ব্রাজিলে ডাক্তার রেগোর অনন্য চিকিৎসাসেবা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২১, ১১:৪৮ পিএম

কভিডের থাবায় ব্রাজিলের করুণ পরিস্থিতির মধ্যে হেনরিক রেগো ডাক্তারির পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হাতে নিয়েছেন তার গিটার ও ইউকুলেলে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ছড়িয়েছেন সুরের ধারা। ডাক্তার রেগোর ভিন্নরকম চিকিৎসা-পদ্ধতি নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

হাসপাতালে কভিডের বাস্তবতা

কভিড রোগীদের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় দুঃস্বপ্নের মতো। আইসোলেটেড অবস্থায় কারও সঙ্গ পাওয়ার জন্য মন কাঁদলেও কিছু করার থাকে না। সুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা যেন অনন্তকাল ধরে চলে। সে অবস্থা কাছ থেকে দেখেছেন বিশ্বের প্রতিটি হাসপাতালে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মীরা। হাসপাতালের যে ঘরগুলোয় রোগীদের রাখা হয় সেগুলোর দেয়ালে দেয়ালে আঁকা থাকে নিভৃত হাহাকার। ওষুধ, শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভিড়ে অন্য কিছুর চাহিদা যেন একান্তই বিলাসের বিষয়। সে সময়ে শারীরিক অসুস্থতা আর একাকিত্ব যেন একই সঙ্গে রোগীর ওপরে চড়াও হয়ে বসে। মহামারীর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে মানসিক চাপে পড়ে যান রোগী।

ডাক্তার হেনরিক রেগো

ব্রাজিলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হেনরিক রেগোর। বাবা ক্লিন্টো রেগো ছিলেন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ। তাদের পারিবারিক সূত্রে মিশে আছে ডাক্তারি। তিনি বয়স্ক লোকদের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ (Geriatrician)। ৩৮ বছর বয়সী এই চিকিৎসক কাজ করেন ব্রাজিলের সাও পাওলোয়। ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হিসেবে বিশ্বজুড়ে ডাক্তারদের অবদান অনস্বীকার্য। কভিড মহামারী শুরু হয়ে গেলে রেগো মুহূর্তের ভেতরে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন নিজের পেশাগত চর্চা চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যতটুকু সময় পাবেন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করবেন। ডাক্তার রেগো কভিড রোগীদের মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে ভিন্নধর্মী এক স্বেচ্ছাসেবা বেছে নিয়েছিলেন। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাই ব্যাগ গোছানোর সময় সঙ্গে নিলেন নিজের ইউকুলেলে আর গিটারটিও।

গত বছরের মে মাসে কভিড তখন সবে নতুন করে হানা দিয়েছে ব্রাজিলে। সে সময় ব্রাজিলের আমাজোনাস প্রদেশের মানাউস থেকে ভেসে আসছে কভিড রোগীদের সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত সব খবর। মৃত্যুর হার দেখে বিপর্যস্ত সবাই। হাসপাতালে বা হাসপাতালের বাইরে যারাই কভিডের লক্ষণ নিয়ে মারা যাচ্ছিলেন, সবাইকে কবর দেওয়া হচ্ছিল শহরের কবরস্থানে। দূর থেকে আত্মীয়স্বজনের দুঃখ-বিজড়িত মুখ দেখে স্তব্ধ সবাই। বিশ্বের সবখানে একই ধরনের পরিস্থিতিতে যে যার মতো করে সাহায্য করতে নেমে পড়লেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে রেগো তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী মেডিকেলের যন্ত্রপাতির সঙ্গে সঙ্গী করে নিলেন বাদ্যযন্ত্র। বাদ্যযন্ত্রের কাজ কী, কী করবেন তিনি কিচ্ছু ভাবলেন না শুধু বুঝলেন তার যেটুকু সাধ্য তা করে যাবেন তিনি। এখানে দেশ ও জাতির প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন টিকে থাকার, প্রশ্ন বিষণ্ণ দেয়ালে এক চিলতে প্রশান্তি আনার।

মানাউসের এডুয়ার্ডো গোমেজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিনি সোজা চলে গেলেন ডেলফিনা আজিজ হাসপাতালে। সে সময় শহরের সবচেয়ে বেশি কভিড রোগী এসে জড় হয়েছে সেই হাসপাতালে। হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (ICU) সিটের সংকট। হাসপাতালের নিয়মিত সংবাদ তার কাছে আসছিল বলে রেগো জানতেন এর সবকিছু। পেশাগত কাজের সুবাদে তিনি জানতেন সংবাদে যা প্রকাশিত হচ্ছে হাসপাতালের চাপ তার চেয়েও অনেক বেশি। স্বেচ্ছাসেবার ক্ষেত্রে তিনি মনে মনে বেছে নিয়েছিলেন হাসপাতালের প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রকে। সাও পাওলোয় গত ১১ বছরের চিকিৎসক জীবনে যা করে দেখাতে পারেননি এবার হাতে-কলমে তা করে দেখানোর সুযোগ পাবেন তিনি।

চিকিৎসক হিসেবে যাত্রা শুরু

রেগো ডাক্তার হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ভর্তি হন উত্তর-পূর্ব ব্রাজিলের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্র্যান্ডি দো নরটেতে। প্রাথমিক ট্রেনিং শেষ করার পর তিই সাও পাওলোয় অবস্থিত আলবার্ট আইনস্টাইন ইনস্টিটিউটে ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘হাসি থেরাপি’ (Laughter Therapy) নিয়ে একটি কোর্স করেন প্যাচ অ্যাডামস নামে পরিচিত আমেরিকান হান্টার ডয়ের্টির সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার হান্টার ডয়ের্টি কেবল একজন চিকিৎসক নন, একাধারে তিনি আমেরিকান কমেডিয়ান, সমাজকর্মী ও লেখক। মানুষকে হাসানোর জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে খুবই জনপ্রিয়। তার জীবনী নিয়ে চিত্রপরিচালক রবিন উইলিয়ামস ‘প্যাচ অ্যাডামস’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণ করেন। এরপরই হান্টার ডয়ের্টি তার নিজের নামের বদলে ডাক্তার প্যাচ অ্যাডামস নামে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

প্যাচ অ্যাডামসের কাছে কোর্স করার পর থেকে রেগোর চিন্তাধারা বদলে যাওয়া শুরু হলো। তিনি বুঝতে পারলেন হাসি-খুশি থাকার মাধ্যমে শারীরিক অসুস্থতা অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই নিজের পেশাগত জায়গার বাইরেও মন দিয়ে মানুষের সেবা করতে চেয়েছি। স্টেথিসকোপ দিয়ে আমি আমার চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে পারব। কিন্তু রোগী যে শারীরিক-মানসিক কষ্টে ভুগছে সে ক্ষেত্রে গিটার বাজিয়ে, আমার গান শুনিয়ে বা কথা বলার মাধ্যমে তার মানসিক অসুস্থতা অনেকখানি কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।’

যখন সাও পাওলোয় তিনি আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে ইন্টারেকটিভ মেডিসিনে পড়াশোনা করছিলেন, তখন তিনি যতেœর বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জানতে পারেন। এ ছাড়া বয়স্কদের স্মৃতি হারিয়ে ফেলা ‘আলঝেইমার’ রোগীদের ক্ষেত্রে মিউজিক থেরাপি কীভাবে কাজে দেয় তা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন। সাও পাওলোয় ইন্টারেকটিভ মেডিসিনে নিজের পড়াশোনা শেষ করার পর সেই একই হাসপাতালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। মেডিকেল হিউমানিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ তাকে ‘বিশেষজ্ঞদের বিশেষজ্ঞ’ বা বিশেষজ্ঞ বানানোর কারিগরে পরিণত করেছে।

ভিন্ন উপায়ে চিকিৎসা

ডেলফিনা আজিজ হাসপাতালে কাজ করার সময় রেগো দুপুরে খাবারের বিরতিতে হাতে নিতেন ইউকুলেলে কিংবা গিটার। সংগীতের মূর্ছনায় হাসপাতালের পরিবেশ বদলে যেত। থমথমে পরিবেশে সবার মধ্যে যেন এক চিলতে আনন্দ উঁকি দিত। এই কাজে তাকে উৎসাহ দিতেন তার সহকর্মী ও ভর্তি হওয়া কভিড রোগীরা। তিনি জানান, ‘প্রথম প্রথম সবাই চমকে যেত। হাসপাতালের জীবন-মৃত্যুর বিষণœতার মধ্যে সংগীতের সুর মানুষকে চমৎকৃত করবে এটাই স্বাভাবিক। চমক কেটে গেলেই সবাই দল বেঁধে আমার সুরের তালে গলা মেলাত। হাততালি দিয়ে মুখর করে রাখত পরিবেশ। দুপুরের ওই বিরতির মধ্যেই হাসপাতাল হয়ে উঠত উৎসবমুখর। কিছুদিনের ভেতরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরো বিষয়টিকে শিশুদের ওয়ার্ডে স্থাপন করতে সক্ষম হই। সহকর্মীদের মধ্যে যারা যারা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন তারা এসে যুক্ত হলেন আমাদের এই ব্যান্ডে।’

যতœশীল মানুষ

ডাক্তার নয় একজন যতœশীল মানুষ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে পছন্দ করেন রেগো। এভাবেই নিজের পেশাকে মানুষের কাছে তুলে ধরেন তিনি। হাসপাতালে রোগীদের ভেতরে করোনাভাইরাসের কারণে আসন্ন মৃত্যুর ভয় তো আছেই, সঙ্গে আছে আত্মীয়-পরিজন ছাড়া একা একা মৃত্যুবরণ করার শঙ্কাও। আত্মীয়স্বজন যারা আসেন তারাও নিরাপদ দূরত্ব মেনে নিয়ে রোগীদের দেখতে আসেন হাসপাতালে। স্বজনের কাছে না যেতে পারার হাহাকার, ছুঁয়ে দেখতে না পারার হাহাকার রোগীদের কুরে কুরে খায়। রেগো দেখলেন এই সামগ্রিক পরিস্থিতি রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভীষণ অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে। তিনি রোগীর কাছ থেকে হাসপাতালের এই মৃত্যুর গন্ধকে দূরে রাখতে চেয়েছেন। রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন আনন্দে বেঁচে থাকার আকুতি। একজন চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসাবিদ্যায় সংগীতের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকেননি তাদের এই পুরো বিষয়টি বোঝানো বেশ মুশকিলের। কিন্তু যারা একাকিত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে হাসপাতালে একা দিনযাপন করেছেন, তাদের বেলায় এই “মিউজিক থেরাপি” খুবই কার্যকর। এই পরিস্থিতিতে সংগীত মানুষের মনোবল বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। সংগীত এ ক্ষেত্রে প্রেরণাদায়ী হিসেবে কাজ করে।’

শুধু এটুকুই নয়। কভিডের এ সময়ে ডাক্তার হিসেবে রোগীর দেহের ভাষা (ইড়ফু খধহমঁধমব) তাকে বুঝে নিতে হয়। হাসির থেরাপিকে তিনি যে কেবল রোগীর ক্ষেত্রে ব্যবহার এটা তিনি মানতেন না। ব্যক্তি জীবনেও সব সময় হাসি-খুশি থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বুঝে নিতে হয়েছিল কীভাবে আমি চোখের মাধ্যমে রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি। মাস্ক পরে থাকার জন্য এখন আর কারও হাসিই দেখা যায় না। তাদের চোখ দেখে আমার বুঝে নিতে হতো হাসিটুকু। আমি চেয়েছি আমার রোগীরা সবাই হাসি-খুশি থাকুক।’

শিল্প-সাধনা

ছেলেবেলা থেকে রেগো ব্রাজিলিয়ান ক্ল্যাসিক সংগীতচর্চা করেছেন। তিনি জানান, ‘ব্রাজিলিয়ান সংগীতশিল্পী আলমির সেতার, রবার্তো কার্লোস, রাউল সেশাস, লেজিও উর্বানা, সেরতানিয়েশো, ধর্মীয় সংগীত, আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীদের গানও শুনে থাকি আমি।’

রেগো হাসপাতালে এসে যোগ দেওয়ার পরপরই ‘করিডোরস ভিক্টরি’ নামে একটি অ্যানিমেশন তৈরি করেন। কভিড জয় করে রোগীদের যারা যারা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন তাদের নিয়ে এই অ্যানিমেশনের গল্প। এই অ্যানিমেশনটি রোগী ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সবার কাছে ভীষণ প্রশংসিত হয়। অসুস্থ রোগীর মনোবল অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে এই অ্যানিমেশন।

চিকিৎসকদের পান্ডুলিপিতে কোন কোন বিষয়ের উল্লেখ থাকে না তা জানেন না রেগো। রোগীর চিকিৎসা দেওয়ার আগে রোগীকে বোঝা ভীষণ জরুরি। তাই পেশাগত জীবনে তাকে রোগীদের সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হয়। ঠিকঠাক কথা বলতে পারাই যে ডাক্তার-রোগীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি তা জেনেই এ পেশায় তার পথচলা। রোগীর অনুরোধ ও ভাবনা অনুযায়ী কথা বলে তাকে তুষ্ট করতে পারা তার কাজের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে কথাকে তিনি সব সময় খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। সব সময় চেয়েছেন রোগী যেন তার কথাতেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ব্রাজিলের মধ্যে আমাজোনাসে মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। ‘স্বাস্থ্যকর্মীরা বুঝে উঠতে পারছিলেন না এত রোগী কীভাবে সামলাবেন। সে সময় মৃত্যুর করাল থাবায় হাসপাতালের সবার মানসিক অবস্থাই বিপর্যস্ত। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে আমার গিটার, ইউকুলেলে তাদের আনন্দিত করেছে তা দেখে আমি স্বস্তি পেয়েছি।’

কেউ যদি মনে করে থাকে হাসি আর গানই স্বেচ্ছাসেবার উপকরণ তাহলে কিঞ্চিৎ ভুল করা হবে। যে মুহূর্তে চোখের সামনে দেখতে হয় রোগীর স্বজনরা তাদের মৃত আত্মীয়দের ছুঁয়ে দেখতে পারছেন না, দূর থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এর মতো হৃদয়বিদারক দৃশ্য আর হয় না। তখন স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তারদের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। কভিডের এই পরিস্থিতি ডাক্তারদের এই যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে হয়। রোজকার মতো মৃতদের দিকে পিঠ ঠেকিয়ে জীবিতদের জন্য হাসি-গানে মাতিয়ে রাখতে হয়। কারও কারও মনে হতে পারে বিষয়টি ভীষণ নিষ্ঠুর। কিন্তু ক্রমাগত যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করার বিষয়টি আসলেই নিষ্ঠুর।

একজন কর্তব্যরত ডাক্তার হিসেবে তাকে দেখে যেতে হয়েছে হাসপাতালের পাশের রাস্তায় দিনের পর দিন রোগীর স্বজনদের নির্ঘুম রাত। কখনো কখনো জানালার কাচের ওপাশে স্বজনদের দাঁড়িয়ে থাকা তাকে ভাবিয়েছে। একবারের জন্য চোখাচোখি হলেও হাত নাড়ানোর জন্য তারা দাঁড়িয়ে থাকতেন। তিনি জানান, ‘১৬ বছর বয়সী একজন কিশোরী রোগীর কথা মনে পড়ছে আমার। কিশোরী সেই মেয়েটি কখনো বাড়ির বাইরে একা থাকেনি, একা কাটায়নি। হাসপাতালের বাইরে তার বাবা-মা প্রতিদিন তার রুমের জানালার পাশে ঘুমাতেন। যেন তাদের মেয়েটিকে একা থাকতে না হয়। অসংখ্য পরিবারের লোকদের এসব ত্যাগ ভোলা সম্ভব না।’

সাও পাওলোয় ফিরে আসা

ডেলফিনা আজিজের কভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে আবার সাও পাওলোয় ফিরে আসেন রেগো। তার সহকর্মীরা তাকে জানান হাসপাতালে তার হাসি আর গানের উদ্যোগ তারা অক্ষুণœ রেখেছেন। রোগীদের সুস্থ করার উদ্যোগ এভাবে সবার মধ্যে সাড়া ফেলে দেবে বুঝতে পারেননি তিনি।

‘এগারো বছর আগে সাও পাওলোয় ফিরে আসার সময় আমার মনে হয়েছিল একজন ডাক্তার হিসেবে আমি যদি কাউকে বলি আমি মানুষকে হাসাতে চাই, আমি একজন সংগীতশিল্পী, আমি গিটার বাজাতে পছন্দ করি, আমি প্রেম নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি, তাহলে সেটা কেউ মেনে নেবে না। আরও সহজ করে বললে সেটা ঠিক ডাক্তারোচিত আচরণ হবে না।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন হাসি-গান তার ডাক্তারি পেশাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেয় না। বরং এই চর্চাগুলো অনেকগুলো দরজা খুলে দেয়, মানুষের কাছে তাকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করে।

তিনি জানান, ‘যখনই সম্ভব হবে আমি আমার সংগীতের মাধ্যমে ডাক্তারির চর্চা চালিয়ে যাব। সঙ্গে সঙ্গে আমি যেন মানুষের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে পারি সে বিষয়েও কাজ করে যাব। পৃথিবী আমাকে যা দিয়েছে তার খানিকটা যেন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারি আমি।’ ডেলফিনা আজিজের কভিড পরিস্থিতি শেষ হতেই যেন হাসপাতালে সুরের মূর্ছনা থেমে না যায়, এই চর্চা যেন সব সময় চলতে থাকে সে ব্যাপারে বিশেষ সচেষ্ট ডাক্তার রেগো। তাই মানাউসের এই সুরের ধারা সাও পাওলোয়ও চালিয়ে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত