কয়েক বছর ধরেই পাশের দেশগুলো ছাড়াও বিশে^র অনেক দেশেই স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে দর হারাচ্ছে মার্কিন ডলার। এতে করে কিছু দেশ পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধাও পেয়েছে। তবে দেশে রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি থাকায় ডলারের দাম ধরে রাখতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৬৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সময় ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করেছে ২৩ কোটি ডলার। সেই হিসেবে গত ৯ মাসে নিট ৬৩৩ কোটি ডলার বাজার থেকে কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের পুরো সময় বাজার থেকে ৮৭ কোটি ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময় বাজারে ৮৩ কোটি ডলার জোগানও দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। গত অর্থবছরের শেষের ৫-৬ মাস করোনার কারণে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় ওই অর্থবছরে ডলার কেনাবেচা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩৪ কোটি ডলার কেনে এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৩১ কোটি ডলার বিক্রি করে ব্যাংকগুলোর কাছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে মূল্যমান ধরে রাখতে বাজার থেকে ডলার কেনা বাড়াতে হয়েছে ব্যাংক খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে।
গত বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা। গত বছর সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগ পর্যন্ত (২৫ মার্চ) ডলারের দর ছিল ৮৪ টাকা ৯৫ পয়সা। গত জুনে ডলারের দর কমে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে আসে। এরপর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের কারণে এই দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারীর মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো থাকায় দেশে বিদেশি মুদ্রার সরবরাহ বেশি। একই সঙ্গে রপ্তানি বাণিজ্যও ধীরে ধীরে গতি পাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত ডলার জমা হচ্ছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রেকর্ড পরিমাণ ডলার বাজার থেকে কিনতে হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।
অবশ্য ডলার কেনার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ সময় ডলার না কিনলে ডলারের রেট আরও কমে যেত। তখন বাজার ভারসাম্য হারাত। শুধু বাংলাদেশই নয়, ভারতও প্রতি মাসে প্রচুর ডলার বাজার থেকে কিনছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডলার কেনার ফলে বাজারে যে পরিমাণ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়ছে তাতে ব্যাংকগুলোর তারল্য আরও বেড়ে যেতে পারে। এমনিতেই ব্যাংকগুলোর কাছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে।’
এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজারের উদ্বৃত্ত বিদেশি মুদ্রা কমিয়ে বাজার ভারসাম্য বজায় রাখতে ৫২০ কোটি ডলার কেনে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এ সময় প্রবাসীরা মোট ১ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে ১ দশমিক শূন্য ৪৫ শতাংশ। যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরের রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই- ফেব্রুয়ারি) আমদানি প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। গত অর্থবছরে আমদানি কমেছিল ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এদিকে বাজার থেকে ডলার কেনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। গত মার্চ শেষে রিজার্ভ বেড়ে আবারও ৪ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
সম্প্রতি রিজার্ভ থেকে ২০০ কোটি ডলারের একটি বিদেশি মুদ্রার ‘বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করেছে সরকার। এই তহবিল থেকে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষকে রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
