সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে হুহু করে

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২১, ১২:১৮ এএম

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি করোনায় বিপর্যস্ত। ব্যাংকে আমানতের সুদও তলানিতে নেমেছে। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিহীন নিরাপদ বিনিয়োগের আশায় সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন অনেকে। ফলে এ খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে হুহু করে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা বেশি ঋণ এসেছে সরকারের।

তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের জন্য এর ফরম সরাসরি গ্রাহককে সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করার নির্দেশনা দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এতদিন গ্রাহকরা ব্যাংক বা সঞ্চয় অফিসে গিয়ে সেখান থেকে ফরম সংগ্রহ করে বিনিয়োগ করতে পারতেন। নতুন নিয়ম করায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে বাড়তি বেগ পেতে হবে গ্রাহকদের। করোনা পরিস্থিতিতেও ফরম প্রিন্ট করার জন্য অনেককে যেতে হবে রাস্তার পাশের ফটোকপির দোকানে।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মোট ৭৫ হাজার ২২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এ সময়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ ৪৫ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা পরিশোধ করে সরকার। অথচ অর্থবছরের পুরো সময়জুড়ে এ খাত থেকে নিট ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। গত ডিসেম্বরেই এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়।

ব্যাংকে আমানতের সুদ কমে আসায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আমানতের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ বা ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিগুণেরও বেশি। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিট ৩ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ আসে সঞ্চয়পত্রে। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ করে থাকে সরকার। তবে সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেওয়া হয়। প্রতি মাসের বিক্রি থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর নিট ঋণ হিসাব করা হয়। এ অর্থ সরকার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। ব্যাংকে আমানতের সুদ কমে আসায় নানা শর্ত আরোপের মধ্যেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ছে বলে মনে করছেন সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এ খাতের বিনিয়োগে একের পর এক কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগে ব্যাংক লেনদেন ও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়।

এছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ শতাংশ উৎসে কর, মোট বিনিয়োগের সময়সীমা একক নামে ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথ নামে ১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সীমা কমিয়ে একক নামে ১০ লাখ এবং যৌথ নামে ২০ লাখ টাকা করা হয়। এছাড়া বিদেশি মুদ্রায় বিনিয়োগের জন্য তিন ধরনের বন্ডের মোট বিনিয়োগসীমা কমিয়ে ১ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বা অন্যান্য বিনিয়োগসীমা প্রযোজ্য হবে না।

ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমাতে গত বছর এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাংশের বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল সরকারের। বিক্রি কমায় বছরের মাঝামাঝিতে এসে সেই লক্ষ্য কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তবে জুন মাসে বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ ওই অর্থবছর শেষে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।

গত ১ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক সার্কুলারে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ফরম ডাউনলোড করে ব্যবহারের বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের গত ২২ মার্চ জারি করা এক নির্দেশনা অনুসরণ করে ওই সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে বলা হয়, ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্রের লেনদেন হচ্ছে। এ খাতের প্রধান চার ধরনের সঞ্চয়পত্রের ফরম সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে আপলোড করা আছে। এখন থেকে সঞ্চয়পত্র লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সবাইকে এ ফরমগুলো ডাউনলোড করে ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয় ওই সার্কুলারে।

তবে এ নির্দেশনা মেনে অনেকেই ফরম ডাউনলোড করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারবে না বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি ব্যাংকে সঞ্চয়পত্রের ফরম প্রিন্ট করে রাখার জন্য। এটা না হলে অনেকেই সঞ্চয়পত্র কিনতে এসে ফিরে যাবেন। আবার অনেকে নিজেরা ফরম ডাউনলোড করার মতো নয়। তারাও ভোগান্তিতে পড়বেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত