রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে যাত্রীবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে আছেন চালক সুমন। কাল সোমবার থেকে লকডাউন শুরুর কথা জেনেছেন গতকাল শনিবার বিকেলে। এরপর থেকেই দুশ্চিন্তায় ডুবে গেছেন বলে জানালেন। সুমন বলেন, এ মাসের বাসা ভাড়া এখনো দিইনি। বাসায় বৃদ্ধ মা আছেন, প্রতি মাসেই কিনতে হয় ওষুধ। এ ছাড়া তিন সন্তানের সংসারের খরচা তো আছেই। দীর্ঘ শ^াস ছেড়ে বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া উপায় নেই।’
মহামারী করোনার বিস্তার ঠেকাতে কাল সোমবার থেকে সারা দেশ ‘লকডাউন’ যাচ্ছে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দেওয়া ঘোষণার পর রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে বেড়ে গেছে ভিড়। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায়, এমন নিম্ন আয়ের মানুষরা আছেন মহা দুশ্চিন্তায়। তাদের একটাই চিন্তা কেমনে চলবে সংসার, জীবন-জীবিকার উপায় কী হবে?
সিএনজিচালক সুমনের মতো অসংখ্য হকার, ফুটপাত ব্যবসায়ী, দিনমজুর, নাপিত, রিকশাচালক, বাস-ট্রাক হেলপার-চালক, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কর্মচারী, এমনকি উবার-পাঠাওয়ের চালকরাও এই দুশ্চিন্তাকারীর কাতারে রয়েছেন। দেশের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত, যারা মাসের বেতনের ওপর ভর করে চলেন। লকডাউনে মধ্যবিত্তদের অবস্থাও এমনই।
মিরপুরের তরুণ আমিনুল ইসলাম গত বছর করোনায় চাকরি খুইয়েছিলেন। তিনি একটি এয়ারলাইনস কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বহু চেষ্টার পর গত মাসে একটি বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি পেয়েছি। বেতন আগের চেয়ে কম। খরচ কুলাতে না পেরে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রাজশাহীর গ্রামের বাড়ি স্থানান্তর করেছি।’ এখন আবার লকডউন কোনোভাবে দীর্ঘ হলে ট্রাভেল এজেন্সিও বন্ধ হতে পারে। নতুন করে আবার চাকরিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন এই তরুণ।
গত বছর সাধারণ ছুটির কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এমন লাখ লাখ তরুণ-তরুণী এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। রাজধানী থেকে অনেকেই পরিবার স্থানান্তর করে নিজে রয়ে গেছেন। শহর থেকে আয় করে গ্রামে পাঠাবেন এমন চিন্তা থেকে জীবন সংগ্রাম তাদের। কিন্তু আবারও ‘লকডাউনের’ খবর তাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লকডাউনে আদৌ সুফল মিলবে কি না, সেটা প্রধান ইস্যু। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগিয়ে সুফল পাওয়াটাও চ্যালেঞ্জিং।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার দুটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। লকডাউনের পূর্ব অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। মানুষ লকডাউন সেভাবে মেনে চলেনি। এ জন্য এবার করোনার বিস্তার ঠেকাতে লকডাউন আদৌ কাজে আসবে কি না, সেটা বিবেচনা করতে হবে। কারণ শুধু লকডাউন দিলেই হবে না স্বাস্থ্যবিধি ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে দিন আনে দিন খায় বা দিন এনে মাস খায়, এমন ব্যক্তিদের জন্য সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে। গত বছর দরিদ্র মানুষের জন্য নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি। পূর্ব অভিজ্ঞতা ও সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। তাহলে এবার সেগুলো ভালোভাবে অ্যাপ্লাই করা উচিত। ‘লকডাউন’ সফল করতে হলে এগুলো নিশ্চিত করতেই হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সাত দিনের জন্য লকডাউন দেওয়া হলে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। গত বছর থেকে অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। প্রস্তুতি না নিয়ে লকডাউনে গেলে গত বছরের অর্থনৈতিক ধীরগতির প্রভাবে দুর্বল অর্থনীতি বড় রকমের চ্যালেঞ্জে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘বড় চিন্তার বিষয় দরিদ্র দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে। তাদের জন্য খাদ্য সহায়তার কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। লকডাউনে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হবে। এ ক্ষেত্রে প্রণোদনার অর্থ যারা লোন নিয়েছেন, তারা টাকা ফেরত দেওয়ার সময়ের পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কৃষিপণ্য সঠিকভাবে সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে।’ সরবরাহ স্বভাবিক রাখতে বিভিন্ন পণ্যের অনলাইন ডেলিভারি চালু রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির তিনটি বড় খাত হচ্ছে কৃষি, শিল্প ও সেবা। প্রতিটি খাতের কয়েকটি উপখাত আছে। কৃষির প্রধান উপখাতগুলো হলো শস্য উৎপাদন, প্রাণী ও মৎস্য সম্পদ। স্বল্প মেয়াদে এসব উপখাতে উৎপাদন না কমলেও দেশি-বিদেশি অর্থনীতি অবরুদ্ধ থাকার কারণে এসব উপখাতের উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এ জন্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা জরুরি। অন্যদিকে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা দিতে শহর ও গ্রামে গত বছর যেসব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, তারও সঠিক প্রয়োগ জরুরি।
