করোনায় বিচারাঙ্গনে ফের অচলাবস্থা

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২১, ০১:১২ এএম

করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় স্থবির দেশের বিচারাঙ্গন। দীর্ঘ সময় বিচার কার্যক্রম নিয়মিত না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির পাশাপাশি বেড়েছে মামলাজট। সম্প্রতি করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি মামলার শুনানির জন্য হাইকোর্ট বিভাগে চারটি (ফৌজদারি, দেওয়ানি, রিট ও কোম্পানি) ভার্চুয়াল বেঞ্চ এবং একটি ভার্চুয়াল চেম্বার আদালত চালু রয়েছে। এছাড়া বিচারিক আদালতে সব ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার নিয়মিত বিচারকাজ (ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্য, যুক্তিতর্কের শুনানি ও রায় এবং দেওয়ানি মামলায় আরজি গ্রহণ ও জবাব) বন্ধ রয়েছে। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে হাজির করার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে একটি করে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চালু রয়েছে। এরই মধ্যে ১৪ এপ্রিল থেকে ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ঘোষণা এসেছে সরকারের তরফে। এ অবস্থায় নতুন করে শঙ্কায় পড়েছেন আইনজীবীরা।

আইনজীবীরা বলছেন, করোনাকালে দেশের বিচার বিভাগের বড় ক্ষতি হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আদালতের বিচার কার্যক্রম নিয়মিত হলেও আবারও করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীর সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রক্ষায় অন্তত জরুরি জামিন, আমলযোগ্য অপরাধের মামলার ফাইলিং ও দেওয়ানি মামলায় নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত শুনানি চালু রাখা উচিত। অন্যদিকে উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা স্বল্প বেঞ্চগুলোকে বিচারকাজের জন্য অপ্রতুল বলছেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ঢাকা ল রিপোর্টসের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে বিচারপ্রার্থী মানুষের তো কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছেই। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে হাইকোর্টের চারটি ভার্চুয়াল বেঞ্চ যতটুকু পারে বিচারকাজ করছেন। সীমিত পরিসরে বিচারপ্রার্থীদের বিচার নিশ্চিত করতে আমরাও চেষ্টা করছি। কিন্তু উচ্চ আদালতে চারটি বেঞ্চ খুবই কম হয়ে যায়। একই পরিস্থিতির কারণে এর আগে অনেক বেঞ্চ ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই হয় তো প্রধান বিচারপতি অন্যান্য বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখন বেঞ্চ বাড়ানোর যে দাবি এটা আসলে আমাদের সবার কথা। আমি মনে করি, সুপ্রিম কোর্ট বারকে এ বিষয়ে উদ্যোগী হতে হবে।’

দুর্নীতি দমন কমিশনের এ আইনজীবী আরও বলেন, ‘করোনার কারণে পরিস্থিতি বিরূপ হলেও দেশে ফৌজদারি অপরাধ ও দুর্নীতি কিন্তু কমেনি। এ বিষয়টি বিবেচনা করে অধস্তন আদালতেও সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জরুরি বিচারকাজ চালু রাখা যেতে পারে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোমতাজ উদ্দিন মেহেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর দীর্ঘদিন হাইকোর্টের ৩৫টি ভার্চুয়াল বেঞ্চ ও বেশকিছু নিয়মিত আদালতে মামলার শুনানি হচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি মাত্র চারটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে, যা একেবারেই অপ্রতুল। আমাদের যুক্তি হলো, ৩৫টি ভার্চুয়াল বেঞ্চ চালানোর মতো সক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে। তবে এখন কেন মাত্র চারটি বেঞ্চ করা হলো? ভার্চুয়ালে তো শারীরিক উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। বেঞ্চ বাড়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার প্রকোপে গত বছর দীর্ঘ সময় উচ্চ ও অধস্তন আদালতের বিচার কার্যক্রম স্থবির ছিল। এরপর ভার্চুয়াল ও নিয়মিত দুই ধরনের আদালতে বিচার কার্যক্রম চলছিল। এখন যে অবস্থা তাতে নিকট ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল পদ্ধতি ব্যাপকভাবে প্রচলন হওয়া কিছুটা দুঃসাধ্য। কেননা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি সুবিধা নেই। সেখানে সীমিত পরিসরে জরুরি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য আদালত চালু রাখা যেতে পারে। আর উচ্চ আদালতে মাত্র চারটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হলে অনেকেই হয়তো মামলার শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন না। আমাদের দাবি, বেঞ্চ বাড়ানো হোক।’

আইনজীবীরা বলছেন, করোনার প্রকোপে দেশে নানা বিধিনিষেধ থাকলেও ফৌজদারি অপরাধ থেমে নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধপ্রবণ লোকেরা এ পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছেন। অধস্তন আদালতের বিচার কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অপরাধপ্রবণ মানুষদের মধ্যে এক ধরনের বেপরোয়া মনোভাব চলে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে আদালত চালু রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন তারা।

সম্প্রতি সরকার কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণার পর বিচারিক আদালতে লোক সমাগম কমিয়ে সীমিত পরিসরে বিচারকাজ চালু রাখতে প্রধান বিচারপতির কাছে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির নেতারা। সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল বাতেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার যে পরিস্থিতি তা আসলেই উদ্বেগজনক। কিন্তু বিচারপ্রার্থীর বিচার পাওয়ার অধিকারটিও দেখতে হবে। আমরা বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেছি। জরুরি জামিন, আইনজীবীর মাধ্যমে আসামির হাজিরা, মামলার ফাইলিং ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত শুনানির ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। জনসমাগম কম ঘটিয়ে কীভাবে সীমিত পরিসরে বিচার কার্যক্রম চালু রাখা যায় সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বারের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহামারীর এ সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জায়গাজমি নিয়ে বিরোধ ও দখলের অভিযোগ আসছে। বিরূপ এ সময়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল যারা তাদের সহায়-সম্পত্তি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমনও জামিনযোগ্য মামলা রয়েছে যেখানে আসামি জামিন পেতে পারত। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে সেটি হচ্ছে না। কিন্তু প্রতিকারের পথ বন্ধ থাকায় বিচারপ্রার্থীদের আমরা কোনো পরামর্শ বা আইনিসেবা দিতে পারছি না। শুধু তাই নয়, ফৌজদারি অপরাধ যেমন থেমে নেই তেমনি পারিবারিক বিরোধের জেরেও অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারছেন না। তাই দেওয়ানি মামলায় অন্তত নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মামলার শুনানি এবং কিছু ক্ষেত্রে জামিন ও ফাইলিংয়ের সুযোগ রাখা হলে বিচারপ্রার্থীদের প্রতিকারের পথ কিছুটা হলেও সুগম হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত