সার্কুলার অর্থনীতিতে তারুণ্যের আশার আলো

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ১২:৩৭ এএম

রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারের নাম সারা দেশের মানুষই জানেন। নামকরণের ইতিহাস হয়তো সবার জানা নেই। সম্রাট শের শাহ সুরি তার আমলে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁও থেকে পাঞ্জাবের মুলতান পর্যন্ত চার হাজার আটশ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গ্র্যান্ড ট্র্যাংক রোড’ নির্মাণ করেন। এই সড়ক ঢাকার কারওয়ান বাজারের পাশ দিয়ে অথবা কোনো সংযোগ সড়কের মাধ্যমে এই বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। সেই সময় এখানে একটি সরাইখানা ছিল। ফারসি শব্দ ‘ক্যারাভাঁ’যার অর্থ সরাইখানা। ‘ক্যারাভাঁ’ থেকেই ‘ক্যারভাঁন বাজার’। পর্যায়ক্রমে এই স্থানের নামকরণ হয়েছে কারওয়ান বাজার বা কাওরান বাজার। সে সময় নড়াই নামের এক নদ (বর্তমান হাতিরঝিল) ছিল ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে সংযুক্ত। আর সোনারগাঁও হোটেলের অংশে ছিল নড়াই নদীর ঘাট।

বহু আগের কালের মতোই ঢাকার এই কারওয়ান বাজার এখনো বড় পাইকারি বাজার হিসেবে জনপ্রিয়। সারা বাংলাদেশ থেকে আগত মানুষের ব্যবহার্য কাঁচা তরিতরকারি এখান থেকেই মূলত ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। মৌসুমি সবজি আর ফলের বিরাট আড়ত হিসেবে এখানে পাইকারি ও খুচরা মূল্যে মেলে প্রায় সব কৃষিপণ্য। কারওয়ান বাজারের মতোই যাত্রাবাড়ী, মিরপুর বেড়িবাঁধ, মুক্তিযোদ্ধা কাঁচাবাজার, রায়ের বাজার সাদেক খান বাজারসহ ঢাকা শহরে এইরকম বড় বড় কাঁচাবাজার বসে এবং আশপাশের এলাকাতে ছোট ছোট বাজারে বা ভ্যানে করে ভোক্তাদের কাছে সেই কৃষিপণ্য পৌঁছে যায়। পণ্য ওঠানো-নামানোর এক পর্যায়ে সেই সব বাজারে পড়ে থাকে বর্জ্য যা একেবারেই ব্যবহারযোগ্য না। ফলে বর্জ্য হিসেবে সিটি করপোরেশন সেগুলো পরিষ্কার করে অন্য কোনো স্থানে বা ফাঁকা স্থানে রেখে আসে। উন্মুক্ত স্থানে রাখার ফলে পরিবেশ দূষিত হয়।

কারওয়ান বাজার বা এমন বড় পাইকারি বাজারগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এক সমীক্ষায় দেখা যায় ঢাকা শহরে প্রতিদিন পাঁচ হাজার মেট্রিক টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে ঢাকা শহরে চার হাজারের মতো পাড়াভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী রয়েছেন যারা বাড়িতে গিয়ে ময়লা সংগ্রহ করেন। এরা সবাই ছোট বেসরকারি সংস্থা বা আবাসিক এলাকার সমিতিগুলো দ্বারা পরিচালিত। ঢাকা শহরে প্রায় দেড় লাখ লোক এভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। আমাদের দেশে এমন পচনশীল বর্জ্যরে সঙ্গে প্লাস্টিক, মেটাল, কাগজসহ অন্যান্য উপাদানও থাকে। এই বর্জ্যকে যদি আমরা পেপার, প্লাস্টিক, গ্লাস, মেটাল বা ধাতব পদার্থ, অর্গানিক বা জৈব এবং ই-বর্জ্য এভাবে ভাগ করে সংগ্রহ করি তাহলে আমাদের কাজ প্রথম থেকেই সহজ হয়ে যাবে অনেকাংশে। রাস্তার ধারে আলাদা আলাদা কন্টেইনার রেখে জনগণকে নির্দিষ্ট কন্টেইনারে ময়লা-বর্জ্য ফেলার কথা জানাতে হবে, সচেতন করতে হবে। এভাবে সব ধরনের বর্জ্য প্রথম থেকেই আলাদা হয়ে গেলে এই বর্জ্য পুনরায় ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা সহজ হয়ে যাবে। প্রয়োজনে কন্টেইনারগুলোতে নানা ধরনের রং ও ছবি ব্যবহার করে জনগণকে বর্জ্য আলাদাকরণে শিক্ষিত করতে হবে। এর ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

বাসাবাড়িতে সবজি, মাছ, মাংস এবং রুটির মতন ঘরের সব রকমের উচ্ছিষ্ট খাবরের জন্য আলাদা আলাদা পলিথিনের ব্যবস্থা করেছিল ঢাকা সিটি করপোরেশন। কিন্তু তদারকির অভাবে সেটাও আর বেশি দূরে এগুতে পারেনি এবং সিটি করপোরেশন থেকে ব্যাগ দেওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই।

চট্টগ্রামে ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল দুই একর জায়গায় ‘গার্বেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ প্রকল্প স্থাপন করে আবর্জনা থেকে জৈব সার উৎপাদন শুরু হয়। এই সার ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি খাতে। বাজারের সাধারণ সার থেকে দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় এই সারের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই প্রক্রিয়ার ফলে একদিকে যেমন আবর্জনার দূষণ থেকে পরিবেশ রক্ষা পায়, তেমনি অন্যদিকে এই সার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, মাটি নরম করে এবং মাটির পানিশোষণ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে বৃক্ষ ও ফসল দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জানা যায়, নগরে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার টন আবর্জনা অপসারণ করা হয়। এর মধ্যে সার তৈরির উপযোগী পচনশীল আবর্জনাগুলো পৃথকভাবে সংগ্রহ করা হয়। পচনশীল এমন ছয় টন আবর্জনা থেকে দুই টন সার উৎপাদন করা যায়। প্রতিদিন চার টন করে মাসে ১২০ টন আবর্জনা প্রক্রিয়া করে ৭০ থেকে ৮০ টন সার উৎপাদন করা যায়। উৎপাদিত প্রতি কেজি পাউডার সারের মূল্য ৯ টাকা এবং দানাদার সারের মূল্য ১২ টাকা। ডিলারের মাধ্যমে সারা দেশে এবং পাইকারি ক্রেতার মাধ্যমে চট্টগ্রামে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু এই সারের বাজার এখনো সেভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েনি।

গার্বেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে আবর্জনা আনার পর প্রাথমিক বাছাইয়ে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। ‘এ’ ক্যাটাগরি হলো অতি দ্রুত পচনশীল, ‘বি’ ক্যাটাগরি তারচেয়ে বেশি সময়ে পচনশীল এবং ‘সি’ ক্যাটাগরির আবর্জনা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে পচে। এরপর আবর্জনাগুলো মিশিয়ে নির্দিষ্ট বক্সে প্রক্রিয়ার জন্য রাখা হয়। প্রতিটি বক্সে দশ ধাপে রাখা আবর্জনাগুলো চল্লিশ দিন পর্যন্ত থাকে। এ সময় সেখান থেকে একটি মাত্রার গরম বাতাস বের হয়। এরপর আবর্জনার গরম বাতাস স্বাভাবিক মাত্রায় এলে বক্স থেকে নিয়ে খোলা জায়গায় রাখা হয়। এগুলো দৈনিক তিনবার করে নাড়াচাড়া করতে হয়। এরপর চকলেট রং আসা পর্যন্ত রোদের তাপে রাখতে হয়। তারপরে মেশিনে আবর্জনাগুলো কাটিংয়ের পর বড় ছোট পৃথক করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় একটি অংশ সার ও অপরটি হবে অপ্রয়োজনীয়। সারের জন্য বাছাই করা আবর্জনাগুলোকে এরপর মিলিং করা হয়। এভাবে কিছু পাউডার এবং কিছু দানাদার সার তৈরি করা হয়। এরপরই এগুলো পৃথক প্যাকেট করে বাজারজাত করা হয়।

এই প্রযুক্তিত খুব বেশি টাকা বিনিয়োগ করতে হয় না। চট্টগ্রামের এই প্রকল্পে বর্তমানে সার তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে দুটি কাটিং মেশিন, একটি নেটিং মেশিন, চারটি মিলিং মেশিন ও চারটি দানাদার মেশিন। সব মিলিয়ে মোট খরচ পনেরো থেকে বিশ লাখ টাকার মধ্যে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তদের জন্য এটা হতে পারে খুবই লাভজনক একটি প্রকল্প। এমন প্রকল্পের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তারা কেবল নিজের ব্যবসার বিকাশই নয়, পরিবেশ ও কৃষিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।

২০১৯ সালে যশোর জেলাতেও একইভাবে কাজ শুরু হয়েছে। যশোরের প্রতিষ্ঠানটি বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদন করছে। এ পর্যন্ত ৮০০ মেট্রিক টন কম্পোস্ট সার উৎপাদিত হয়েছে, যা ৭ টাকা কেজি দরে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। একইসঙ্গে, বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন কেন্দ্রেই।

ময়লা-আবর্জনা বা বর্জ্য যাই বলি না কেন সেসব পুনরায় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ভাগ করা, মেরামত করা, পুনর্নির্মাণ এবং পুনর্ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে একটি ক্লোজড লুপ তৈরি করার প্রক্রিয়ার মতো বিষয় আজকের দুনিয়ার বহুল আলোচিত সার্কুলার অর্থনীতি। পানি ব্যবহারের পর সেই পানিকে আবার পুনঃব্যবহারযোগ্য করে তোলা। প্লাস্টিকের ভেতরে থাকা পণ্য ব্যবহার করে সেই প্লাস্টিক আবার ব্যবহার করা। এমনকি বর্জ্য থেকে সার অর্থাৎ কাঁচাবাজারের বর্জ্যকে সার হিসেবে ব্যবহার করা। এই রকমভাবে আমাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার্য অন্য যে কোনো কিছুকে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এই অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। এর ফলে কার্বন নিঃসরণও হ্রাস করা যায়। এভাবে পরিবেশ দূষণ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে, সীমিত সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করে পরবর্তী প্রজন্মের বেঁচে থাকার জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ করা যেতে পারে।

১৯৯৬ সালে আমেরিকান অর্থনীতিবিদ কেনেথ ই. বোল্ডিং উৎপাদনের এমন চক্রাকার পদ্ধতি নিয়ে প্রথম আলোচনা করেন। এরপর ১৯৯০ সালে ‘দি ইকোনমিক্স অব ন্যাচারাল রিসোর্স অ্যান্ড দি এনভায়রনমেন্ট’ বইয়ে নিস এ. (Knees A.) অর্থনীতির পরিভাষা হিসেবে ‘সার্কুলার অর্থনীতি’ বা ‘বৃত্তাকার অর্থনীতি’ অভিধাটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিশক্তির উৎস রূপান্তরের মধ্য দিয়ে সার্কুলার-মডেলটি অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক ও সামাজিক মূলধন তৈরি করে। তিনটি মূলনীতির ওপরে ভিত্তি করে এই সার্কুলার মডেলটি গঠিত হয় : ১. কোনো পণ্যের বর্জ্য এবং দূষণের নকশা তৈরিকরণ, ২. পণ্য এবং উপকরণ ব্যবহার এবং ৩. প্রাকৃতিক পদ্ধতিগুলো পুনরায় তৈরিকরণ।

উন্নত বিশ্ব লিনিয়ার অর্থনীতির ব্যাপকতা থেকে বেরিয়ে এখন বৃত্তাকার অর্থনীতি নিয়ে ভাবছে ও কার্যক্রম শুরু করেছে। লিনিয়ার অর্থনীতির ধারণা হলো কাঁচামাল নাও, পণ্য বানাও এবং সেটা ব্যবহারের পরে ফেলে দাও। কিন্তু সার্কুলার বা বৃত্তাকার অর্থনীতি হলো পণ্য বানাও, ব্যবহার করো এবং পুনরায় ব্যবহার করো। অর্থাৎ একটা চক্রের মধ্যে কোনো পণ্যকে বারবার ব্যবহার করা। কোনো পণ্যের উপকরণ বা উপাদান বারবার ব্যবহারের ফলে কোনো কিছুই অপচয় হয় না। তবে ব্যবহারের ফলে বর্জ্য তৈরি হয়। সেই বর্জ্য আবার ব্যবহারের উপযোগী করা যায় কি না বা করলে আমাদের কী কী উপকার আসবে, সে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা ও কাজের তাগিদ রয়েছে এই অর্থনীতিতে। মূলত সার্কুলার অর্থনীতি বা বৃত্তাকার অর্থনীতি আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের ওপর নির্ভর করে সার্কুলার উন্নয়ন, যা বৃত্তাকার অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

এই সার্কুলার অর্থনীতি আমাদের দেশের তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে, তার জন্য দরকার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর ব্যক্তি পর্যায়ের উদ্যোগ। অল্প বিনিয়োগে এই ধরনের নানবিধ উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। আর সরকারকে সেই উপায় বা উদ্যোগকে গতিশীল করতে নিতে হবে সময়োচিত পলিসি। হতশাগ্রস্ত যুবকদের দিতে হবে আশার আলো। সার্কুলার অর্থনীতির সম্ভাবনা হতে পারে দেশের তরুণদের আশার আলো।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত