গাইবান্ধায় ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত লাশ

ব্যবসায়ী হাসানকে পিটিয়ে হত্যা করে আ.লীগ নেতা!

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২১, ০১:৫৫ এএম

গাইবান্ধায় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার বাসা থেকে ব্যবসায়ী হাসান আলীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা নেয়নি পুলিশ। হাসানকে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী বীথি বেগম গত শনিবার রাত ১১টার দিকে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত এজাহার জমা দেন। এজাহারে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ জমার ১৮ ঘণ্টা পর গতকাল রবিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি পুলিশ। হাসান আলীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও  মানববন্ধন করেছে তার পরিবারের লোকজন ও এলাকাবাসী। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে লাশ উদ্ধারের মাসখানেক আগে ব্যবসায়ী হাসান আলীকে (৪৫) আওয়ামী লীগ নেতা দাদন ব্যবসায়ী মাসুদ রানার হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।

এর আগে গত শনিবার দুপুরে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক দাদন ব্যবসায়ী (সুদে টাকা খাটানো) মাসুদ রানার বাসা থেকে জুতা ব্যবসায়ী হাসান আলীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

হাসানকে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী বীথি বেগমের জমা দেওয়া এজাহারে শহরের স্টেশন রোডের জুতা ব্যবসায়ী রুমেল হক ও খলিলুর রহমান ওরফে বাবু মিয়াকেও আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে তিনি বলেছেন, জেলা শহরের স্টেশন রোডে আমার স্বামীর আফজাল সুজ নামের জুতার দোকান রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানা (৪২) একজন দাদন ব্যবসায়ী। ব্যবসা চলার সময় মাসুদ রানার কাছে দেড় লাখ টাকা নেন আমার স্বামী। এ টাকা সুদ-আসলে বর্তমানে ১৯ লাখে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন মাসুদ রানা। সম্প্রতি মাসুদ রানা টাকার জন্য আমার স্বামী হাসান আলীকে চাপ দেন। একপর্যায়ে গত ৫ মার্চ সকালে লালমনিরহাটের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে আমার স্বামীকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে আসেন মাসুদ। তিনি তাকে গাইবান্ধা সদর উপজেলার নারায়ণপুর এলাকায় নিজ বাসায় আটকে রাখেন। এরপর টাকা নিয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে মাসুদের তর্কবিতর্ক হয়। টাকার জন্য তিনি আমার স্বামীকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের হুমকি দেন। এসব নির্যাতনের কথা মুঠোফোনে জানতে পেরে আমি স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় স্বামীকে উদ্ধারের চেষ্টা করি। স্বামীকে উদ্ধারের জন্য ওই বাড়িতে যাই। কিন্তু টাকা না দিলে মাসুদ আমার স্বামীকে ছেড়ে না দিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করবেন বলে হুমকি এবং আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। ওই দিন সন্ধ্যায় বীথি স্বামীকে উদ্ধারে গাইবান্ধা সদর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর রহমান ও উপপরিদর্শক (এসআই) মোশারফ হোসেন এবং একজন অজ্ঞাতনামা পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদের বাড়ি থেকে আমার স্বামীকে সদর থানায় নিয়ে আসেন। একই দিন রাতে আমাদের উপস্থিতিতে পরিদর্শক (তদন্ত) মজিবুর আমার স্বামীকে আমার জিম্মায় না দিয়ে মাসুদের পক্ষ নেন। তিনি মাসুদের টাকা ফেরত দিতে বলেন এবং আমাকে ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি তাতে সম্মত না হলে মজিবুর আমার স্বামীকে মাসুদের জিম্মায় দেন। এরপর দলীয় ক্ষমতার দাপটে মাসুদ আমার স্বামীকে এক মাস আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেন। আমি অনেক ভাবে চেষ্টা করেও আমার স্বামীকে উদ্ধারে ব্যর্থ হই। গত শুক্রবার রাতে আমার স্বামীকে নির্যাতন করে হত্যা করে বসতবাড়ির বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরদিন শনিবার সকালে আমি মাসুদের বাড়িতে গিয়ে দেখি, আমার স্বামীর লাশ ঝুলে আছে। মাসুদ ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করেছে।

বিচার দাবিতে বিক্ষোভ : ব্যবসায়ী হাসান আলীকে টানা এক মাস আটকে রেখে ‘হত্যা’র প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলা শহরের ডিবি রোডে আসাদুজ্জামান মার্কেটের সামনে গাইবান্ধাবাসীর ব্যানারে মানববন্ধনটি করা হয়। বক্তারা সুষ্ঠু তদন্ত, দাদন ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদের শাস্তি এবং সদর থানার ওসি মাহফুজার, পরিদর্শক মজিবুর, এসআই মোশারফহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান। মানববন্ধনে হাসানের স্ত্রী বীথি অভিযোগ করে বলেন, গত শনিবার রাতে থানায় এজাহার দিতে গেলে পরিদর্শক মজিবুর এজাহারের বর্ণনা থেকে তার নাম বাদ দিতে বলেন।

মাসুদ রানাকে দল থেকে বহিষ্কার : জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মাসুদকে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক।

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন : ব্যবসায়ী হাসান আলীকে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা পুলিশ। কমিটির আহ্বায়ক হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) রাহাত গাওহারী, সদস্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) আবু খায়ের ও পুলিশ পরিদর্শক আবদুল লতিফ মিয়া। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে লতিফ মিয়া বলেন, ‘তদন্তের কাজ শুরু হয়েছে। যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’

পুলিশ সুপারের প্রেস ব্রিফিং : সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘হাসান আলীকে দাদন ব্যবসায়ী মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায় সদর থানার কোনো কর্মকর্তা জড়িত বা তাদের গাফিলতি আছে কি না, তা তদন্তে শনিবারই কমিটি করা হয়েছে। তদন্তে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

মামলা গ্রহণে বিলম্ব করার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমাদের কাছে যে কেউ অভিযোগ দিতে পারে, তা আমরা যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করে থাকি। হাসানের স্ত্রী যে এজাহার দিয়েছেন, তা মামলা হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এজাহার থেকে কারও নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ রানার হাতে হাসানকে তুলে দেওয়া প্রসঙ্গে পরিদর্শক মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওসি সাহেবের নির্দেশে এসআই মোশারফ বাড়ি থেকে মাসুদ ও হাসানকে থানায় নিয়ে আসেন। পরে তারা সালিশ করে। হাসানকে মাসুদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

এ প্রসঙ্গে সদর থানার ওসি মাহফুজার রহমান বলেন, ‘পুলিশ মাসুদের হাতে হাসানকে তুলে দেয়নি। থানা চত্বরে সালিশ বৈঠকের পর হাসান, তার স্ত্রী বীথি, মাসুদসহ উভয়পক্ষের লোকজন একসঙ্গে পায়ে হেঁটে থানা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তারা কী করেছেন, পুলিশ তা জানে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত