দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে রোগী শনাক্তের পাশাপাশি মৃত্যুও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত কয়েক দিন ধরে সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের একের পর এক রেকর্ডের পর এবার মৃত্যুতেও পরপর রেকর্ড গড়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৭৪ জন করোনা রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন, যা এক দিনে এ যাবৎ সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশে সর্বমোট মৃত্যু সাড়ে নয় হাজার ছাড়িয়েছে। গত বছর করোনা সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের সময় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল গত ৩০ জুন। ওইদিন ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নয় মাসের বেশি সময় ধরে এটাই ছিল করোনায় এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড।
করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে গত মঙ্গলবার সেই রেকর্ডকে অতিক্রম করে এক দিনে ৬৬ জনের মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হয়। কিন্তু এক দিন না যেতেই গতকাল সেই রেকর্ডকেও পেছনে ফেলে সর্বোচ্চ ৭৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গতকাল মৃতদের ৬২ জনই ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের এবং ৪৩ জন ছিলেন ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।
সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা সমানতালে বাড়ছে। শনাক্তের সংখ্যা প্রায় এক মাস ধরে বাড়লেও মৃত্যু ব্যাপকভাবে বাড়তে শুরু করেছে গত ৯-১০ দিন ধরে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ দিন ধরেই দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ৫০-এর ওপরে রয়েছে। এ ৯ দিনে দেশে সর্বমোট মারা গেছেন ৫২৭ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৯ জন করে করোনা রোগী মারা গেছেন। অথচ গত ফেব্রুয়ারিতেও পুরো মাসজুড়ে প্রতিদিন মাত্র ১০ জন করে রোগী মারা গিয়েছিলেন। একইভাবে ফেব্রুয়ারিতে প্রতিদিন যেখানে গড়ে ৩০০-৪০০ জন করে রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে মার্চজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৯৯ জন করে শনাক্ত হয়েছে। আর চলতি এপ্রিলের গত আট দিনে সেটা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। এই আট দিনে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৮৫৫ রোগী শনাক্ত হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায়ও দেশে ৬ হাজার ৮৫৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগে গত চার দিন টানা রোগী শনাক্ত সাত হাজারের ওপরে ছিল। শনাক্ত কিছুটা কমার পাশাপাশি এদিন শনাক্ত হারও কিছুটা কমেছে। অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে এদিন জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৩ হাজার ১৯৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের এ হার চলতি মাসের গত আট দিনের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে গত মার্চ মাসের শেষ দিন এর চেয়ে কম ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগে গত ফেব্রুয়ারিজুড়ে প্রতিদিন গড়ে শনাক্ত হার মাত্র ৩ শতাংশেরও কম ছিল।
গত বছর ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের পর গতকাল ছিল ৩৯৭তম দিন। অধিদপ্তরের গতকালের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে ২৪৩টি পরীক্ষাগারে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৪টি জিন-এক্সপার্ট, নতুন ছয়টিসহ ৮৮টি র্যাপিড অ্যান্টিজেন ও ১২১টি আরটি-পিসিআর পরীক্ষাগার। এসব পরীক্ষাগারে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ৩৩ হাজার ৩২৮ জনের। এর মধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে ৩৩ হাজার ১৯৩ জনের। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৮টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এসব পরীক্ষায় রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জন। মোট পরীক্ষার বিপরীতে গড়ে ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ লোকের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তদের মধ্যে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯ হাজার ৫২১ জন। শেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩ হাজার ৩৯১ জনসহ মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩০ জন। বাকিরা চিকিৎসাধীন। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪৩ এবং সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সর্বশেষ মৃতদের মধ্যে পুরুষ ৪৮ ও নারী ২৬ জন। এ নিয়ে দেশে করোনায় এ পর্যন্ত ৭ হাজার ১৩০ পুরুষ ও ২ হাজার ৩৯১ নারী মৃত্যুবরণ করেছেন। শতকরা হিসাবে পুরুষ ৭৪ দশমিক ৮৯ ও নারী ২৫ দশমিক ১১ ভাগ। সর্বশেষ মৃতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩ জন ঢাকা বিভাগের। বাকিদের মধ্যে চট্টগ্রামে ১৫, খুলনায় ৭, বরিশালে ৪, রাজশাহীতে ৩ এবং সিলেটে ২ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে করোনায় এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৮২ জন মারা গেল ঢাকা বিভাগে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১ হাজার ৭০৯, খুলনায় ৬০৪, রাজশাহীতে ৫২০, রংপুরে ৩৮১, সিলেটে ৩৩৪, বরিশালে ২৮৪ ও ময়মনসিংহে সর্বনিম্ন ২০৭ রোগী মারা গেছেন। বয়স অনুযায়ী, সর্বশেষ মৃতদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব ৪৬, ৫১-৬০ বছরের ১৬, ৪১-৫০ বছরের ৬, ৩১-৪০ বছরের ৫ এবং ২১-৩০ বছরের ছিলেন ১ জন। এদিন ৭০ জন হাসপাতালে এবং চারজন বাড়িতে মারা গেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮১৪ রোগীকে আইসোলেশনে এবং ২ হাজার ৪৮৯ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আইসোলেশনে ১৪ হাজার ৪৬৬ এবং কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৪ হাজার ৫৮৮ জন। সারা দেশে কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোয় ৯ হাজার ৯৯২টি সাধারণ বেডের মধ্যে গতকাল রোগী ভর্তি ছিলেন ৪ হাজার ৯৬৮টিতে। বাকিগুলো খালি ছিল। এছাড়া ৬০০টি আইসিইউর মধ্যে এদিন রোগী ভর্তি ছিলেন ৪৫১টিতে।
