যের পুরস্কার প্রিৎসকার
প্রিৎসকার পুরস্কারকে বলা হয়ে থাকে স্থাপত্যের নোবেল। স্থাপত্য নিয়ে বিশ্বের সেরা পুরস্কারের অন্যতম এটি। জীবিত স্থপতিদের মধ্যে যারা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও সংগতি রেখে কাজ করতে পারেন এবং যাদের কাজে একই সঙ্গে প্রতিভা, দূরদর্শিতা ও অঙ্গীকারের ছাপ থাকে, তাদের সম্মানে প্রতি বছর এ পুরস্কারের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ১৯৭৯ সালে জেই প্রিৎসকার ও তার স্ত্রী সিন্ডি প্রথমবারের মতো এই পুরস্কারের আয়োজন করেন। প্রিৎসকার পরিবারের পক্ষ থেকে হায়াত ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে এ পুরস্কারের আয়োজন করা হয়।
এ বছরে যৌথভাবে প্রিৎসকার জিতেছেন আন্নে লাকাতঁ ও জ্যাঁ ফিলিপ ভ্যাসেল। প্রথম ফরাসি নারী স্থপতি হিসেবে লাকাতঁ এ পুরস্কার পান। একই সঙ্গে তিনি চতুর্থ প্রিতজকারজয়ী নারী স্থপতি। গত ১৬ মার্চ তাদের নাম ঘোষণা করেন দ্য হায়াত ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান টম প্রিৎসকার।
আন্নে লাকাতঁ ও জ্যাঁ ফিলিপ ভ্যাসেল
১৯৫৫ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন আন্নে লাকাতঁ। তিনি ন্যাশনাল স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ অব বোর্ডো থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালে বোর্ডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর-পরিকল্পনা নিয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন জ্যাঁ ফিলিপ ভ্যাসেল। লাকাতঁ-এর মতো তিনিও স্নাতক শেষ করেন একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
১৯৭০ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্র ধরে তাদের পরিচয়। লাকাতঁ স্নাতকোত্তর শেষ করতে করতে ভ্যাসেল চলে যান নাইজারে। সেখানে নগর-পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছিলেন দুজনে। আফ্রিকার পশ্চিম ভাগে অবস্থিত দেশ নাইজার। দেশটির ৮০ শতাংশ জায়গায় আছে সাহারা মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সেখানে তাদের দুজনের প্রথম প্রজেক্ট ছিল ‘স্ট্র হ্যাট’ বা খড়ের কুটির। কাজের প্রয়োজনে সেখানে প্রায়ই যেতে হতো আন্নেকে। সে সময়ের কথা স্মরণ করে ভ্যাসেল বলেন, ‘নাইজার পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। সেখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা জনগণ দারুণ শৈলীতে হাতের কাছে থাকা কাঁচামাল দিয়েই প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরি করে ফেলেন। জায়গাটি আশায় পরিপূর্ণ। কবিতা আর উদ্ভাবনের যূথবদ্ধতায় অনন্য সম্মিলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরে প্রকৃতির কোলঘেঁষে থাকা এই স্থান আমার দ্বিতীয় স্থাপত্যের স্কুল।’ প্রায় দুই বছর ধরে স্থানীয় বাজারে পাওয়া খড় ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করতে হয়েছে সেই খড়ের কুটির। শুনতে যত সাদামাটা মনে হচ্ছে বিষয়টি ততটাই সহজ নয়। মরুভূমির ভেতরে বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে সেই কুটিরকে। সেটি দেখতে সাদামাটা কিন্তু টেকসই নির্মাণশৈলী ছিল সেই কুটিরের। এই যে সাদামাটা স্থাপত্যের ধারণার সঙ্গে তাদের দুজনের পথচলা শুরু হলো, পরবর্তী তিন দশক ধরে তা একই পথে চলেছে।
লাকাতঁ অ্যান্ড ভ্যাসেল
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের বোঝাপড়া চমৎকার হয়ে ওঠে লাকাতঁ ও ভ্যাসেলের। ১৯৮৭ সালে লাকাতঁ অ্যান্ড ভ্যাসেল ফার্ম স্থাপন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করেন তারা। এরপরে এই কোম্পানি থেকে তারা যতগুলো স্থাপনা তৈরি করেছেন সবগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল কম নির্মাণ খরচে টেকসই স্থাপনা তৈরি। মানুষ বসবাস করবে এমন স্থাপত্য স্থানে ও
প্রকৃতির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তারা। যেন সেসব দালানে মানুষ খুব সহজে চলাফেরা করতে পারে। একই সঙ্গে তারা খেয়াল রেখেছেন নির্মিত দালানে যেন প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় এবং নির্মিত দালান যেন
প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে।
স্থাপনা যেন শারীরিক ও মানসিকভাবে মানুষকে চাঙা রাখতে পারে তা নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করে গেছেন তারা। ১৯৯৩ সালে গ্রিন হাউজ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে তারা ফ্রান্সের ফ্লোহাকে নির্মাণ করেন লাতাপিয়া হাউজ। বাড়িতে থাকা গাছ যেন নিশ্চিত বেড়ে উঠতে পারে এই স্থাপনায় সেটি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হয়েছিল। সূর্যালোকের ব্যবহার, প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল-ব্যবস্থাকে নিশ্চিত রাখাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই হাউজ নিয়ে লাকাতঁ-এর বক্তব্য ছিল, ‘শুরু থেকেই আমরা উদ্ভিদ উদ্যানে গ্রিন হাউজ পর্যবেক্ষণ করেছি। উদ্যানের দুর্বল গাছগুলো গ্রিন হাউজে কীভাবে টিকে থাকে তা নিয়ে আমাদের ধারণা আরও পরিষ্কার করতে হয়েছে। ঘরের ভেতরেই যেন গাছগুলো তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ পায় সে ব্যাপারে লক্ষ রাখতে হয়েছে। সবুজের চমৎকার ছোঁয়ায় আমরা স্থাপত্যের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম।’
আমাদের দেশের সরকারি কলোনিগুলোর মতো পাশ্চাত্যে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি করা হয়। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবী মানুষদের জন্য বরাদ্দ নয় বরং আবাসন সংকট মোকাবিলার জন্য এই বিল্ডিংগুলো তৈরি করা হয়েছিল। প্রতিটি দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কোনো সংস্থার মালিকানায় এগুলো তৈরি করা হয়ে থাকে। সেই বিল্ডিংগুলো সোশ্যাল হাউজিং নামে পরিচিত। সেখানে খুবই কম ভাড়ায় নিম্নবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত লোকজন বসবাস করে। ইউরোপে হরহামেশা এ রকম সোশ্যাল হাউজিংয়ের দেখা মেলে। লাতাপি হাউজের পরে তারা হাত দেন ফ্রান্সের ‘লা ত্যু বয়লে পেত্রে’ সোশ্যাল হাউজিংয়ে। এ ভবন ১৯৬২ সাল স্থাপিত হয়। প্রায় ২০০ মানুষের বসবাসের উপযোগী করে বানানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কারের দরকার হলে প্রথমে প্যারিস কর্র্তৃপক্ষ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তারা দুজনেই এই ভবনগুলোর প্রতি আগ্রহ দেখালে প্যারিস কর্র্তৃপক্ষ আশ্বস্ত হয়। প্রথমবারের মতো তারা দেখান কোনো ভবন না ভেঙে মূল স্থাপনা অক্ষুণœ রেখে কেবল পরিবর্তনের মাধ্যমেই ভিন্ন ধরনের কিছু বানানো সম্ভব। ১৬-তলা বিল্ডিংয়ের কোনো বসবাসকারীকে না সরিয়েই সংস্কার শুরু করেন এবং সফলভাবে তা শেষ করেন তারা। তাদের পরিবর্তিত ভবনটিতে যে শুধু মানুষের বসবাসের আরও উপযোগী করে বানানো হয়েছে তাই-ই না। তারা খেয়াল রেখেছেন এই দরিদ্র মানুষগুলোর চলাফেরায় যেন কোনো সমস্যা না হয়। ঘিঞ্জিভাব কেটে গিয়ে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার যেন নিশ্চিত হয়।
২০১৭ সালে আনন্দের সঙ্গে নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ভবন সংস্কারে হাত দেন তারা। ন্যাশনাল স্কুল অব আর্কিটেকচার অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ অব বোর্ডো তাদের হাতের জাদুরকাঠির ছোঁয়ায়ই যেন অনন্য হয়ে ওঠে। যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে তারা রূপান্তরের মতো বিষয়বস্তু বেছে নিয়েছিলেন, সেটিকেই যেন রূপান্তরিত করতে হাজির হন তারা। কর্র্তৃপক্ষকে অবাক করে দিয়ে তারা দেখিয়ে দেন যে, একই ভবন সংস্কারের পরেও নিজ কাঠামোয় অটুট থাকতে পারে, ভবনের ভেতরে আরও খোলামেলা জায়গা বের হতে পারে।
রূপান্তরের দিকে বিশেষ ঝোঁক নিয়ে লাকাতঁ বলেন, ‘রূপান্তর হলো বাস্তব কোনো কিছুকে আরও ভালো করার সুযোগ। অন্যদিকে ধ্বংস হলো স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তের প্রয়োগ। ধ্বংস করা আসলে অনেক শক্তি, উপাদান ও ইতিহাসের অপচয়। সামাজিকভাবেও এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। আমাদের মতো স্থপতিদের জন্য এটি রীতিমতো সহিংসতার সমতুল্য।’
সাদামাটা ভাবনায় টেকসই স্থাপনা
নাইজারকে সামনে রেখে লাকাতঁ ও ভ্যাসেল তাদের নির্মাণশৈলী সাজিয়েছেন। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যেখানে ঘরহীন, আহারহীন, সেসব মানুষের জন্য নন্দনতত্ত্ব পরের বিষয়। প্রথম ও প্রাথমিক বিষয় হচ্ছে খাবার ও বাসস্থান। অধিকাংশ দরিদ্র জনপদের মানুষ কমবেশি জায়গা ব্যবস্থাপনার সংকটে ভোগেন। এই সংকট জীবনকে আরও বেশি আঁটসাঁট করে তোলে। ঠিক সেখানেই এ জুটির প্রথম পদক্ষেপ, সেখানেই তারা তাদের কাজ নিয়ে আরও বেশি জীবন্ত।
আধুনিক স্থাপত্যকলা মেদহীন ও বাহুল্যবর্জিত। এখানে ভবিষ্যৎমুখী কাজ খুব জরুরি বলে বিবেচনা হয়। স্থাপত্যের ভবিষ্যৎমুখী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা আছে। বিশ্বায়নের এই যুগে জীবনযাত্রায় ব্যয় শুধু বাড়ছে, জায়গা-জমি কমছে। তাই একই সঙ্গে সম্পদের বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। কত কম বিনিয়োগে একটা স্থাপনা অনেকগুলো কাজে ব্যবহার করা যায় এটি শুধু হালের বাস্তবতা নয়, জরুরিও বটে। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থান কমছে, মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে স্থানের প্রয়োজনীয়তাও।
লাকাতঁ ও ভ্যাসেলের স্থাপত্যের মূলমন্ত্র ছিল ‘Never demolish what could be redeemed’। ছোটখাটো কাজে এ মন্ত্র বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কিন্তু ফ্রান্সের ১৬-তলা ভবনে যেখানে দুইশোরও বেশি পরিবার বসবাস করছে এমন ভবনকে সংস্কার করার কাজ বেশ জটিল। অনিশ্চিত পরিস্থিতি সত্ত্বেও কম খরচে পরিবেশবান্ধব উপায়ে স্থাপনাকে বহুবিধ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কাজ বেশ দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু সেই অসাধ্যকে সাধন করে দেখিয়েছেন এই দুই স্থপতি।
তারা বিশ্বাস করেন পরিবর্তনের সুযোগ করা মানে পৃথিবীর ওপর চাপ কমানো আর সুন্দর প্রতিবেশ ও প্রকৃতিকে নিশ্চিত করা। এসবে নজর দিতে গেলে কিছু ক্ষেত্রে তাদের সৌন্দর্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয়। মিনিমালিজমে সৌন্দর্যের উপস্থিতি গৌণ। যতটুকু না হলেই নয় সেটুকুর উপস্থিতিই মিনিমালিস্ট আর্টকে করে তোলে অনন্য। কোনো কোনো স্থপতির কাজ দেখলে মনে হতে পারে ওটা স্থাপত্য নয়, যেন আর্ট। কিন্তু লাকাতঁ-ভ্যাসেলের কাজ ঠিক এর উল্টো। তাদের শিল্পের মূলভাব যতটা না দৃশ্যমান, তার চেয়েও বেশি বিমূর্ত। এই বিমূর্ত কাজের পেছনের গল্পগুলো যে কারও ভাবনায় দোলা দিয়ে যাবে।
নিজস্বতায় অনন্য
সাধারণত স্থপতিদের অফিসগুলো বেশ নান্দনিক এবং জাঁকজমকপূর্ণ হয়। কিন্তু এই জুটির অফিস তেমনটা নয়। খুবই সাদামাটা আর আড়ম্বরহীন একটা অফিস। তারা পেশাগত জীবনের শুরুতে নাইজারের দারিদ্র্য, জীবনযাপনের যে মিনিমালিস্ট ধারা, স্বল্প জিনিস দিয়ে শিল্পের চর্চা স্থাপত্যকলায় তুলে এনেছিলেন। নিজেদের ভাবনায় যাপন করেছেন জীবন। একই সঙ্গে শিল্পী ও স্থপতি হিসেবে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছেন নিজেদের ভাবনাকে। কেবল তাই-ই নয় সেই ভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছেন কোটি মানুষের মধ্যে।
তাদের কোনো কোনো সংস্কার কাজে অনেক সমালোচক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, মূল কাঠামোর ওপরে এত কম হস্তক্ষেপ করেছেন তারা যে আদৌ একে লাকাতঁ-ভ্যাসেলের কাজ বলা যাবে কি না।
তাদের কাজের ব্যাপারে নিউ ইয়র্ক টাইমসে রবিন পোগ্রেবিনের পর্যবেক্ষণটি খুব জরুরি। তার ভাষায়, ‘আগের প্রিৎসকার লরিয়েটদের কাজের কোনো না কোনো ধরন ছিল, যা দেখলে বোঝা যেত এটা অমুকের কাজ কিন্তু লাকাতঁ-ভ্যাসেলের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়!’
ভ্যাসেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কাজের ক্ষেত্রে আমি নান্দনিকতা নিয়ে বেশি চিন্তা করি না। আমার মনোযোগ থাকে দালানের পরিবেশবান্ধব অবস্থানের ওপর। স্থাপনা যেন বহুমাত্রিক ব্যবহারে করার উপযোগী হয় তার ওপর। মার্কিন স্থপতি ফ্রাঙ্ক গেরির কাজ যতটা না স্থাপত্য, তারও বেশি শিল্প। এমন কাজের জন্য যেমন সৌন্দর্যের ঘনঘটা দরকার তেমনি দরকার বড় বাজেট। কিন্তু আমার কাজ শুরু হয়েছিল নাইজারের মতো দেশে। সেখানে আমাকে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে স্বল্প উপাদানে, স্বল্প খরচে স্থাপনা বানানো শিখতে হয়েছিল। এ ভাবনাটিই পরে নিজের মতো চলার ক্ষেত্রে আমাকে পথ দেখিয়েছে।’
অন্যদিকে নাইজারের মতো ছোট দেশের নগর-পরিকল্পনায় কাজ করে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন লাকাতঁ-ভ্যাসেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে পড়ে আসা বিষয়গুলো প্রথম রূপ পেয়েছে নাইজারে। প্রথম কাজের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকে অন্যরকম। নইলে ভ্যাসেল এমনি এমনি তো আর দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেননি নাইজারকে।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে তারা অনেক ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইনস্টিটিউট, পাবলিক স্পেস এবং নগর-পরিকল্পনা করে চলেছেন। তাদের কাজ সামাজিক স্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, পরিবেশ এবং জায়গার উৎকৃষ্ট ব্যবহারের নজির। এই দীর্ঘ সময়ের কাজে মানুষের জীবনযাত্রার সমৃদ্ধির দিকে তারা সব সময় লক্ষ রেখে চলেছেন। যেকোনো শহর সংস্কারের সময় তারা খেয়াল রেখেছেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শহরের পরিবর্তন যেন মানুষের উপকারে আসে। বর্তমানের পৃথিবীতে বসে ভবিষ্যতের পৃথিবী কল্পনা করে তাদের বসবাসযোগ্য যেকোনো স্থাপনা তৈরি করতে হয়েছে। কাজটি মোটেই সহজ কিছু ছিল না।
২০১৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাকাতঁ বলেন, ‘আমি সিনেমাটোগ্রাফি থেকে কাজের উৎসাহ পাই। একজন পরিচালক অনেকগুলো ছোট দৃশ্য জোড়া দেন। এই দৃশ্যগুলো মিলে একটি আবহ তৈরি করে। সেই দৃশ্য ঘিরে অভিনেতারা তাদের ডায়ালগ দেন। এ দৃশ্যগুলোর আলাদা কোনো অর্থ তৈরি হয় না যতক্ষণ পর্যন্ত একজন এগুলো সম্পাদনা করে একই সুতায় গাঁথেন। গাঁথাগাঁথির কাজের মাঝে কিছু ফাঁকা জায়গা থেকে যায় প্রয়োজনে সংযোজন-বিয়োজন করার জন্য। পরিপূর্ণ বিন্যাস সব সময় স্থানকেন্দ্রিক হয়। একজন স্থপতির কাজও এর ব্যতিক্রম নয়।’
আধুনিক স্থাপত্যকলার যে আলংকারিক দিক সেটা কি আবার শুরু হচ্ছে লাকাতঁ-ভ্যাসেলের হাতে? এরই মধ্যে এ প্রশ্ন সবার মনে উঁকি দেওয়া শুরু করেছে। ভবিষ্যতের স্থান সংকটের পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের উপযোগী ভবন কীভাবে নির্মিত হতে পারে, সে রাস্তা দেখিয়ে চলেছেন এই দুই স্থপতি।
